বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে তাবলীগের মুরুব্বী শাইখ ইব্রাহীম দেউলা দামাত বারকাতুহুম এর প্রতি একটি চিঠি

বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে তাবলীগের মুরুব্বী শাইখ ইব্রাহীম দেউলা দামাত বারকাতুহুম এর প্রতি একটি চিঠি

পাথেয় ডেস্ক : বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শাইখ ইব্রাহীম দেউলা দামাত বারকাতুহুম এর প্রতি একটি চিঠি।পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে পাঠকদের জন্য তা অনুবাদসহ প্রকাশ করা হলো।

১লা শাওয়াল ১৪৩৯

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ

সম্মানিত শাইখ ইব্রাহীম দেউলা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।

আমি আপনাকে এই চিঠি লেখার আগে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করেছি, লম্বা সময় ধরে বিস্তারিত ভাবে মাসোয়ারা করেছি এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে এতদিন ইস্তিখারা করেছি যতদিন না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার দিলে এই কথা গুলো ঢেলেছেন। আমি আল্লহর কাছে উমিদ রাখি আপনি গভীর চিন্তা ভাবনা এবং বিবেচনা নিয়ে এই চিঠি পড়বেন।

আল্লাহর তৌফিকে হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমতুল্লাহির ইন্তেকালের পরে ১৯৯৪ সালে নিজামুদ্দিনে একবার আপনার মুবারক কদমের কাছে বসার সুযোগ হয়েছিল। এবং প্রথম যে কথাটা আপনার থেকে শুনে ছিলাম তা হল…
انَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا
এবং শেষবার যখন ২০১৫ সালে আপনার সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম তখনও আপনার থেকে শুনেছিলাম…
انَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا
এই দুই তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে আমি বেশ কয়েকবার নিজামুদ্দিন, বাংলাদেশ, জর্ডান, ইউরোপ, আমেরিকা সফর করেছি এবং অসংখ্য ইজতেমায় শরীক হয়েছি। প্রতিবারই আপনি বয়ানে ইস্তিকামাত এবং জমে থাকার ব্যাপারে কথা বলেছেন।

শাইখ ইব্রাহীম দেউলা দামাত বারকাতুহুম এর প্রতি পাঠানো চিঠি।

শাইখ ইনআমুল হাসান সাহিব, শাইখউমার পালানপুরী,শাইখ মিয়াজী মেহরাব এবং নিজামুদ্দিনের প্রথম জামানার অগণিত উলামাকেরামদের পরে আপনিই সবচেয়ে বড় এবং বিশিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছেন। পূর্ববর্তী মহান বুযুর্গগণ আপনার নিকটে এক আমানত রেখে গেছেন, তা হল দাওয়াতের মেহনতের আমানত। সারা জাহান আপনার কাছে জমা হতে শুরু করেছিল এবং আপনার রাহবারী নিতে শুরু করেছিল। আপনিই এই মহান মেহনতের পিতামাতা। আপনার কথাই এই মহান মেহনতের কানুন সমতুল্য।

কাজেই, হে আমাদের নেতা! আপনার প্রচেষ্টা, চোখের পানি, ঘাম, আপনার হাড়ভাঙা খাটুনি, আপনার পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা, লম্বা মাসোয়ারা, আপনার জান মাল সময়ের অনন্য কুরবানী এবং কঠোর মুজাহাদার বদৌলতে এই মোবারক মেহনত আজ পাঁচও মহাদেশের প্রতিটি পাহাড়, উপত্যকায়, প্রতিটি শহর ও গ্রামে পৌঁছে গেছে।

সারা জাহান সুচারুভাবে সহীহ নাহাজে ৬ সিফাত ও ৫ কাজের চর্চা করছে। কোন শক্তি, কোন ব্যক্তি হোক সে নাসারা বা ইয়াহুদী, শিয়া বা অন্য যে কেউ, কেউই এই মেহনতের সামনে (প্রতিবন্ধক হয়ে) দাঁড়িয়ে সফল হতে পারেনি, যেমন কেউই উজ্জ্বল সূর্যের সামনে দাঁড়াতে পারে নি।

হায় আফসোস! “সেই মহিলার মত হয়ো না, যে যে তার সূতা বুননের পরে আবার টুকরো টুকরো করে ফেলে” ( সূরা নাহল : ৯২ )

আপনি নিজামুদ্দিন থেকে চলে যাওয়ার পরে সারা দুনিয়ার যত জায়গায় এই মোবারক মেহনত পৌঁছে ছিল সকল জায়গায় ইখতিলাফ ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে আমরা যারা এই মেহনতের সাথে জড়িত তারাই আজ এর পথে (বাধা হয়ে) দাঁড়িয়ে গেছি। যেখানে শয়তানও এই মেহনতের সামনে (প্রতিবন্ধক হয়ে) দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে আমরাই আজ এই মেহনতের প্রতিবন্ধক হতে সফল হয়েছি, তা দুর্ঘটনাবশতই হোক অথবা সুচিন্তিত ভাবেই হোক।

এখন সকল দেশ, সকল মারকাজ, সকল মসজিদ, সকল মাসোয়ারা এবং সকল গাশতেই এই ইখতিলাফ হচ্ছে। এসব এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে মুমিনীনরা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন, সহনশীলগণও ধৈর্য্যহারা হচ্ছেন, বুদ্ধিমানগণও এই ফিৎনার কারণে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছেন। এবং এর দ্বারা প্রথমত এবং একমাত্র ফায়দাবান হচ্ছে শয়তান এবং তার দলবল।(এছাড়া আমাদের কারোই কোন উপকার হচ্ছে না। )

