পরকীয়া কোনো অপরাধ নয়: ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট

পরকীয়া কোনো অপরাধ নয়: ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট

পাথেয় রিপোর্ট : ইংরেজ শাসনকালে তৈরি পরকীয়া আইনের ৪৯৭ ধারা অসাংবিধানিক এবং পরকীয়া কোনো অপরাধ নয় বলে রায় দিয়েছেন ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট। প্রায় ১৫৮ বছরের পুরনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় সভ্যতা কোনদিকে নিয়ে গেল, তাই এখন দেখবার! কিছু মানুষের একান্ত চাহিদাকে অধিকার দিতে গিয়ে সামগ্রীকভাবে সব মতাদর্শের ভারতীয়দের বিরুদ্ধেই কী আদালতের এ রায় নয়! এখন এমনি প্রশ্ন রাখছেন ভারতের বিভিন্ন ধর্মের বৌদ্ধারা।

১৮৬০ সালে ব্রিটিশদের তৈরি করা এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই এ রায় দেন দেশটির শীর্ষ আদালত।

১৮৬০ সালের ওই আইনে বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি কোনো মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এবং ওই মহিলার স্বামীর অনুমতি না থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই আইন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। মহিলাদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে। স্বামী কখনই স্ত্রীর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না।

রায়ে বলা হয়েছে, পরকীয়া (অডাল্টি) ডিভোর্সের একটি বড় কারণ হতে পারে, তা নিয়ে সংশয় নেই। তবে এটা কোনোভাবেই অপরাধ নয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, যে আইন ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারীদের সমানাধিকারের দাবিকে কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ করে, তা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান বিরোধী।

পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে ছিলেন আর এফ নিরিমন, এ এম খানউইলকর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় ও ইন্দু মালহোত্রা। আদালতে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন, যদি কোনো পুরুষ কোনো বিবাহিত নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। তিনি আরও জানান, যে সব আইন ব্যক্তিগত মর্যাদায় আঘাত করে, নারীদের সমানাধিকারে বাধা দেয়, তা সাংবিধানিক হতে পারে না।

যদিও কেন্দ্র এই আইনটির বিরোধিতা করে বলেছিল, বিয়ের যে সনাতন রীতি, তাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য পরকীয়াকে অপরাধ বলে ঘোষণা করাটাই কাম্য। এই আইনে পুরুষ এবং নারীদের সমানভাবে দেখা হয় না বলে যে পিটিশনটি দাখিল করা হয়েছিল, তার বিরোধিতা করেই এই কথা বলেছিল কেন্দ্র।

আগস্ট মাসে এই মামলার শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টে। কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়, পরকীয়া সামাজিকভাবে অপরাধ। এর ফলে ওই ব্যক্তির সঙ্গী, সন্তান ও পরিবারের উপর প্রভাব পড়ে। তাদের ক্ষতি হয়। ভারতীয় সমাজে বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। সেটি কোনোভাবেই খণ্ডন করা উচিত নয়। তার উপর এমন আবেদনও জমা পড়েছিল, ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী পরকীয়ায় লিপ্ত হলে শুধু পুরুষেরই শাস্তি হবে। নারীদের কোনো শাস্তি হবে না।

তবে এ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেই ২০১৭ সালে সুপ্রিমকোর্টে মামলা করেন জনৈক যোশেফ শাইন। তার পক্ষের আইনজীবী হিসেবে ছিলেন রাজ কালিশ্বরম। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এ রায়ে আমি খুশি। আমরা আনন্দিত যে, নারীরা তাদের আরেকটি অধিকার ফিরে পেয়েছে। এ বিষয়ে তারা তাদের মতোই চলতে পারবে। কারো এ ইচ্ছাকে আর কেউ অপরাধ বলতে পারবে না।

এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও হয়। মামলাকারীর দাবি ছিল, ঔপনিবেশিক শাসনকালে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো মহিলাকে। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছিল এ আইন।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, কারও যৌনতার অধিকারকে আইনি পরিসরে বেঁধে দেয়া ঠিক নয়। কাউকে সমাজের ইচ্ছানুযায়ী ভাবতে এবং কাজ করতে বাধ্য করার অর্থ তার স্বাধীনতা খর্ব করা। এটি মহিলাদের অধিকার রক্ষা এবং সমানাধিকারের পরিপন্থী। তাই কেউ যদি পরকীয়া করে বা স্বেচ্ছায় যৌনাচারে লিপ্ত হয় তাহলে তার অাইন বেঁধে দেয়া ঠিক নয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতীয় সুশীলরাও। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সবাই এই রায়কে সমর্থন জানিয়েছেন। সুশীলদের এ সমর্থন পরকীয়ায় বিশ্বাসীদের পক্ষে গেলেও, তা যে খুব সুখকর ও আনন্দের নয় তাই জানিয়েছেন গুণীজনরা। এটিকে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সভ্যতার বিরুদ্ধ বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *