জার্মানে মুসলমান এবং মেয়েদের সাঁতার কাহিনী

জার্মানে মুসলমান এবং মেয়েদের সাঁতার কাহিনী

মাহমুদ এলাহী : ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে জার্মান একটি উল্লেখযোগ্য দেশ, ২০১৪ সালের জরিপ অনুযায়ী এর জনসংখ্যা আট কোটি ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৫ জন। জার্মানিতে অনেক ধর্মের লোকই বসবাস করে। এর মধ্যে মুসলমান ৩.৭ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্সের পর এখানে সর্বাধিক মুসলিম বসবাস করে বলে জানা যায়। জার্মানির মুসলমানরা ইসলামের নানা ধারার প্রতিনিধিত্ব করে৷ এই রাজ্যেও একই অবস্থা৷ জার্মান সংস্কৃতির কেন্দ্র কোলন শহরে সম্প্রতি নতুন একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ উদ্বোধন হয়৷ অটোমান তুর্কীদের ধাঁচে নির্মিত এই মসজিদের গ্লাস ও পাথরে চকচক করে৷ ৫৫ মিটার উঁচু মিনার জানান দিচ্ছে মসজিদের অস্তিত্ব৷ তারকা খচিত মসজিদের ভেতরটায় একত্রে হাজারেরও বেশি মানুষ নামাজ পড়তে পারেন৷

এই মসজিদের সুউচ্চ মিনার অনেকের গতরে কাঁটা দিয়েছে বলেই মনে হয়। কোলনের প্রধান গির্জার গম্বুজ শতাব্দীর পর শতাব্দী আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ সেই আকাশে ভাগ বসালো মসজিদের মিনার – এটা যেন মানতে পারছিলেন না অনেক খ্রিষ্টান নেতারা৷ কিন্তু মসজিদের সৌন্দর্য আর ইবাদতের রুহানিয়্যাত জার্মানদের হৃদয়ে ভিন্ন এক অনুভূতি জাগ্রত করবে নিঃসন্দেহে। মজার ব্যাপার হলো, ধর্মকর্মেও জার্মানরা দারুণ। জার্মানিতে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় চার মিলিয়ন৷ এই দেশের মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ মুসলমান৷ সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ মুসলিমস-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের ৯৪ শতাংশই রোজা পালন করেন৷ কেবল রোজার ইবাদত নয় ইসলামের সব অনুশাসনই চমৎকারভাবে জার্মানরা পালন করে।

বাঙালি মসজিদ আরেক ইতিহাস। জার্মানে বাঙালি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশ সম্পর্কেও জানার সুযোগ হচ্ছে সে দেশের লোকদের। বিশেষত তুর্কী মুসলমানদের আধিপত্যই সেখানে বেশি। বন শহরে বাঙালিদের উদ্যোগে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে শুধু বাঙালি মুসলমান নন অন্যান্য দেশের মুসলমানও আসেন নামাজ পড়তে এবং রোজার সময় ইফতার করতে৷

সাধারণত সব খেলাধুলার সঙ্গে মুসলমানরাও সংযুক্ত আছে। ফুটবলে তো ওজিলসহ অনেকেই খেলছে। ১০ জুলাই মঙ্গলবার মুসলমান মেয়েদেরকেও সাঁতার শিখার অনুমতি দেয়া হয়েছে জার্মানিতে। সাঁতার জানা প্রতিটি মানুষের জন্যই জরুরি৷ তাই এই ধর্ম বিশ্বাসের কারণে সাঁতার শেখা থেকে মুসলিম মেয়েরা যাতে বিরত না থাকে, সেজন্য জার্মানির স্কুলগুলোতে তাদের ‘বুর্কিনি’ পরে সাঁতার শেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে৷

মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত জার্মানের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের এক নেতা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। বিবিসির সংবাদ। আলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের নির্বাহী কমিটির এক বৈঠকে আর্থার ভাগনারের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ধর্ম একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে সমর্থন করি।

রাশিয়া বংশোদ্ভূত ভাগনার এর আগে জার্মান চ্যাঞ্চেলর এঞ্জেলা মার্কেলের খ্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) সদস্য ছিলেন। পরে সিডিইউ ছেড়ে তিনি এএফডিতে যোগদান করেন।

কোনো শিশুর মাতৃভূমি অন্য দেশ কিংবা সে ভিন্ন ধর্মের হলেও সে যেন সাঁতার শেখার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে মুসলিম মেয়েদের শরীর ঢাকা সাঁতারের পোশাক ‘বুর্কিনি’ পরেই সাঁতার শেখার সুযোগ দেয়া হয়েছে জার্মানিতে৷ একথা জানান জার্মনির পরিবারমন্ত্রী ফ্রান্সিসকা গিফে৷

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, জার্মানিতে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ শিশুই ঠিকমতো সাঁতার জানে না, যা আসলে বিপজ্জনক৷ মুসলিম মেয়েরা যাতে এ দেশের শিক্ষার নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সাঁতারের ক্লাসেও যাতে তারা অংশ নেয়, তা নিশ্চিত করারই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷কিন্তু অনেক মুসলিম মেয়ের বাবা কোনোভাবেই মেয়েকে সাঁতার শিখতে দিতে রাজি নন৷ ফলে মুসলিম মেয়েদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ শিক্ষকরাই ডয়চে ভেলেকে একথা জানিয়েছেন৷

জার্মানিতে বসবাসরত মুসলিমদের অনেকের কাছে জার্মান মেয়েদের জীবনযাত্রা বা পোশাক-আশাক এখনো গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি৷ এ কারণেও মুসলিম পরিবারের অভিবাবকরা তাঁদের মেয়েদের ব্যাপারে একটু বেশি রক্ষণশীল থেকে যাচ্ছেন বলে অনেকের ধারণা৷ জার্মানির নর্থরাইন ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্যের হ্যার্নে শহরের একটি স্কুলে মুসলিম মেয়েরা বুর্কিনি পরে সাঁতার শেখার অনুমতি পেয়েছে৷ ভাড়া দেওয়ার জন্য ২০টি বুর্কিনিও রাখা হয়েছে সেখানে৷

২০১৩ সালে ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, বুর্কিনি অনুমোদন পেলে সাঁতার শেখার ক্লাসে মুসলিম মেয়েদের অংশ নেয়াও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করবে৷ বুর্কিনি পরে সাঁতার শেখার অনুমতি দিয়ে দেয়ায় এখন আর স্কুলে মুসলিম মেয়েদের সাঁতার শেখার পথে কোনো বাধা রইলো না জানা যায়৷

উল্লেখ্য, ইসলামের দৃষ্টিতে সাঁতার শেখা প্রশংসনীয়। তবে পর্দা রক্ষা করেই মেয়েদের যেকোনো কাজ করতে হয়। কারণ সাঁতার অনেক সময় নিজের জীবন বাঁচানোর একমাত্র মাধ্যম হয়। আর সাঁতারের মাধ্যমে দেহের সর্বাঙ্গে ব্যায়াম হয়। সাঁতার শরীরের নমনীয়তা বাড়ায়, ওজন কমায়, হার্ট সুস্থ রাখার পাশাপাশি নানা রকমের অসুখ কমায়। সাঁতার শুধু আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনই নয়; নিজের জীবন বাঁচার জন্য হলেও সাঁতার শেখা আবশ্যক।


সম্পাদনা : মাসউদুল কাদির

তথ্য সংগ্রহ : আদিল মাহমুদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *