কাউসার মাহমুদ : কবিদের ঘরেই সবার আগে শারদীয় হাওয়া লাগে। শরৎ বেঁচে আছে বলেই প্রকৃতি এত সুন্দর-মায়াবী। কবিরা অনুভব করে ‘টুপটুপ ‘অথবা রিমঝিম শব্দ। এমন এক অনুভবের কথা জানা যায় বিখ্যাত কবি ‘বেই জুলির কবিতায়’। ‘শরতের বৃষ্টির রাতে ঘুম’ কবিতায় তিনি তার সমস্ত উচ্ছাসের কথা নিংড়ে দিয়েছেন এভাবেই, ‘শরতের তৃতীয় মাসের বৃষ্টির রাত/বেশ ঠাণ্ডা/শান্তিময়ও/এক একাকি বৃদ্ধ দেরিতে ঘুমাতে গিয়েছে/কূপির আলো নিভে গেছে/বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে তার সুন্দর ঘুম হলো/আগুনের তাপে ঘরের ভেতরটা গরম হয়ে উঠছে/যখন ভোর হলো/চারিদিকে স্নিগ্ধতা আর শীতলতা/বৃদ্ধের ঘুম ভাঙলো না/গাছ থেকে ঝরেপড়া লাল পাতারা সিঁড়িটি ঢেকে দিয়েছে।’
দু ফু নামের আরেক চাইনিজ কবি ‘ওটাম মেডিটেশান’ নামে সিরিজ কবিতা লিখেছেন। তাতে তিনি পাহাড়,অন্ধকার,আকাশ,মেঘ,অশ্রু,পাথর আর সন্ধ্যার মিশেলে তৈরি করেছেন ভাবনার এক অন্যরকম আবহ। ছড়িয়ে দিয়েছেন বোধের নিগূঢ়তা। কবি কাও কাও ‘শিয়ামেন থেকে হেঁটে-যাওয়া এবং নীল সমুদ্র দেখা’ শীর্ষক কবিতায় সাজিয়েছেন পূবমুখি পাহাড়ের নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা সবুজের টাওয়ার আর নীল সমুদ্রের পানির গীতল নাচন। তিনি চাঁদ-সূর্যের নিবিড় ভ্রমণ আর ঢেউয়ের নেচেওঠার মধ্যে খুঁজেছেন শরৎকালের তাৎপর্য ও সৌন্দর্য। যেন নিজের ভেতরেই অনুরণিত করেছেন শরতের স্নিগ্ধতা।তুরস্কের কবি আত্তিলা ইলহান তাঁর ‘মাই নেম ইজ ওটাম’ কবিতায় লিখেছেন: ‘এটা কীভাবে সম্ভব/চারিদিকে পামগাছের ফুল ঝরছে/আলোর রাজ্যে সাঁতার কাটছে— যতদূর তুমি দেখতে পাও/তোমার চোখে শান্তি বয়ে যায়/যাইহোক, এটা শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় গড়ায়/আমার পাতাগুলো মাটিতে পড়ছে— ধীরে ও আলতোভাবে/আমার নাম শরৎকাল।’— কবিতাটিকে বলা চলে দ্য ডেফিনেশান অব শরৎকাল!
শরতের প্রতিটি ভোরই মোহনিয়া মোহময়। ভোরবেলা শিউলির শরীর খুলে ফুটে থাকা আর সারা পথজুড়ে ধবধবে সাদা হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য এক অপার্থিব মোহাচ্ছন্নতায় ঘিরে রাখে তার দর্শককে। সকলমুখো ফুলদের প্রতিটা পাতাতেই লেগে থাকে ফোঁটা ফোঁটা জল। বনফুল থেকে উড়ে আসা ভেজা গন্ধ নাকে নিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় পৃথিবীর আদিগন্ত পথ। এমন ভোর ও মিলিয়ে যাওয়া দুপুর, রোদ নরম হয়ে ঝিমধরা বিকেল আর একেকটি মায়ময় সন্ধ্যা তৈরী হয় শুধু শরতেই। তবে শরত, শরত হয়ে ওঠে যেন এর কাশফুলে। বাতাসে মিহি দোল খেতে খেতে একপাশে নুয়ে পড়া কাশফুল যখন আবার সোজা হয়। মনে হয় প্রেমোন্মুখ ক্লিভেজ ছড়িয়ে দেয়া প্রেমিকা ধীরে ধীরে আবার নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে প্রেমিকার দু’বাহুর ভেতর। কাশফুল আর শাড়ীর আচলে লেগে থাকা বাতাস একই ভঙ্গিমায় উড়ে যায় আরেকটু ধীর হয়ে।
কবিরা বলেন, শরত নাকি প্রেমিকার কাছে প্রেম নিবেদনের শুভকাল। প্রথম সাক্ষাৎ আর শুভদৃষ্টির মৌসুম এটি। শরত আর প্রেমিকা দুটো যেন একই। বিখ্যাত কবি ‘ফার্মারজ বেঘারির’ তাই লিখেছেন। নিজের অনুভূতিকে শরতে ডুবিয়ে দিয়ে ‘মাই ওটাম গার্ল’ কবিতায় কবি বলছেন; ‘‘তোমার শরৎ ঠোঁট, শরৎ চুল, শরৎ চোখ, শরৎ হাসি, শরৎ গ্রীবা— আমি শরৎকালে স্রষ্টাকে চুম্বন করি।’
লেখক : কবি


