নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীতে ইয়াবার চালান এখনও বন্ধ হয়নি। নানা কৌশলে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঢুকছে মাদক। কখনও কুরিয়ার সার্ভিস, কখনও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, আবার কখনও কাঁচামালের আড়ালে আনা হচ্ছে ইয়াবার চালান। তবে আগের মতো অপরিচিত কারও কাছে মাদক পাচারকারীরা ইয়াবা বিক্রি করছে না। কেবল বিশ্বস্ত ও পুরাতন মাদকসেবীদের হাতেই তারা তুলে দিচ্ছে ইয়াবা।
মাদকবিরোধী অভিযানের এক মাসের মাথায়ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হাজার হাজার ইয়াবা উদ্ধার করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, অভিযানের ফলে মাদকের সরবরাহ ও বিক্রি কমেছে বটে, তবে মাদক কেনাবেচা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি। অভিযানের ফলে মাদক পাচারকারীরা অনেকটা সতর্ক হয়ে গেছে। তারা প্রতিনিয়ত কৌশল পাল্টে মাদক বেচাকেনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা সরবরাহ ও বিক্রির জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। অতীতে বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ভেতরে ও ব্যাগে, সিলভারের পাতিলে ও কুরিয়ারের মাধ্যমে কাপড়ের ভেতরে করে ইয়াবা আনতো চোরাকারবারিরা। এখন সরবরাহকারীরা কৌশল পাল্টে ঝুঁকি নিয়ে পেটের ভেতরে ও বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে ইয়াবা আনছে।
গত ৩০ জুন রাজধানীর দক্ষিণখানের আর্মি সোসাইটি রোড এলাকার ৩১ নম্বর বাসায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি দল। সেখানে পুরো বাড়ির সবকিছু তল্লাশি করে কোথাও কোনও মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি। তবে অধিদফতরের কাছে তথ্য ছিল এই বাসাটি মাদক চোরাকারবারির এবং সেখানে ইয়াবা রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ তল্লাশির পর অভিযানে অংশ নেওয়া দলের সদস্যরা ঘরের টেলিভিশনের পাশে স্ক্রু ড্রাইভার দেখে তাদের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগান। এরপর চলন্ত টেলিভিশনের পাশে থাকা মাল্টিপ্লাগের ভেতর থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেন। এ সময় সেখানে থাকা মাদক চোরাকারবারি রাশেদুজ্জামান উজ্জলকে (৪১) গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রামের বাড়ি যশোরের বেনাপোল থানায়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক মাসুদুর রহমান বাদী হয়ে দক্ষিণখান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) উপ-অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, অভিযানে গিয়ে অনেক তল্লাশির পরও কোথাও মাদক পাচ্ছিলাম না। তবে টেলিভিশনের পাশে একটি স্ক্রু ড্রাইভার দেখে সন্দেহ হয়। পাশে থাকা মাল্টিপ্লাগ নাড়াতে শব্দ হয়, সেটি খুলে ভেতর থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উজ্জল ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মো. নজরুল ইসলাম শেখ বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের ফলে মাদকের সরবরাহ ও বিক্রি কমেছে। তবে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে সেটি বলা যাবে না। বর্তমানে মাদক পাচারকারীরা অনেকটা সতর্কতার সঙ্গে কৌশল পাল্টে মাদক বিক্রি করছে। গোপনীয়তা রক্ষা করে মাদকসেবীদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করছে। তিনি বলেন, অভিযানের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন, তা না হলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে সারাদেশেই মাদকের সরবরাহ কমেছে। অনেক মাদক চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আবার অনেকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এতে মাদকের অনেক স্পট ভেঙে পড়েছে। তবে অনেকেই লোভে পড়ে নতুন নতুন কৌশলে গোপনে মাদক সরবরাহ ও বিক্রির চেষ্টা করছে। প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে মাদকসেবীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
গত ২৮ জুন রাজধানীর উত্তরার জসীম উদ্দিন এলাকা থেকে ১৪ হাজার ইয়াবাসহ আমান হোসেন (২২) নামের একজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-১। তিনি একটি বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন। চট্টগ্রাম থেকে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তার ঠিকানায় ১৪ হাজার ইয়াবার একটি পার্সেল আসে। ইয়াবার চালানটি আনতে গেলে তাকে আটক করা হয়। র্যাব-১ উপ-অধিনায়ক মেজর ইশতিয়াক আহম্মেদ বলেন, চট্টগ্রাম থেকে আলমগীর নামে এক ব্যক্তি পার্সেলটি গ্রেফতারকৃত আমানকে পাঠিয়েছিল। তবে আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি, প্রেরক আলমগীরের নাম ঠিকানা ভুয়া। তিনি বলেন, আলমগীরের ইয়াবার চালানটি সংগ্রহ করে ঢাকায় জামাল ও সুজন নামে দুই ব্যক্তির কাছে সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে র্যাব ওই দুই ব্যক্তিকে আটকের চেষ্টা করছে।
এর আগে, গত ১২ জুন রাজধানীর পল্টনে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ মোহাম্মদ আলমগীর (৩৮) নামের একজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত আলমগীর কক্সবাজার থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে ঢাকার মতিঝিল, পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় বিক্রয় করতো। এর আগের দিন অর্থাৎ ১১ জুন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বিজয় সরণি ক্রসিংয়ে ১ হাজার বোতল ফেনসিডিলসহ তিনজনকে গ্রেফতার ও একটি ট্রাক জব্দ করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারকৃত কেনারুল ইসলাম ট্রাকের হেলপার ও শাহীনুর রহমান ড্রাইভার পরিচয় দেয়।
পাকস্থলীতে করে ইয়াবা ট্যাবলেট বহন করার সময় গত ১০ জুন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সাতরাস্তা এলাকা থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা সাগর কলার ভেতরে ৫০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের একটি প্যাকেট রেখে তা পানির মাধ্যমে গিলে পাকস্থলীতে ধারণ করে কক্সবাজার থেকে বিভিন্ন পরিবহনযোগে ঢাকায় আনতো। পরবর্তীতে তারা খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে পাকস্থলী থেকে ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো বের করতো। তারপর ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার মাদকসেবী ও চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রি করতো।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রহমত উল্লাহ বলেন, অভিযানের ফলে রাজধানীতে মাদকের প্রবেশ অনেক কমেছে। তবে চোরাকারবারিরা কৌশল অবলম্বন করে মাদক পাচারের চেষ্টা করছে। আমরা তাদের রুখতে কাজ করছি।


