পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দেশে ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বেচাবিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ কমেছে। অথচ পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে এই বাজার এখন ক্রেতার ভিড়ে জমজমাট থাকার কথা।
বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। ভোগ্য পণ্যের দাম গত বছরের চেয়ে বেশি থাকায় চাহিদা কমে যাওয়া, খাতুনগঞ্জের বাইরে বিভিন্ন উপজেলা সদরে পাইকারি বাজার ছড়িয়ে পড়া এবং চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে ওজন স্কেলের কড়াকড়ি।
এই ব্যাপারে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, ‘আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভোক্তার চাহিদা কমেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর পরও বেচাকেনা হতো, কিন্তু চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের ওজন স্কেল চট্টগ্রামভিত্তিক আমদানিকারক, আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়েছে। স্কেল বৈষম্যের কারণে পরিবহন খরচ বাড়তি হওয়ায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি পণ্য এখন সড়কপথে কেউ নিতে চায় না। এ কারণে বড় শিল্প গ্রুপগুলো আমদানি পণ্য বন্দরের বহির্নোঙরে নামিয়ে ছোট জাহাজে করে সরাসরি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে পুরো দেশের মোট আমদানির ৪০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করত এই খাতুনগঞ্জ। এখন সেটি ২০ শতাংশে নেমেছে। এবার সবচেয়ে কম বেচাকেনা হচ্ছে এই বাজারে।’
বেচাকেনা কমে যাওয়ার প্রমাণ মেলে খাতুনগঞ্জের প্রধান সড়ক দেখে। এই সড়কে যত বেশি ট্রাফিক জ্যাম, তত বেশি বেচাকেনা—এমন ধারণা ছিল সব ব্যবসায়ীর। এখন আর সেই জ্যাম নেই।
গত রবিবার সরকারি কর্মদিবসে গিয়ে দেখা গেছে, গাড়ির দীর্ঘ লাইন নেই। শ্রমিকদের ট্রাকে পণ্য ওঠানামার সেই ব্যস্ততাও নেই। কিছু ঠেলাগাড়ি, রিকশাভ্যান ও ছোট পিকআপ থেকে পণ্য মাথায় নিয়ে ট্রাকে বোঝাই করছে। বড় ট্রাক আছে হাতে গোনা কয়েকটি। নেই কোনো জটলা।
অ্যাগ্রো কমোডিটি ইমপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সভাপতি আবসার উদ্দিনও মনে করেন, শবেবরাতের পর বিভিন্ন কারণে খাতুনগঞ্জে জমজমাট বেচাকেনার ধরন পাল্টেছে। দামের ওঠানামার ভয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা এখন একসঙ্গে সব পণ্য কিনে রাখেন না। তেমনি ভোক্তারাও এবার মাসের সব পণ্য একসঙ্গে কিনছে না। কারণ সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতার আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে।
তিনি বলেন, এবার ঋণপত্র জটিলতা, ডলার সংকটসহ নানা কারণে চাহিদার উদ্বৃত্ত আমদানি হয়নি। ফলে বেচাকেনা জমজমাট হচ্ছে না।
খাতুনগঞ্জের বড় আড়ত তৈয়্যবিয়া স্টোরের মালিক সোলায়মান বাদশা বলছেন, শবেবরাতের পরই মূলত পাইকারি বাজারে বেচাকেনা বেড়ে যেত। পাইকারি বাজার থেকে কিনে রমজানের শুরুতে পণ্য বিক্রি করতেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এবার তো মনে হচ্ছে, বেচাকেনা ৫০ শতাংশ কমেছে।
তিনি বলেন, আগে জাহাজে আসা পণ্য বন্দরে নামিয়ে সরাসরি চলে আসত খাতুনগঞ্জে। এখন বন্দরে না এনে বহির্নোঙর থেকে নিজেদের জাহাজেই পণ্য সরাসরি নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে বড় আমদানিকারকরা। এতে তাদের পরিবহন খরচ কম পড়ছে। সড়কপথে ওজন স্কেল বৈষম্যের কারণে আমাদের পণ্য পরিবহন খরচ বেশি। ফলে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী সবাই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছেন। এতে বেচাকেনা কমেছে।
আড়তদাররাও স্বীকার করেছেন, খাতুনগঞ্জের একচেটিয়া ব্যবসা এখন আর নেই। বিভিন্ন কারণে সেটি এখন উপজেলা সদরে ছড়িয়ে পড়েছে। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি হয়ে সরাসরি চকরিয়া চলে যাচ্ছে, খাতুনগঞ্জ আসছে না। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আসা পণ্য চট্টগ্রাম না এসে মাঝপথে কক্সবাজারের বিভিন্ন মোকামে চলে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিকারক জারিফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘টেকনাফ দিয়ে আসা পণ্য আমদানিকারকের কাছ থেকে কেনার পর সরাসরি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। আগের মতো খাতুনগঞ্জ প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা থাকছে না। আর কক্সবাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন মোকামেও চলে যাচ্ছে আমদানি পণ্য। এ কারণেও খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমেছে।


