নিজস্ব প্রতিবেদক ● আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক বিরোধীদলীয় স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের ঘটনায় এখন রীতিমতো বিতর্কের মুখে পড়েছে। সর্বশেষ গত রোববার একদিনে বিএনপিদলীয় দুই মেয়র ও গত এক সপ্তাহে দুই চেয়ারম্যান ও এক ভাইস চেয়ারম্যানকে বরখাস্তের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় দেশে। আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করছে। গত সাড়ে তিন বছরে এ ধরনের পৌনে চারশ’ প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়। গত এক সপ্তাহেই রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ বিভিন্ন স্থানে এক ডজন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন। আরও শতাধিক প্রতিনিধি বরখাস্ত হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তারা শত শত মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। এদের প্রায় সবাই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। রাজনৈতিকভাবে এদের ঘায়েল করার জন্যই এসব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ১৩২টি দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে দেশে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন চলাকালে এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে সরকারকে। এটা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, সিলেট ও সুনামগঞ্জের মেয়রকে দ্বিতীয় দফায় বরখাস্তের পর সরকারের মনোভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, সরকার বড় ধরনের ভুল করছে। এটা এখন বন্ধ করা উচিত বলে তারা মনে করছেন।
রাজনৈতিক ও আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার সংশ্লিষ্ট আইনটি নিজেদের স্বার্থে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করছে। তারা এটিকে কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, চূড়ান্ত সাজার আগেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে এ আইনের সুযোগ নিয়ে বরখাস্ত করা হচ্ছে। আইনের অজুহাত দেয়া হলেও সরকারের অগোচরে কিছু হচ্ছে না বলে তারা মনে করেন। তাদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে পদচ্যুত করার মতো কাজ করে সরকার ভুল করছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওপর এ ভুলের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেন।এ নিয়ে সরকারের ভেতর-বাইরেও চলছে তুমুল সমালোচনা। বরখাস্তের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলছেন সরকারের নীতিনির্ধারণী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ওই বৈঠকে আইপিইউ সম্মেলন চলাকালীন জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার ঘটনাটি সামনে আসায় অংশগ্রহণকারী অতিথিদের মাঝে গণতান্ত্রিক চর্চায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে উল্লেখ করে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
অবশ্য জনপ্রতিনিধি বরখাস্তের দুইদিনের মাথায় গত মঙ্গলবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দ্বিতীয় এবং হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছকে তৃতীয় দফায় সরকারের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেক গত বৃহস্পতিবার মেয়রদের বরখাস্ত আদেশে স্বাক্ষর করেন। যদিও স্থানীয় সরকার বিভাগের আইনে বলা আছে, কোনো জনপ্রতিনিধি ফৌজদারি আইনে অভিযুক্ত হলে তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান আছে। আর এ বিধান অনুযায়ী বরখাস্ত হয়েছেন মেয়ররা। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, বরখাস্তের ঘটনা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে হয়নি। এ নিয়ে রাজনীতিতেও চলছে এক ধরনের উত্তেজনা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দল থেকে বলা হচ্ছে, সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের নির্বাচিত মেয়র বা জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করছে। এমনকি বিএনপি নেতারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করার যে বিধি সরকার প্রয়োগ করছে, সেটাকে কালো আইন বলে দাবি করছেন। তারা এ আইনের সংশোধনও দাবি করেছেন।
আর এসব বরখাস্তের ঘটনাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে কেবল স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকা-েই বিঘœ ঘটবে না; ভোটের রাজনীতিতেও সরকারকে খেসারত দিতে হবে বলেও মনে করেন তারা। তাদের মতে, এটি সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। এমনকি এমন ঘটনা ভবিষ্যতে প্রতিহিংসার রাজনীতি জন্ম দেবে বলেও আশঙ্কা তাদের। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, গত রোববার একদিনেই রাজশাহী ও সিলেটের দুই মেয়র এবং হবিগঞ্জের এক পৌর মেয়রের পাশাপাশি গত মঙ্গলবার আরো দুই চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করে মন্ত্রণালয়। এরা হলেন মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান জার্জিস হুসাইন।
২০১৩ সালে হরতাল-অবরোধের সময় পুলিশের ওপর হামলা মামলার আসামি হিসেবে বিএনপির এ দুই জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়। এভাবে গত সাড়ে ৩ বছরে চারজন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ৩৫ পৌর মেয়র, ৫৬ কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান ৪৯, ভাইস চেয়ারম্যান ৬৬, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ৯১ ও মেম্বার ৭৪ সহ ৩৭৫ জন বরখাস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ৭০ জনেরও বেশি জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করেছে সরকার। এদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ভোট কেন্দ্রে আগুন, গাড়িতে পেট্রল দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, পুলিশের ওপর হামলাসহ রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার আসামি তারা। এরা পদে বসতে না পারায় সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন ওই এলাকার জনগণ। ব্যাহত হচ্ছে স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্য।
কেন এই বরখাস্তÑ জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় যাদের বরখাস্ত করেছে, তাদের বেশির ভাগই বিএনপি-জামায়াত জোটের জনপ্রতিনিধি। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতাসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনবিরোধী এবং বর্তমান আওয়ামী সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতের যেসব জনপ্রতিনিধি জড়িত ছিলেন, তারাই বরখাস্ত হচ্ছেন।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এমনও বলছেন, বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের কেউই শপথগ্রহণের পর ঠিকমতো দায়িত্বপালন করতে পারেননি। বাস্তবায়িত হয়নি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। নির্বাচিত মেয়ররা দায়িত্বে না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট নগরীগুলোর উন্নয়ন।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলছেন, বিএনপির মনোনয়ন বা সমর্থনে মেয়র হওয়া এসব জনপ্রতিনিধি জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যা মামলার অভিযোগে অভিযুক্ত। কিন্তু যে সময়টাতে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে, তা তাদের পক্ষে চলে গেছে। আর সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দাবি করেছেন, বিএনপির দুই সিটি মেয়র ও এক পৌর মেয়রকে বরখাস্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অজ্ঞাতসারে। গত সোমবার ঢাকার ডেমরায় একটি সড়ক উদ্বোধনে গেলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মেয়র বরখাস্তের বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। এ সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নিয়েছে। এর পেছনে যুক্তি কী, কারণ কীÑ এটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে। তবে আমি যতটুকু জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানেন না। তবে বিএনপি-জামায়াতের মনোনয়ন বা সমর্থনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যারা মাথা গুঁজে শুধু নিজের দায়িত্বপালন করবেন, তাদেরকে হয়রানি করবে না সরকার। আর চেয়ারে বসে দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর ছিলেন বা হতে পারেন- এমন জনপ্রতিনিধিদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে সরকার। বিশেষ করে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া নেতাদের জনপ্রতিনিধির চেয়ার থেকে দূরে রাখতে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনগত সব ধরনের বাধা অব্যাহত রাখবে সরকার।
তবে বিষয়টি সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে মন্তব্য করেছেন দুই স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ। তাদের একজন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের ঘটনায় তৃণমূল তো বটেই, সারা দেশেই সরকারের ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এরা সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত। ফলে দলমত নির্বিশেষে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হবে। সরকার বুঝতে পারছে না তাদের ক্ষতি হবে। অপর বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কেবল তৃণমূলই নয়, জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্যও অশনিসংকেত। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হলো। ভবিষ্যতে অন্য দল ক্ষমতায় এলে এখনকার লোকজনদের এসব প্রতিষ্ঠানের কাছেই ঘেষতে দেবে না। এটি কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।


