প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ সহজ হবে না বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়। বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিবাদ বড় আকার ধারণ করায় তার প্রভাব এ দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়ার আশঙ্কা করছে তারা। ফলে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে ধরে নিয়ে এতে কিভাবে ভোটে এগিয়ে থাকা যায়, সেই চেষ্টা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় নেতারা দলের তৃণমূলকেও সেভাবে প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তৃণমূলে দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ নিরসন, বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দলের নেতাদের দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের জয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে একাধিক সংস্থার মাধ্যমে জরিপ চালানো হচ্ছে। যাঁদের জয়ের সম্ভাবনা কম তাঁদের নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই মনোনয়ন না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হতে পারে, যাতে যিনি মনোনয়ন পাবেন তিনি মাঠ গুছিয়ে নেওয়ার সময় ও সুযোগ পান।

এ বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বা আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ফলে এর আগেই দলকে প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কঠোর বার্তা দিয়ে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘শেখ হাসিনা এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে এবারের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। এ নির্বাচন সবার কাছে শতভাগ গ্রহণযোগ্য হবে। তিনি আমাদের দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সভায় বলেছেন, প্রয়োজনে বিরোধী দলে যাব। এত বড় একটা ঘোষণাকে অনেকে হালকাভাবে নিলেও আমরা দলের নেতাকর্মীরা বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছি।’

কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানান, কভিড মহামারি ও যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের প্রভাব আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের এমন আভাস দিয়েছেন। চলতি বছর অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য চাপের বছর হবে। ফলে মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, তাদের সামনে মন্দার বাস্তব কারণগুলো তুলে ধরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নেতাকর্মীদের।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহ্মুদ স্বপন বলেন, এখন থেকেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনী কাজ শুরু করছে। দলের তৃণমূলের বেশির ভাগ সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচন মাথায় রেখেই ২৪ ডিসেম্বর দলের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেখানে তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। দলের সভাপতি চাননি নির্বাচনের আগে নতুনরা নেতৃত্বে আসুক। তিনি নির্বাচনী বৈতরণি পাড়ি দিতে পুরনো নেতাদের ওপরই ভরসা রেখেছেন।

রবিবার রাতে আওয়ামী লীগের যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে ছয়জন নতুন মুখ যুক্ত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে পাঁচজনই তরুণ নেতা। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপরিচিত। যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক মাশরাফি বিন মর্তুজা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত নানা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সরব কণ্ঠ।

কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। কবি তারিক সুজাতকেও কার্যনির্বাহী সদস্য করা হয়েছে। সাহিত্য অঙ্গনে তিনি বিশেষ জনপ্রিয়। আগামী নির্বাচনে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে এই তরুণ নেতাদের কাজে লাগানো হবে।

১৪ দলের শরিক দলগুলোর সঙ্গেও দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১৪ সালের সরকারে ১৪ দলের শরিকদের রাখা হলেও গত নির্বাচনের পরে গঠিত সরকারে স্থান পায়নি। ২০১৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের শরিকদের দূরত্ব বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ জাসদ জোট ত্যাগ করে। সম্প্রতি জোটের শরিকদের সঙ্গে মনোমালিন্য অনেকটাই কমে এসেছে। গত দুই মাসে জোটের কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে শরিকদের অভিযোগগুলো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে জানানো হয়।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শরিকদের কিছুটা ছাড় দিয়ে ১৪ দলকে সক্রিয় রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া ছয়টি আসনের উপনির্বাচনে তিনটিতে কোনো প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। তারা ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, বগুড়া-৪ আসনে জাসদকে সমর্থন দিয়েছে। রাজনৈতিক মিত্র জাতীয় পার্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার সমীকরণ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে দলীয় কোনো প্রার্থী বা কাউকে সমর্থন দেয়নি আওয়ামী লীগ।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে দলে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য কঠোর হচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। রবিবার রাতে দলের এক সভায় শেখ হাসিনা রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে দেন। সম্প্রতি রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এর পেছনে দলের জেলা ও মহানগরের নেতাদের অসহযোগিতাকে বড় কারণ মনে করা হচ্ছে। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সারা দেশের নেতাকর্মীদের একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দলের সংসদ সদস্যদের জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানার নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। আবার দলের নেতাদেরও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। সংসদ সদস্যের জন্য কাজ করতে কেন্দ্রভিত্তিক নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে জেলা ও মহানগরের নেতাদের।

কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘আমরা মনে করছি, দলের সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ থেকে, মানুষের পাশে থেকে আস্থা অর্জন করতে না পারি তাহলে নির্বাচনে আমাদের প্রত্যাশিত ফল আসবে না। নেত্রী আমাদের বুঝিয়েছেন বিশ্বের ভূ-রাজনীতিকে বিবেচনায় নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আমরা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেন যার যার এলাকায় জনগণের আরো কাছে যেতে পারি, আরো আস্থা অর্জন করতে পারি। আগামী নির্বাচনে আবারও বিজয়ী হয়ে যেন সরকার গঠন করতে পারি, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগ খুবই সিরিয়াস।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *