শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ : বিরক্ত হয়নি সাধারণ মানুষ!

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ : বিরক্ত হয়নি সাধারণ মানুষ!

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধে অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী।  বুধবার সকাল থেকে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শনির আখড়া, মাতুয়াইল, মেরাদিয়া, বনশ্রী, রামপুরাসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যানচলাচল ছিল খুবই কম। রাস্তায় গাড়ি কম থাকায় সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে। তবে তাদের নেই কোনও বিরক্তি।

গণপরিবহনের নৈরাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের তোলা দাবিগুলোকে যৌক্তিক মনে করছেন সাধারণ মানুষেরা। তারা বলছেন, দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় ‘হত্যার’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণ ও নৌমন্ত্রীর অনৈতিক বক্তব্যের প্রতিবাদসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিগুলো যথেষ্ট যৌক্তিক।

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা শাহবাগ মোড়েও একই চিত্র। সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মৎস্যভবন, রূপসীবাংলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে পায়ে হেঁটে আসছেন পথচারীরা। শুধু বয়স্ক, নারী এবং শিশুদের রিকশায় ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে চলাচল করতে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যারা হাঁটতে সক্ষম তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে রিকশায় এসে স্বেচ্ছায় ব্যারিকেডের সামনে নেমে পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাদের নামার জন্য অনুরোধ করা লাগেনি। জরুরি সেবার গাড়িগুলোকে যেতে দেওয়া হচ্ছে, তবে ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে তাদের যেতে দেওয়া হয়। যেসব চালকের লাইসেন্স নেই, তাদের গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই লাইসেন্স চেক থেকে রেহাই পাইনি খোদ পুলিশও।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চতুর্থ দিনের মতো সড়ক অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা।  সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকার রাস্তায় অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। এতে ফার্মগেট এলাকায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পুলিশও রয়েছে।

মিরপুর রোড থেকে অনেক কষ্টে ভুতের গলি দিয়ে হেঁটে শাহবাগ এসেছেন রাসেল আহমেদ, পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার গন্তব্য ছিল বায়তুল মোকাররম। তিনি হেঁটেই ছাত্রদের আন্দোলনের চিত্র দেখতে দেখতে সেদিকে যাচ্ছেন। এতদুর হেঁটে এসেও বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ নেই তার চোখে মুখে। শাহবাগ পার হওয়ার সময় কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনার পর আবার গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন। রাসেল আহমেদ বলেন, পরিবহন ব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য, এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হওয়া জরুরি। কারণ, জীবনের নিরাপত্তা এখানে বড় বিষয়। সাধারণ মৃত্যুর গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারবেন ঢাকার রাস্তায়? কে কার আগে পাল্লা দিয়ে যাবে, সিটিং বাসের ভাড়া নিয়ে লোকাল গাড়ি চালায়, অতিরিক্ত ভাড়া, হেল্পার দিয়ে গাড়ি চালানো, গাড়ির ফিটনেস নাইÑ কী সমস্যা নেই এখানে। এগুলা বন্ধ হওয়া জরুরি, এই ছাত্ররা যে রাস্তায় নামলো এগুলো কিন্তু একদিনের ক্ষোভে না।দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে এই অবস্থা।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে কাকরাইলে নিজের বাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিলেন আমিরুল। তিনিও সড়ক অবরোধে বিরক্ত নন। তার মতে, পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। তিনি বলেন, এমন একজন মন্ত্রী আমাদের মাশাল্লাহ! মৃত্যুর খবরেও হাসে! কোনও অনুসূচনা বোধ নেই তার মধ্যে। তিনি আবার শ্রমিক নেতা। বিচার চেয়েও লাভ হবে? তিনি থাকতে তার শ্রমিকের বিচার হবে না, এটা তারাও জানে। এই যে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পুরা ঢাকা অবরোধ করলো, নাহলে কি কারও টনক নড়তো? এখন সব তড়িৎ গতিতে হচ্ছে, তাহলে আগে কেন করলো না?

এদিকে, একজন গৃহিণী সন্তানকে স্কুল থেকে নিয়ে পায়ে হেঁটেই যাচ্ছেন বাসায়। তিনিও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনিও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের কথা জানান। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, এদেশে সবসময় এটাই দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় না নামলে দাবি আদায় হয় না। যারা আন্দোলন করছে এরাও তো আমার সন্তানের মতো। আজ পর্যন্ত কয়টা সড়ক দুর্ঘটনার বিচার হয়েছে? বিচার না হওয়ায়ই তো আজকের এই অবস্থা। বিচার করলে তো আর এমন হতো না, সবার বিচার ব্যবস্থায় আস্থা থাকতো।

রাস্তা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের দাবিÑ অদক্ষ এবং বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। এছাড়া, রমিজুদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাস চাপা দিয়ে মারার ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। উদয়ন কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. অয়ন বলেন, সেদিন আমাদের ভাইদের রাস্তায় হত্যা করা হয়। নেশাখোররা সব বাস চালায়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। বিচার যতক্ষণ পাবো না, ততক্ষণ আন্দোলন করবো। অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে। আমরা এখানে হানাহানি মারামারি করতে আসিনি।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *