মওজুদা হালত ও একটি ওয়াজাহাত

মওজুদা হালত ও একটি ওয়াজাহাত

ওয়ালী উল্লাহ মাসুদ : দারুল উলূম দেওবন্দের ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন যে, কাসেমুল উলুমওয়াল খায়রাত হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত কাসেম নানুতবী রহ. এর চিন্তা-চেতনার সার্থক অনুসারী এবং তার দর্শনের বাস্তবে রূপায়নকারী হলেন শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী র.। হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর চিন্তা-চেতনার কঠোর বিরোধী ছিলেন তারই এক প্রিয় শাগরিদ।

যদিও তার প্রিয় শাগরিদ তার সম্পর্কে কোন দিন কোন কটূক্তি করেননি। তার শাগরিদের ভক্তকুল শায়খুল হিন্দ-কে শায়খুল হুনুদ এবং শায়খুল হিন্দু বলত। আল্লহর কি অপার মহিমা শায়খুল হিন্দের ইন্তিকালের পর তার চিন্তা-চেতনার কঠোর বিরোধী শায়খুল হিন্দকে ‘শায়খুল আলম’ উপাধি দিয়েছিলেন।

শায়খুল হিন্দ জীবিত থাকতেই তার জানেশীন বা উত্তরসূরী হিসেবে বরিত ছিলেন শায়খুল আরব ওয়ালআজম, শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ রহ.। তাঁকেও বড় কাটারা এবং লালবাগ থেকে কাফের ফতওয়া দেয়া হয়েছিল। মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি রহ. সফরে ছিলেন। পরে হযরত ফরিদপুরী রহ. লালবাগ এবং বড় কাটারার পক্ষ থেকে হযরত সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সফর থেকে ফিরে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে ভুল শুধরে নিয়েছেন।

সনটা আমার মনে নেই, পীর জঙ্গী মাজার সংলগ্ন রাস্তায় ফিদায়ে মিল্লাত হযরত সায়্যিদ আসআদ মাদানী রহ.কে প্রধান অতিথি করে এক মহা সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। তৎকালীন বাংলাদেশের প্রখ্যাত এক শায়খুল হাদীস ফিদায়ে মিল্লাত সম্পর্কে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, তিনি আবার সায়্যিদ হলেন কবে?’ তখন সন্দ্বীপের পীর হযরত ইদ্রিস সন্দ্বীপি রহ. মুখ ভেংচি দিয়ে বলেছিলেন, তুমি মনে হয় আজকে শুনলে? তুমি জান না, তিনি আওলাদে রাসূল স. কিনা!’ মাওলায়ে পাকের কুদরত পরবর্তী বছর ফিদায়ে মিল্লাত বাংলাদেশে আসার প্রোগ্রাম হলে তাকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য প্রাইভেটকার এবং বাস নিয়ে ওই প্রখ্যাত শায়খুল হাদীসকে এয়ারপোর্টে উপস্থিত হতে দেখেছি।

আমার খুব আফেসোস হয়, হযরত উলামায়ে কেরাম এমন কেন করছেন, মাসআলা বা দর্শনগত বিরোধ থাকতেই পারে তাই বলে আগপাছ না ভেবেই একেকটা অমূলক কথা বলে ফেলেন কীভাবে?

উলামায়ে কেরামের কাছে শুনেছি, একমন ইলম এর জন্য দশমন হিলম দরকার, মানে একমন ইলমে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে কুরআান হাদীসের জ্ঞানের চেয়ে দশগুন বেশী দরকার আনুসঙ্গিক জ্ঞান। হযরত উলামায়ে কেরাম আমাদের মাথার তাজ, তাদের কুরআন হাদীসের জ্ঞানকে সম্মান রেখেই বলছি দুনিয়া উপকরণের স্থান সুতরাং ইতিহাস পাঠটা ভাল করে চুকিয়ে নিন। তাহলে হয়তো এমন উলট পালট কথা তাদের মুখ থেকে কমই বের হবে।

বর্তমানে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা. বা.কে নিয়ে ফেসবুক কিছু আলিম ও তলাবা যা মন্তব্য করছেন তা কি উলামায়ে কেরামের জন্য মানায়! উলামায়ে কেরাম তো রাসূল স. এর ওয়ারিশ। আর রাসূল স. বলেছেন আল্লাহ তাআলা আমাকে সর্বোচ্চ আখলাক প্রতিবিধান এর নিমিত্তে প্রেরণ করেছেন। আজকাল আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দাঃবাঃ সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা কি উত্তম আখলাকের নমুনা?

আজকে ফেইসবুকে লগইন করেই দেখি উস্তাজুল উলামা ফিদায়ে মিল্লাত সায়্যিদ আসআদ মাদানী রহ. এর অন্যতম খলিফা কিংবদন্তি শায়খুল হাদীস বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ইসলামিক স্কলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক গবেষক আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সম্পর্কে এক পুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করল ‘তিনি কি ইসলামের কোন খেদমত করেছেন? তিনি তো সবসময় ইয়াহুদী খৃষ্টানের পক্ষে কাজ করেন!’ খুব হাসি পেল আমার, এরা কি চোখ থাকতেও দেখে না, কান থাকতেও শুনে না? এরা অন্ধ না বধির! এদের কি সত্য স্বীকার করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে?

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ইসলামের জন্য যা যা করেছেনে তা যুগ যুগ ধরে ভাস্বর হয়ে থাকবে। সামান্য দু’একটা বলছি তিনি আজ ৪৭ বছর পর্যন্ত অবৈতনিক বোখরী শরীফের দরস দিচ্ছেন। হযরত হাকীম আখতার সাহেব রহ. এর খলিফা বিশিষ্ট বুযুর্গ মুফতি নুরুল আমিন (পীর সাহেব খুলনা) এর একটি উক্তি মনে পড়ে গেল। একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, মুহাদ্দিসে আজীম মাওলানা কাজী মু’তাসীম বিল্লাহ রহ. এবং আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদই (দাঃবাঃ) আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

১৭ জুলাই ২০১৭ গণভবনে যখন হযরত উলামায়ে কেরাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কি বলবেন হিমশিম খাচ্ছিলেন তখন একমাত্র আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদই প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, হেফজত নিয়ে প্রশাসন ও আলেম উলামাদের মাঝে ভুল বোঝবুঝি ছিল সুতরাং আলেম উলামাদের নামে হেফাজত সংক্রান্ত যে মামলা হয়েছে তা তুলে নেয়ার জন্য আহবান জানাচ্ছি। শোকরানা মাহফিলে তিনিই আলেম-ওলামা, ইমাম-মুয়াজ্জিন এর জন্য কথা বলেছিলেন আর অন্যরা তো তৈলমর্দনে ব্যস্ত ছিল।

একটু পেছনের দিকে তাকাই আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দাঃবাঃ এর সাথে শায়খ আবুল ফাতাহ আবু গুদ্দাহ’র গর্বের উস্তাদ হযরত মোস্তফা যারকার সাথে ফিকহি মাসআলায় মতানৈক্য হয় তখন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দাঃবাঃ এর বয়স মাত্র ২৮ বছর আর শায়খ মোস্তফা যারকা আরবের প্রখ্যাত শায়খ। ৪৫ খণ্ডে আরবী ভাষায় তার বিশাল ফিকহি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আরবের বরেণ্য পণ্ডিত এবং মুফতিয়ানে কেরাম একত্র হয়ে যাচাই বাছাই করে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ-এর মতামতকে গ্রহণ করেছেন। শায়খ আহমদ যারকা রহ. এর মতামত গ্রহণযোগ্য হয়নি।

শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ এর উস্তাদ মোস্তফা যারকা রহ.। যিনি আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের পাণ্ডিত্যের কাছে পরাভূত হয়েছিলেন। আর বাংলাদেশে শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ এর এক শাগেরদ আছেন যাকে নিয়ে নাচানাচি আর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে গালাগালি- হায়রে অভাগার দল!

শনিবার তাবলীগ জামাতের দুপক্ষ টঙ্গীতে যা ঘটাল তা হৃদয় বিদারক দুঃখজনক! একশ্রেণির লোক এখানেও আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে টেনে আনেন। তিনি নাকি এ্যাটাক করিয়েছেন! কতবড় নির্জলা মিথাচার। প্রিয় রাসূল স. বলেছেন মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে শুনে বলে দিবে কোন যাচাই বাছাই করবে না।

মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে দারুল উলূম দেওবন্দ তামবীহ/হুঁশিয়ার করেছেন। সাআদ সাহেব যে রুজু করেছেন তার উপর যেন তিনি অটল অবিচল থাকেন, বিচ্যুতি যেন না ঘটে। তাই দারুল উলূম দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ বলেছেন আমরা আপনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাশীল নই।

দারুল উলুম দেওবন্দ কোথাও বলেনি যে মাওলানা সাদ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে খারিজ । এমন কোন দলীল কেউ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে দেখাতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘দেওবন্দ যতটুকু বলেছে আমিও ততটুকু বলব। দেওবন্দ তাকে গোমরাহ বললে আমিও তাকে গোমরাহ বলব, দেওবন্দ থেকে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে খারিজ বললে আমিও বলব! দেওবন্দ তাকে আহলে সুন্নত জামাত থেকে খারিজ বলেছে এমন কোন দলিল আমার কাছে নেই। তাই আমি মাওলানা সাদকে আহলে সুন্নত জামাত থেকে খরিজ বলছি না। এটাই আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের দোষ ততাকথিত কিছু…….. লোকের কাছে।

আমি পেছনে উল্লেখ করেছি যে, হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর চিন্তা-চেতনার কঠোর বিরোধী ছিলেন তারই এক প্রিয় শাগিরদ। যদিও তার প্রিয় শাগিরদ তার সম্পর্কে কোন দিন কোন কটূক্তি করেননি। কিন্তু তার শাগরিদের ভক্তকুল শায়খুল হিন্দ কে শায়খুলহুনুদ এবং শায়খুল হিন্দু বলত। আজও দেখি একই অবস্থা দারুল উলূম দেওবন্দের নাম দিয়ে যা বলা হচ্ছে অথচ দেওবন্দ বলেননি এটা কি মিথ্যাচার নয়? তাদের আরেকটি প্রশ্ন হলো আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ কেন তাবলীগ ওয়ালাদের মসজিদ থেকে বের করে দেন না! প্রশ্নটা হাস্যকর ও অবান্তর বৈকি, যারা মসজিদে আসে আল্লাহ এবং রাসূল, নামাজ-রোজার কথা বলতে তাদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন, এটা কি উসওয়ায়ে রাসূল স.? আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন ‘তার চেয়ে অধিক অত্যচারী-জুলুমবাজ আর কে আছে, যে আল্লহর মসজিদে তার নামের জিকির থেকে বাধা প্রদান করে এবং তার ঘরকে বিরাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাদপন্থী হোক কিংবা শুরাপন্থী হোক কাউকেই মসজিদ থেকে বের করার পক্ষপাতী নন। তার ভষায় আমি না ওজাহাতি না এতাআতী আমি উম্মতে মুহাম্মদি। তিনি উভয় পক্ষকে এক করার জন্য মাওলানা ইব্রাহীম দেওলা, আহমদ লাট এবং সাআদ সাহেবের সাথে সৌদিতে বৈঠক করেছেন। তিনি উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে ফাটল দেখতে চান না। চান না তাবলীগ নামের এই মোবারক কাজের মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট করতে, তিনি বারবার বলছেন এক হও নেক হও।

বিশৃঙ্খলাকে তনি কখনো পছন্দ করেননি। তার ছাত্র জীবনে যখন জামিয়া এমদাদীয়া কিশোরগঞ্জে উস্তাদদের মধ্যে বিবেদ হয়েছিল তখনও তিনি কোন পক্ষাবলম্বন করেননি। এই উসূল তো আমরা পাই হযরত ইবনে উমর রা. এক কথায়। জঙ্গে সিফ্ফীনে হযরত ইবনে ওমর রা.কে একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন- ওহে ইবনে ওমর! কিসে তোমাকে বসিয়ে রাখল। কেন তুমি জিহাদে যাওনা? অথচ সমাজ বিশৃঙ্খলার অতল তলে তলিয়ে যাচ্ছে। হযরত ইবনে ওমরের কথাটাই আজকের এই পরিস্থিতিতে প্রনিধানযোগ্য তিন বলেছিলেন ‘ আমরা জিহাদ করেছিলাম সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা দূর করতে আর তোমরা জিহাদ কর বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত কাসেম নানুতবী রহ. এর দর্শনের ভিত্তিতে। হযরত নানুতবী রহ. দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উম্মতি মুহাম্মদিকে ‘উম্মতেওয়াসাতা’ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী উম্মতহ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। যারা কখনো আবেগ নয়, জজবা নয়, দ্বিন কে বুঝবে কুরআন-হাদীসের আলোকে, সাহাবায়ে কেরামের স্বর্নখচিত জীবনধারার আলোকে কিন্তু আজ এ’কি দেখছি?

অবশ্য এটাও অনস্বীকার্য যে হযরত নানুতবী রহ., শায়খুল হিন্দ তারপর শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী রহ. তাদেরই ধারায় ফিদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ. এবং ফিদায়ে মিল্লাতের খলিফা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ কখনো মধ্যপন্থা অবলম্বন থেকে বিচ্যুত হয়নি।

আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়তের উপর অটল অবিচল রাখুক।

লেখক : তরুণ আলেম ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *