বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদর ঘরবাড়ি বানিয়ে দেয়া হবে : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও  ত্রাণ মন্ত্রী

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদর ঘরবাড়ি বানিয়ে দেয়া হবে : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মনু ও ধলাই নদে পানি কমছে। বন্যায় ডুবে যাওয়া রাস্তাঘাট থেকে পানি সরে যাচ্ছে। জেলার ৪টি উপজেলার ৩০টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা দেখা দেয় ১৩ জুন। বন্যায় সারা জেলায় ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বন্যা শুরু হবার ৬দিন পর গত সোমবার (১৮জুন) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বন্যার্তদের দেখতে মৌলভীবাজারে আসেন। মনু ও ধলাই নদের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধে ১৮টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এইসব ভাঙ্গন দিয়ে পানি প্রবেশ করে কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার পরিবারের প্রায় ২ লাখ মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েন। ১৪ ও ১৫ জুন দু’টি নদেই পানি অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে থাকে। মনু নদ বিপৎসীমার ১৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে ও ধলাই নদ বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে বৈঠক করে সেনাবাহিনীর সহযোগীতা চায়। ১৫ জুন রাতেই সেনাবাহিনীর চারটি টিম কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর এসে পৌছে। ১৬ জুন থেকে সেনাবাহিনী স্পীডবোর্ড দিয়ে পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার শুরু করে।

এদিকে ১৫ জুন মৌলভীবাজার শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মনু নদের বন্যা প্রতিরক্ষা দেয়াল ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। শহরের মনু নদ তীরবর্তী এম সাইফুর রহমান (সেন্ট্রাল রোড) সড়কের বিভিন্ন ছিদ্র ও দেয়ালের সংযোগের ফাঁক দিয়ে শহরে পানি প্রবেশে করতে থাকে। পৌরসভার পক্ষ থেকে পৌরবাসীকে সতর্ক করে মাইকিং করা হয়। সেনাবাহিনীর প্রকৌশল টিম বন্যা প্রতিরক্ষা দেয়াল পর্যবেক্ষণ করে দেয়ালের পাশে দ্রুত বালু ভর্তি বস্তা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মৌলভীবাজার পৌর কর্তৃপক্ষ বলু ভর্তি প্রায় ১৫ হাজার বস্তা দিয়ে শেষ পর্যন্ত বন্যা প্রতিরক্ষা দেয়াল রক্ষা করতে সক্ষম হয়। গত শনিবার রাতে (১৬ জুন) শহরের পশ্চিম এলাকার বরইকোণাতে বন্যা প্রতিরক্ষ বাঁধ (মাটির) ভেঙে মৌলভীবাজার পৌরসভার ৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়। মৌলভীবাজার-সিলেট সড়কের প্রায় অর্ধকিলোমিটার স্থান পানিতে ডুবে যাওয়ায় সিলেটের সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।  সোমবার (১৮ জুন) সড়ক থেকে পানি না নামায় সিলেটের সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ওই ভাঙা বাধ নিয়ে এখনো পানি ঢুকতে থাকায় মৌলভীবাজার পৌরসভার উপজেলা পরিষদ, বারইকোণা, পূর্ব রড়হাট, পশ্চিম বড়হাট, বড়কাপন, পূর্ব ধরকাপন, পশ্চিম ধরকাপন, শেখেরগাও, দ্বারক, খিদুর, গোবিন্দশ্রী, পূর্বহিলালপুরসহ ছয়, আট ও নয় নম্বর ওয়ার্ডের সকল পাড়া মহল্লার বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। ওইসব ওয়ার্ডের চলাচলের সকল রাস্তা ৩ থেকে ৪ ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। পানি নিচের গিকে গড়িয়ে যাওয়ায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর, কনকপুর, আমতৈল, নাজিরাবাদ ইউনিয়ন নতুন করে বন্যা কবলিত হচ্ছে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান জানান, পৌরসভার ভিতর থেকে বন্যার পানি যাতে দ্রুত নেমে হাইলহাওরে যায় তার জন্য এলজিইডি ও ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকটি রাস্তা কেটে দিতে হয়েছে। এখন পানি হাওরের দিকে যেতে গিয়ে নি¤œাঞ্চলের ইউনিয়নগুলো প্লাবিত করছে। রোববার (১৭ জুন) থেকে মনু ও ধলাই নদে পানি কমতে থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। বন্যার পানি হ্রাস পাওয়ায় ভাঙাচুড়া রাস্তা ভেসে উঠছে। জেলার কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নে পানির ¯্রােতে একটি বড় কালভার্ট ধেবে গেলে শমশেরনগর থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট যাওয়ার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই কলর্ভাট ধেবে যাওয়ায় বাংলাদেশের ও ভারতের ব্যবসায়ীদের আমদানী রপ্তানী বন্ধ হয়ে আছে। গত রোববার (১৭ জুন) সকালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা ও সেনাবাহিনীর ল্যা: কর্ণেল শাহাব উদ্দীন ধেবে যাওয়া কালভার্ট পরিদর্শন করেন। এখানে একটি বেইলী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেইলী সেতু নির্মাণ করতে ২ থেকে ৩দিন সময় লাগবে বলে জানানো হয়। বন্যা কবলিত ৩০টি ইউনিয়নে এপর্যন্ত প্রায় ২ হাজার কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। ৫০ টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ হাজার ৫শ’ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মনোজ কান্তি দাশ চৌধুরী জানান, বন্যার পানিতে মৌলভীবাজার জেলা শহরের চারটি খাদ্য গুদামের প্রায় ৫৫০ মেট্রিক টন চাল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা হবে।

গত সোমবার (১৮ জুন) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মৌলভীবাজার এসে সরকারী সকল দপ্তর ও ক্ষমতাশীন দলের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ভাবে উঠে আসে বন্যা মোকাবেলায় দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার চিত্র। মন্ত্রীর সাথে আসা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল এই অবস্থার জন্য কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রী জেলা শহরের বারইকোণার ভাঙন পরিদর্শন ও রাজনগর উপজেলার মনসুরনগরের আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ‘বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিজ চোখে দেখার জন্য আমি এসেছি। সব জেনেছি এবং দেখেছি। এখন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। যাদের ঘর ভেঙে গেছে তাদের ঘর নির্মাণের জন্য ১ হাজার বান্ডিল টিন ও নগদ ৩০ লাখ টাকা এখনই বরাদ্দ দেয়া হলো। আরো যা যা লাগে সরকারে পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক সেটা দেওয়া হবে। রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালর্ভাট মেরাতম ও নির্মানের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ, আর পানি নেমে গেলে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড যাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দ্রুত সময়ে দেয় সেটা নিশ্চিত করা হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী সোমবার বেলা ৫ টায় জানান, মনু ও ধলাই নদ পানি দ্রুত কমছে। কুশিয়ারা নদীতে পানি একই অবস্থায় আছে। মৌলভীবাজার শহরের কাছে চাঁদনীঘাট পয়েন্টে মনু নদ বিপৎমীমার ৮৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধলাই নদ বিপদসীমার অনেক নীচে নেমে গেছে। কুশিয়ারা নদীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বর্তমানে তা বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

 

patheo/106

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *