পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সৌদি আরবের মক্কা মুকাররমার পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রথম জুমার নামাজের ইমামতি করলেন শায়খ ড. ইয়াসির আল-দাওসারি। এর আগে তিনি ইসলামের প্রধান এই মসজিদের ইমাম ছিলেন। জুমার নামাজ পড়ানোর মাধ্যমে শায়খ দাওসারি খতিব হিসেবে অভিষিক্ত হলেন।
শুক্রবার (১৬ ডিসেম্বর) পবিত্র কাবা প্রাঙ্গনে স্থাপিত মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা ও এরপর নামাজ পড়ানোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইমামতির সাথে সাথে খেতাবতের দায়িত্বও পালন করলেন তিনি। তাঁর খুতবার চুম্বকাংশ পাথেয়র সম্মানিত পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
হামদ ও সালাতের পর, আমি আপনাদেরকে এবং আমার নিজেকে তাকওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। আর এটি পূর্বাপর সকল মানবজাতির প্রতি মহান আল্লাহ তাআলার আদেশ। আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি তোমাদের পূর্ববর্তী কিতাব প্রাপ্তদেরকে এবং তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করল এবং নফস ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকলো সে তো শক্ত হাতল আকড়ে ধরল এবং এহসানের স্তরে উন্নীত হলো। সর্বোপরি উভয় জাহানে সৌভাগ্যের অধিকারী হলো এবং নাজাত প্রাপ্ত হলো।’
আল্লাহ পাক বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দাড়াবার ভয় করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে তার ঠিকানা হলো জান্নাত।’
ও মুসলিম ভাইয়েরা, বান্দার উপর আল্লাহর অনুগ্রহের একটি হলো, সত্যকে চিনবার জন্য তিনি কিছু নিদর্শন ও প্রমাণাদি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যার ফলে রব্বুল আলামীনের তাওফিক প্রাপ্তগণ হেদায়েতের দিশা পায়। যে ব্যক্তি সৃষ্টি জগতের মাঝে গভীরভাবে দৃষ্টি বুলায় এবং তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে সে খুব সহজেই জানতে পারে যে, আল্লাহ সমস্ত মানব জাতিকে একই স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে সৃষ্টিগত বিভিন্ন নিদর্শন দেখিয়েছেন এবং তাদের কাছে শক্তিশালী প্রমাণাদি দিয়ে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এর ফলে যারা তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলতে চায় তাদের পথ সহজ করেছেন। আর বক্র হৃদয় গুলোকে তাঁর অবাধ্যতা থেকে সতর্ক করেছেন।
হে আল্লাহর বান্দাগণ, খালেস দিলে আল্লাহর ইবাদত ও তার দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ এই দুইটিই ছিল সমস্ত নবী রাসুলের উপদেশ। হযরত নূহ, হযরত ইব্রাহিম, হযরত মুসা কালিমুল্লাহ ও শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই একই নির্দেশনা ছিলো।
হে মুসলিম ভাইয়েরা, কুরআন-হাদিসে তাওহীদের মাহাত্ম্য বর্ণনার পাশপাশি ঘোষণা করা হয়েছে সব আমলের মূল ও প্রধান ভিত্তি এই তাওহিদীই। এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, তাওহীদ থাকলে আমল কবুল হয় আর এর অনুপস্থিতিতে আমল নষ্ট হয়। তেমনি ভাবে কুরআন সুন্নাহর বাণীসমূহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, শয়তান অক্লান্তভাবে সুযোগ খোঁজে মানুষকে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ও তার একনিষ্ঠ ইবাদত থেকে পথ ভ্রষ্ট করে দিতে। ইবলিস তো এই বিষয়ে শপথই করে বসে আছে।
আল্লাহ তাআলা যেমনটি বর্ণনা করেছেন, ‘সে বললো আপনার ইজ্জতের কসম, আমি আপনার খালেস বান্দাদের ছাড়া সবাইকে বিপথগামী করে ছাড়বো।’
হে মানব সকল, সমস্ত মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহর ভাষায় কুরআনের প্রথম আহ্বান হলো, ‘ও মানবজাতি, তোমরা তোমাদের রবের এবাদত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো।’ আর প্রথম নিষেধ বাণী হলো, ‘তোমরা জেনে শুনে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করো না।’
এখানে আল্লাহর বাণী ‘তোমরা রবের এবাদত করো’ এর মাঝে রয়েছে তাওহীদের আদেশ আর ‘আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করো না’ এর মাঝে রয়েছে শিরক থেকে নিষেধাজ্ঞা। কুরআনে বারংবার এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন সূরা নিসায় আছে, ‘তোমরা আল্লাহর এবাদত করো আর তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না’ এখানেও ‘আল্লাহর এবাদত করো’ একথা বলার দ্বারা তাওহীদ বা একত্ববাদ সাব্যস্ত করা হয়েছে আর ‘তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না’ এর মাধ্যমে থেকে সতর্ক করা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আল্লাহ তাআলা একনিষ্ঠ তাওহীদকে সাব্যস্ত করার মাধ্যমে সম্বোধন শুরু করেছেন আর শেষ করেছেন শিরককে নাকচ করার মাধ্যমে। এতে বান্দার প্রতি এই নির্দেশনা রয়েছে যে, বান্দা উভয়টিকে একই সাথে গ্রহণ করবে। আর এটিই হল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ। সুতরাং হে আল্লার বান্দাগণ, সেইসব ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হন যারা এর সবগুলো শর্ত পূরণ করেছেন।
ও আল্লাহর বান্দাগণ, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে ও আখিরাতে ভোগ করার মতো আসমান জমিনে বান্দার ওপর অফুরন্ত বড় বড় অনুগ্রহ বিছিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বানিয়েছেন বিছানার সুরুপ, আসমানকে বানিয়েছেন ছাদ। তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি নাযিল করেন এবং এর মাধ্যমে তোমাদের জন্য বিভিন্ন ফলমূল থেকে রিযিক উৎপন্ন করেন।
এখানে আল্লাহ সুবহানাহু উল্লেখ করেছেন পৃথিবীর স্থিরতা ও তার ছাদ অর্থাৎ আসমানের কথা এবং সমস্ত ফলাফলের মূল অর্থাৎ পানির কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা জেনে শুনে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করো না’। উপরের নেয়ামত গুলো বর্ণনা করার পরেই উপসংহার এর বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করুন। দেখুন, কথাগুলোর সাথে উপসংহার এর কতো জোড়ালো সম্পর্ক রয়েছে।
সুতরাং তাওহিদীই হল সবকিছুর শুরু ও শেষ। আসমান জমিন সুষ্ঠুভাবে টিকে থাকাও এই তাওহীদের কারণেই। আল্লাহ পাক বলেন, ‘যদি এতদুভয়ের মাঝে আল্লাহ পাক ছাড়া আর কোন ইলাহ থাকতো তাহলে তা ধ্বংস হয়ে যেত। আরশের মালিক আল্লাহ তারা যা বলে তাঁর থেকে পুতপবিত্র।
হে আল্লাহর বান্দাগণ, সৃষ্টির জন্য ও রিযিকের জন্য রবের প্রয়োজনীয়তার চাইতে কোন অংশে কম নয় ইবাদত ও ফিরে আসার জন্য রবের প্রয়োজনীয়তা। একইভাবে সুস্থতার জন্য, দোষ ত্রুটি ঢেকে রাখবার জন্য ও নিরাপত্তার জন্য রবের প্রয়োজনীয়তা যতোটুকু তার চেয়ে ঢের বেশি রবের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে আনুগত্যের তাওফিক ও কামনা-বাসনা দমনের জন্য সাহায্যের জন্য। বরংচ আল্লাহকে ভালোবাসা, তার কাছে প্রত্যাবর্তন ও ইবাদতের জন্য তার প্রয়োজনীয়তা অনেক অনেক বেশি। কেননা এটি হলো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি মানব ও জিনকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য’। সুতরাং বান্দার সফলতা, যথাযথতা, কল্যাণ শুধু তাওহীদ অর্জন, আল্লাহর দ্বীন কায়েম করা ও শিরক থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে অর্জিত হবে।
জেনে রাখুন শিরক দুই প্রকার। একটি শিরকে আকবার যা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তার সংজ্ঞা হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও এবাদত করা। যেমন দোয়া করা, পশু জবাই, মানত করা ছাড়াও সেজদা অধনমিত হওয়ার মতো আরও যেসব কাজ শুধু আল্লাহর জন্যই করা হয় তা করা। আর অন্য প্রকারটি হলো, শিরকে আছগার। সেটি হল কুরআন হাদিসের ভাষায় যাকে শিরকে আছগার বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং যেটি শিরকে আকবারের স্তরে পৌঁছেনি। যেমন রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা।
হে মুসলিম জাতি, কুরআনের এই চমৎকার বর্ণনা পরম্পরা শুধু একথাই বুঝায় যে, তাওহীদ বিষয়ক জ্ঞানের সবচাইতে বড় উৎস হলো এ মহা পবিত্র গ্রন্থ। যার সামনে-পেছনে, ডানে-বামে মিথ্যার কোন স্থান নেই। যা মহা প্রজ্ঞাবান ও চির প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
হে আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়েত করুন। আমি আমার কথা বলে যাচ্ছি। আমার নিজের জন্য আপনাদের জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য সব ধরনের পাপ ও ভুল থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি। আপনারাও তার কাছে ক্ষমা চান। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়।
ও মুমিন ভাইয়েরা আমার, একাত্মবাদী মুমিন বান্দাদের আল্লাহ পাক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সুসংবাদ দিয়েছেন এমন জান্নাতের যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী-নালা। আহা! তা কত চমৎকার প্রতিদান ঘর। আর যারা তাঁর সাথে শরিক করে, তাঁর আদেশ অমান্য করে এবং তাঁর নিষেধ কানে তুলে না তাদেরকে ভয় দেখিয়েছেন জাহান্নামের শাস্তির। আহা! কত নিকৃষ্ট সেই আবাস।
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর আদেশ পালনকারী একাত্মবাদী বান্দাদের প্রতিশ্রুতির মাঝে রয়েছে আল্লাহর বিধান ও আদেশ পালেনর প্রতি তুমূল উৎসাহ এবং তাঁর নিষেধ বারন থেকে বেঁচে থাকার প্রতি সহযোগিতা। কুরআন-সুন্নাহ অনুগত একত্ববাদী বান্দার প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রুত জান্নাতের বর্ণনায় পূর্ণ হয়ে আছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘আপনি সুসংবাদ দিন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্মশীল হয়েছে তাদেরকে এমন জান্নাতের যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী। যখনই তাদেরকে সেখান থেকে কোন ফল স্বরূপ দেওয়া হবে তখনই তারা বলে উঠবে এটি তো আগেই আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।’
বিষয়টি এমন নয়। বরং তাদেরকে বাহ্যিকভাবে দেখতে অনুরূপ কিছু দেওয়া হবে যার স্বাদ হবে ভিন্ন ভিন্ন। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পুতপবিত্র রমনীগণ। আর সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
জান্নাত তো হলো চির নিরাপত্তা ও চির সুখের জায়গা। সেখানে নেই কোন বিদ্বেষ, নেই কোন শত্রুতা নেই, নেই কোন ঝগড়াঝাঁটি। সেখানে
কুরআনের ভাষায় মুমিনদের সম্ভাষণ হবে ‘সালাম’। সেখানে থাকবে না কোনো ক্লান্তি, কোন শোরগোল আর কোন কষ্ট। তার অধিবাসীরা আর কখনোই এখান থেকে বের হবে না। তাদেরকে কোন কষ্ট ও ক্লাশ স্পর্শ করবে না। বরং থাকবে শুধু খুশি আর আনন্দ। থাকবে না কোন ভয়, দুঃখ কিংবা মৃত্যু।
আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা আজ তোমাদের কোন ভয় নেই। তোমরা এখানে দুঃখিত হবে না। তারা ঈমান এনেছিলো আমার আয়াতসমূহের প্রতি। আর তারা ছিল মুসলিম। তোমরা ও তোমাদের সঙ্গিনীগণ আনন্দ করতে করতে জান্নাতে প্রবেশ করো। এটি হলো চূড়ান্ত সফলতা। এরপর আর কোন সফলতায় ফায়দা নেই। নেই কোন প্রয়োজনও। এছাড়া অন্যান্য সব সফলতাই ক্ষণিকের বিনোদন, ম্রিয়মান ছায়া।’
আসুন, আমরা আল্লাহর তাআলার কাছে জাহান্নাম থেকে নাজাত চাই। আর তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি যেন সৎকর্মশীলদের সাথে আমাদেরও ঠিকানা হয় জান্নাত।