আল্লহ কসম, এই ফিৎনা খিলাফত ধ্বংসের সমতুল্য।

এই আমলই অতীত এবং বর্তমানের উম্মতের রূহ। বাতিলের সকল শক্তি একত্রিত হয়ে প্ল্যান প্রোগ্রাম ষড়যন্ত্র করলেও কিছু আসে যায় না, তারা কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু যদি আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি তাহলে এটা আমাদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে। আমরা ইখতিলাফ করতে থাকলে এই কাজ কখনো আগাবে না। কুরআন, হাদীস এবং সাহাবাদের জিন্দেগীতে ইখতিলাফ এবং মুখালীফাতের ক্ষতি সম্পর্কে যে সব বর্ণনা এসেছে সেগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করতে আমি একেবারেই অনাগ্রহী। কেননা আমাদের উস্তাদ হিসাবে এসব আপনি আমার চেয়ে ভালোই জানেন।

এ কারণে, আমাদের সম্মানিত শাইখ, যে জিনিস আপনাকে শাইখ সা’দের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজামুদ্দিন ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা নিশ্চয়ই এতদূর পর্যন্ত ইখতিলাফ সৃষ্টি করার মত ছিল না যতখানি ইখতিলাফ ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। আপনি নিজামুদ্দিন ছেড়ে না গেলে হত এত কিছু হত না। তাই (আদবের সাথে আরজ), নিজামুদ্দিন ফিরে যান, তাঁর সাথে জুড়ুন, সহযোগিতা করুন, পরামর্শ দিন, তাঁর ইমারতের সমর্থন করুন। কেননা এই মুহুর্তে এটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে জরুরী। আপনি তাকে খুব ভালো ভাবেই চিনেন। তিনি আপনার পুত্রের মত এবং আপনার ছাত্র। মেহেরবানী করে তাঁর পথে (বাধা হয়ে) দাঁড়াবেন না। কেননা আপনার নিজামুদ্দিন এবং তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁকে কপট (মুনাফিকীন) ও স্বার্থপরদের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীল করে ফেলেছে।

সম্মানিত শাইখ ইব্রাহীম, শাইখ সা’দের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের চেয়ে বরং আপনার মারকাজ ত্যাগই সারা দুনিয়াতে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই আমাদের সম্মানিত উস্তাদ, (মেহেরবানী করে) ঐ ব্যক্তির মত হবেন না যে, যে কোন ভেড়া লালনপালন করে, ভালো মত খাওয়ায়, মোটাতাজা করে অতঃপর জবাই করে। এই ফিৎনা আপনি চলে যাওয়ার পর থেকে ছড়িয়েছে। দাওয়াহ ইলাল্লাহ এভাবে চলতে পারে না। নিজামুদ্দিন এবং শাইখ সা’দের নিকট ফিরে গিয়ে উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। তাঁকে সহায়তা করুন, সংশোধন করুন এবং সমর্থন দিন। কেননা আপনি সেই সকল মহান ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভূক্ত যারা এই মেহনত প্রসারিত করেছেন, মদদ করেছেন এবং এতে অনন্য শক্তি দান করেছেন। (মেহেরবানী করে) এখন এ মেহনতকে হত্যা করবেন না।

পরিশেষে আমাদের সম্মানিত উস্তাদ, সময় এখন আমাদের অনুকূলে নয়। আমার তো আশঙ্কা হচ্ছে পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ভাবার মত সময় একদম নেই। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আপনি অতিসত্বর নিজামুদ্দিন ফিরে গিয়ে সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করবেন। কারণ সংশোধন শুধুমাত্র ভিতরে থেকেই করা সম্ভব, বাইরে থেকে নয়।

আমার মাননীয় উস্তাদ, মহান আল্লহর কাছে আমি ব্যাকুল ভাবে আপনার সুদীর্ঘ জীবন এবং উত্তম প্রত্যাবর্তন প্রার্থনা করি। আমাদের দূরতম কল্পনাতেও আসে না যে আপনি নিজামুদ্দিনের বাইরে ইন্তেকাল করবেন। কেননা এতে ফিৎনা অপ্রতিরোধ্য ভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং ঠেকানোর কেউই থাকবে না। এবং এজন্য আপনিই হবেন প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যাকে সবাই দায়ী করবে। আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যে নিয়ন্ত্রণ করার মত অবস্থানে আছেন। আপনিই সেই শক্তির অধিকারী যিনি এই ফিৎনা ভঙ্গ করতে পারেন এবং সম্পূর্ণ পর্যদুস্ত করে একেবারে নীরব নিস্তব্ধ করে দিতে পারেন। এটা কেবলমাত্র তখনই ঘটবে, যদি আপনি নিজামুদ্দিন ফিরে যান।

আমাদের পূর্ববর্তী আকাবিরগণ আপনার কাছে এই মহান আমানত রেখে গেছেন। তাই আমরা কামনা আপনি ভবিষ্যতে কোন ধরনের ইখতিলাফ ব্যতীত এই মহান আমানতদারী রক্ষা করবেন, যেহেতু শাইখ সা’দের মুখালীফাত অনেক বড় এবং মারাত্মক।
আল্লাহর দরবারে আমার প্রার্থনা উম্মতকে আবারো এই মহান কাজের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করে দেন; যেন আমাদের এক কালিমাহ, এক মাসোয়ারা, এক মারকাজ তথা মারকাজ নিজামুদ্দিন। যথাযথ সম্মানের সাথে আপনার মাধ্যমে এই চিঠি শেইখ আহমাদ লাট সাহিবের সম্মুখেও পেশ করছি। (হাফিজহুমুল্লাহ)

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।

إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ۚ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ.

লক্ষণীয়: মূল লেখকের মতামত তুলে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে অনুবাদটি সংকলন করা হয়েছে।

সৌজন্যে: লন্ডন মারকাজের সাথীভাইগণ।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=896230027251417&id=733590663515355

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *