চট্টগ্রাম ব্যুরো : দুই বছর পর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে আবার শুরু হতে যাচ্ছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রম প্রক্রিয়া। এর আগে উচ্চ আদালতের নির্দেশে এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া কিছু মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নতুন করে তদন্ত করলে বন্ধ হয়ে যায় এই কার্যক্রম। ফলে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে আর কোনো মামলা আসেনি এডিআরে। সম্প্রতি বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড দীর্ঘদিন পড়ে থাকা তিনটি রিট মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করে। এর পর উচ্চ আদালত আবেদন মঞ্জুর করলে আবার আলোর মুখ দেখতে থাকে এডিআর কার্যক্রম প্রক্রিয়া।
জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ মে বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার তিনটি রিট মামলা এডিআরের জন্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি জিন্নাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আখন্দের বেঞ্চে আবেদন করে। এর পর একই মাসের ২২ তারিখে ওই বেঞ্চ আবেদনটি মঞ্জুর করে। তার পর গত মাসের শেষের দিকে রবি কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে পাঠায়। গত ৩ জুলাই চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার এডিআরের অনুমোদন দিয়ে একজন সহায়তাকারী নির্বাচন করে দেন। এর পর চলতি মাসের যে কোনো সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মনোনীত সহায়তাকারী মো. শাহ আলম খানের উপস্থিতিতে এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানা যায়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, বছরের পর বছর উচ্চ আদালত ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে পড়ে থাকা হাজার হাজার মামলা দ্রুত নিস্পত্তির জন্য এডিআর প্রক্রিয়া চালু করা হয়। বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টরন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহযোগিতায় ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে এ পদ্ধতি চালু করা হয়। এ পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে আমদানিকারক ও কাস্টমসের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে একজন নিরপেক্ষ সহায়তাকারীর মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে।
জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘রাজস্ব সংলাপ: বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধিতি অবহিতকরণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তৎকালীন রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এডিআর কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৪টি মামলা নিষ্পত্তি করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। কিন্তু আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে চিনি আমদানি করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ছয়টি রিট মামলার রেকর্ডপত্র ২০১৬ সালের ১৮ মে দুদক তলব করে। উল্লিখিত ছয়টির মধ্যে তিনটি (রিট মামলার নং- ১৮৮৭/২০০৬, ১৮৮৮/২০০৬ ও ১৬২০/২০০৬) উচ্চ আদালতের আদেশে এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। এই তিনটি মামলার যাবতীয় কাগজপত্র দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে যেসব কর্মকর্তা স্বাক্ষর প্রদান করেছিলেন, তাদের লিখিত বক্তব্যসহ দুদকের স্থানীয় কার্যালয়ে তলব করা হয়েছিল। এর পর থেকে কর্মকর্তারা নতুন করে মামলা নিষ্পত্তিতে অনীহা প্রকাশ ও মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিব্রতবোধ করছিল। ফলে উচ্চ আদালত থেকে যেসব মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হয়েছিল সেগুলো নিষ্পত্তি না করে আবার আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এদিকে দীর্ঘদিন নিষ্পত্তি না হওয়ায় উচ্চ আদালত ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১০ হাজারের মতো মামলা ঝুলে আছে।
তবে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক মামলা ও বিরোধ নিষ্পন্ন বিভাগের দ্বিতীয় সচিব মহিবুর রহমানের কছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ওই বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ২০১২ সালে এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পর উচ্চ আদালতের বিচারাধীন মামলাগুলো এডিআরের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী আমদানিকারক আবেদন করার ৩০ দিন এবং মামলা আটকে থাকা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিন সময়সীমা ধার্য করা হয়েছে। এনবিআর থেকে প্রাপ্ত এক তালিকায় দেখা যায়, রাজস্ব বোর্ডের মামলা নিষ্পত্তির জন্য ২৫ ফেসিলিটেটর (সহায়তাকারী) নিয়োগ দেওয়া হয়, যার উপস্থিতিতে দুই পক্ষে সমঝোতা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রমা কাস্টমস সূত্রে, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ এ পর্যন্ত ১২৫টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে। তবে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত তেমন কোনো মামলা উচ্চ আদালত থেকে এডিআরে না এলেও লিন্ডা বাংলাদেশ কোম্পানি একটি মামলা এডিআরে এনেছিল, কিন্তু সেটি নিষ্পত্তি হয়নি। চলতি বছরের ৪ এপ্রিলে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনাল বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি অফিস কক্ষে আলোচনার স্থান নির্ধারণ করলেও চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে কেউ উপস্থিত না হওয়ায় এই কার্যক্রমটি শেষ হয়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঘোষিত তালিকার ফেসিলিটেটর মো. শাহ আলম খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এডিআর হয়নি। তবে এই মামলার কোনো কিছু যেহেতু আমার হাতে আসেনি, তাই এখনও কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।
দুদকে তলবের পর থেকে এডিআর কার্যক্রম বন্ধ ও দীর্ঘদিন পর তিনটি মামলা আসার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাস্টমস কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জমান বলেন, এডিআর কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। কোনো ব্যবসায়ী উচ্চ আদালত থেকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য এডিআরে আনলে আমরা দ্রুত সমাধান করতে প্রস্তুত আছি। রবি কোম্পানি তিনটি রিট মামলা এডিআর করার জন্য চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে এনেছে। আমরা এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিয়েছি। একজন সহায়তাকারীর নামও নির্বাচন করা হয়েছে ইতোমধ্যে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলো সমাধান হবে।
কাস্টমস আইন শাখা সূত্রে জানা যায়, কাস্টমস আপত্তি জানালে আমদানিকারকের ঘোষিত পণ্যের শুল্কায়ন সাময়িক শুল্কায়ন করে আমদানিকারক পণ্য খালাস করে থাকে। পরে অতিরিক্ত শুল্ক ফেরতের জন্য কাস্টমস ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়। আমদানিকারক ট্রাইব্যুনালে হেরে গেলে অথবা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আপিল ট্রাইব্যুনালে গেলে কিংবা যেকোনো পক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে মামলা নিষ্পত্তি বিলম্বিত হয়। এইসব মামলা উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর চলতে থাকে। ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মামলা অনিষ্পন্ন আছে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালে এডিআর ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্ত দুদকে তলব করার পর থেকে এডিআরের নিষ্পত্তির সংখ্যা কমে যায়। গত দুই বছরে এডিআরের মাধ্যমে কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। তবে দীর্ঘদিন পর রবি কোম্পানি তিনটি মামলা নিয়ে এসেছে। এখন দেখার পালা এগুলো নিষ্পত্তি হয় কি না।


