পাথেয় রিপোর্ট : ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংস্থা বা আরএসএস’র বিরুদ্ধে গো—রক্ষার নামে মানুষ হত্যার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ অভিযোগের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। বিজেপি বরাবরই মানুষ হত্যার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির এক অনুসন্ধানে আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা গো—হত্যার অভিযোগে মানুষ হত্যা করার কথা স্বীকার করেছেন। এনডিটিভির সাংবাদিকরা ছদ্মবেশে ও গোপন ক্যামেরা নিয়ে ওইসব কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করেন। এসব আলাপে ভারতের দুটি রাজ্যে ভিন্ন দুটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন তারা।
চলতি বছরের ১৮ জুন উত্তর প্রদেশের হাপুরে কাশিম কোরেশি (৪৫) নামের এক মাংস ব্যবসায়ীকে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা ৬৫ বছর বয়সী কৃষক সামিউদ্দিন গুরুতর আহত হন।
পুলিশ এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ৯ জনকে আটক করে এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যার পরিকল্পনা এবং দাঙ্গার অভিযোগ আনে। তাদের মধ্যে ৪ জনই এখন জামিনে আছেন। জামিনে থাকা রাকেশ সিসোদিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য হাপুরের বাজেধা খুর্দ গ্রামে যায় এনডিটিভির সাংবাদিকরা।
আদালতে লিখিত জবানবন্দীতে সিসোদিয়া দাবি করেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিতও ছিলেন না। কিন্তু ওই ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিসোদিয়া ওই হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। এমনকি এ হত্যায় তার ভূমিকা নিয়ে তিনি গর্ববোধও করেন।
সিসোদিয়া বলেন, ‘আমি জেল কর্তৃপক্ষকে বলেছি, তারা গরু হত্যা করেছে, তাই আমি তাদেরকে হত্যা করেছি। আমি জেলে যাওয়ার ভয় করিনি। জেলার যখন আমাকে জেলে আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন আমি তাকে এই জবাব দেই। জেলার আমার কথা শুনে অবাক হয়।’
পাঁচ সপ্তাহ জেলে থাকার পর সিসোদিয়া জামিনে মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাকে জেল থেকে নেওয়ার জন্য ৩-৪টি গাড়ি এসেছিল। রাস্তার পাশে মানুষ আমার নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিল। তারা আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। আমি খুবই গর্ববোধ করেছি। আমার দল তৈরি আছে। কেউ যদি গরু জবাই করে, আমি তাদেরকে হত্যা করব। আমি হাজারবার জেলে যেতে রাজি আছি।’
পুলিশও তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জানিয়ে সিসোদিয়া বলেন, ‘পুলিশও আমাদের পক্ষে, কারণ সরকার আমাদের পক্ষে। তা না হলে আজম খান ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা এত সহজে মুক্তি পেতাম না।’ (সমাজবাদী পার্টির নেতা আজম খান উত্তর প্রদেশের সাবেক মন্ত্রী ছিলেন।)
কাশিমকে হত্যার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু মানুষ কাশিমকে পানি পান করাতে চাইছিল। কিন্তু তখনই সিসোদিয়ার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সে বলছিল, ‘সে গরু হত্যা করেছে। তার পানি খাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আমার মানুষজন তাকে প্রতি মুহূর্তে হত্যা করবে। আমি ভেবেছি কাশিম মারা যাবে, সামিউদ্দিনের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল।’
হাপুর এলাকা থেকে থেকে এনডিটিভির সাংবাদিকরা যান রাজস্থানের শহর বেহরোরে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গরু আমদানির অভিযোগে এখানে পেহলু খান নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় পুলিশ ৯ জনকে আটক করে। তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত।
অভিযুক্তদের একজনের নাম ভিপিন যাদভ। অন্যান্য অভিযুক্তদের মতো তিনিও আদালতে দেওয়া জবানবন্দীতে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা গবেষকদল হিসেবে পরিচয় দেওয়া এনডিটিভির সাংবাদিকদের কাছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন ভিপিন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে টানা দেড় ঘণ্টা পিটিয়েছি। প্রথমে মাত্র ১০ জন মানুষ ছিল। কিন্তু পরে মানুষ আরও বেড়েছে।’
তার পুরো কথোপকথন এনডিটিভির গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়।
ভিপিন বলতে থাকেন, ‘তারা প্রথমে গরুবাহী ট্রাকটি থামায়নি। তাই আমি ট্রাকে উঠে গিয়ে ট্রাকের চাবি খুলে নেই। এরপর মানুষ তাকে নামিয়ে পেটানো শুরু করে। তাকে খুব জঘন্যভাবে পেটানো হয়েছে।’
সূত্র : এনডিটিভি


