আসামে ৪০ লাখ মানুষের কান্না

আসামে ৪০ লাখ মানুষের কান্না

পাথেয় ডেস্ক : কয়েক দশকের পুরনো একটি প্রচারণার অংশ হিসেবে এনআরসি তৈরি করা হচ্ছে রাজ্যে নথিবহির্ভূত অভিবাসীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে জানিয়ে শান্তি ও মানবাধিকারকর্মী; লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক-গবেষক হার্শ মেন্ডার-এর একটি নিবন্ধে আল জাজিরায় প্রকাশিত খবরে বলা হয় আসামে বাস করা ৪০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত না করার মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যকে ৩০ জুলাইর পর হাঙ্গামার দিকে ঠেলে দেয়া হল। দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া (আরজিআই) কর্তৃক ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস (এনআরসি) নামক প্রকাশিত খসড়া তালিকাটিতে বলা হয়েছে সীমান্ত প্রদেশ আসামে বসবাসকারী ৩২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ২৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণকারী কাগজপত্র দাখিল করতে সক্ষম হয়েছে।

নিবন্ধে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ও সেটা ধীরগতিতে চলমান ছিল। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাঙালি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদেশিবিরোধী আন্দোলন হয় আসামে। আসাম মুভমেন্ট নামে পরিচিত আন্দোলনটি মূলত ছিল ছাত্র গ্রুপগুলোর পরিচালিত। তাদের দাবি ছিল অবিলম্বে সব বিদেশিকে ‘আটক, নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া ও দেশ ছাড়া’ করতে হবে। আন্দোলনটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, যখন আসামের সেন্ট্রাল নেলিয়ে জেলার গ্রামাঞ্চলজুড়ে ২ হাজারের বেশি বাঙালি মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। এর দুই বছর পর ১৯৮৫ সালে নয়াদিল্লিতে ভারত সরকারের প্রতিনিধি ও আসাম মুভমেন্টের মধ্যে ‘দ্য আসাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে আসামের ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস অধ্যায়টির সমাপ্তি টানা হয়। চুক্তিটি একই সঙ্গে আন্দোলনের নেতাদের একটি রাজনৈতিক দল গঠন ও পরে আসামে সরকার গঠনের পথ তৈরি করে দেয়।

দ্য আসাম চুক্তিতে সরকারের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল, যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আসামে প্রবেশ করেছে, পদ্ধতিগতভাবে তাদের চিহ্নিত করা, নাগরিকত্বহীন ও দেশ ত্যাগে বাধ্য করা। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকে আসামের সরকারগুলো বিদেশিদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়েছে; কিন্তু এ ধরনের তালিকা সবসময় কয়েক হাজারে সীমিত ছিল।

মেন্ডার তার নিবন্ধে দাবি করেন, ২০০৫ সালে রাজ্য থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নাগরিকত্বের দাবি প্রমাণের বৈধতার দায় রাজ্য থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বিতর্কিত প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করেছে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ থেকে নির্বাচনী প্রচারণার বক্তব্যগুলোতে আসাম থেকে বাঙালিদের বের করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এমনকি তিনি অভিযোগ করেছিলেন আসামি গণ্ডারদের মেরে ফেলা হচ্ছে বাংলাদেশিদের জায়গা করে দেয়ার জন্য। মমতা বলেছেন, ১৯৭১ সালে তিনি বা তার পিতামাতা ভারতের নাগরিক ছিল কিনা, তিনি নিজেও তা প্রমাণ করতে পারবেন না। নারীদের জন্য এ প্রক্রিয়া আরও বেশি কঠিন।

আসামে ১০০ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল আছে এবং এর এক-তৃতীয়াংশ বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ট্রাইব্যুনালগুলো স্বাধীন কোনো বিচারিক কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত হয় না, তবে সরকার কর্তৃক স্বল্পমেয়াদে সেখানে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়। সর্বোপরি, এ আইনজীবীদের বেশির ভাগই আদিবাসী আসামি নাগরিক সম্প্রদায়ের লোক। ফলত এসব ট্রাইব্যুনাল এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের সহায়তার জন্য ভালো কিছু করবে বলে আশা করা যায় না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *