অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ● ব্রিটিশ ভারতে যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হয়, তার মূলে ছিল- জমি জমিদারেরই উত্তরাধিকারগত সম্পত্তি। সরকারকে রাজস্বের একটা ভাগ দিয়ে জমিদার এ সম্পত্তি ভোগ করবেন। যত দিন তিনি শর্তটা মেনে চলবেন, তত দিন পর্যন্ত মালিকানা তারই। যেমন ইচ্ছা তা ব্যবহার করতে পারবেন।
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০১৭-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বেসরকারি ব্যাংকেও অনেকটা একই ব্যবস্থার সূত্রপাত হচ্ছে। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কোনো পরিচালকের তিন বছর করে দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকলেও সংশোধিত আইনের খসড়ায় তা একনাগাড়ে নয় বছর করা হয়েছে। তিন বছর বিরতি দিয়ে পরিচালক হওয়া যাবে আবারও।
সংশোধনীতে ব্যাংকে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগও অবারিত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজনের পরিচালক পদে থাকার সুযোগ রয়েছে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় তা সর্বোচ্চ চারজন করা হয়েছে। যদিও ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়মের নানা অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংক পরিচালকদের সুযোগ বাড়িয়ে আইন সংশোধনে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০১৭-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর মধ্য দিয়ে মূলত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকদের দাবিই মেনে নেয়া হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নতুন সংশোধনী পাস হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধূরী এ প্রসঙ্গে বলেন, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দিক থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের পরিবর্তন আমরা কখনই ভালো চোখে দেখি না। এমনিতেই দেশের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশের ২৫-২৬টি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের অর্ধেক ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া অবস্থায় যদি ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের সংশোধনী আনা হয়, তাহলে সেটি অপ্রত্যাশিত।
তিনি বলেন, এমনিতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব নেই। নতুন সংশোধনী পাস হলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপরও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃত্ব হারাবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের পরিবর্তন আনার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার দরকার ছিল। সে ধরনের কোনো সংলাপ ছাড়াই নতুন সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
যদিও তাদের দাবির কোনোটিই অযৌক্তিক নয় বলে মনে করেন বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তারা। বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, পাঁচ-সাত বছর ধরেই আমরা ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক হওয়ায় সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা ব্যাংক তৈরি করলাম। পরে যদি আমরাই ব্যাংকে না থাকতে পারি, তাহলে তা চালাবে কে? আমার তৈরি করা বাড়ির প্রতি আমার মায়া-দরদ যে ধরনের থাকবে, সেটি অন্যদের থাকার কথা নয়। দেশের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বতন্ত্র পরিচালকরা ব্যাংক পরিচালনা করবেন। কিন্তু তারা পরিচালনা করলে ব্যাংক ভালো থাকবে, এর নিশ্চয়তা কে দেবে? ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যের ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত নয়। বিশ্বে অনেক ব্যাংক আছে, যেগুলো একটি পরিবার দিয়েই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
জানা গেছে, বিএবির দাবি ও তোড়জোড়ের মুখেই ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বিএবির প্রস্তাব বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একাধিকবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চেয়েছিল। প্রতিবারই বাংলাদেশ ব্যাংক নেতিবাচক মত দিয়েছিল।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী অনুমোদনের পর মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, একই পরিবার অর্থায়ন করে, ইনভেস্টমেন্টও তারাই করে। পারিবারিকভাবে ইনভেস্ট করে, এজন্য তাদের এফিলিয়েশন বা মায়া থাকে। ব্যাংক মালিকদের দাবি ছিল, যারা প্রতিষ্ঠাকালে পরিচালক হিসেবে ইনভেস্ট করেন, তাদের পরে কিছু বলার থাকে না। অন্য লোকজন এসে মাঝখানে কিছু নিয়ে চলে যায়। যারা ফাউন্ডিং ডাইরেক্টরস, তাদের যেন একটা ভূমিকা থাকে।
মেয়াদের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক একনাগাড়ে নয় বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার নয় বছর থাকতে পারবেন। তিন বছর গ্যাপ দিয়ে দিয়ে নয় বছর করে কারও আমৃত্যু ব্যাংক পরিচালক থাকতে আইনে কোনো বাধা নেই।
একই পরিবার থেকে কোনো ব্যাংকে চারজন পরিচালক থাকলে ‘ভালো-মন্দ দুটোই হতে পারে’ মন্তব্য করে শফিউল আলম বলেন, ‘ভালো মানুষরা হ্যান্ডেল করলে ভালো হবে’। তাতে অনিয়ম বাড়বে কিনা, এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘দেখা যাক, ভবিষ্যৎই বলে দেবে’।
১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস হওয়ার পর বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ সম্পর্কিত ধারাটি এখন পর্যন্ত পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। এ ধারায় ব্যাংকের পর্ষদে একজন পরিচালক কত বছর পরিচালক থাকতে পারবেন, তা বলা রয়েছে। ধারাটি সর্বশেষ ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়েছিল।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে তিনটি ধারার পরিবর্তনে বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্মতি দিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, সবাই সম্মতি দিয়েছেন, ভালো হবে বলেই ভেবেছে সবাই; সেজন্যই সম্মতি দিয়েছে। স্টেকহোল্ডার যারা আছেন, সবাই এর সঙ্গে একমত হয়েছেন।
সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাচন বা মনোনয়নের পর তাকে নিয়োগ দেয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। পরিচালক পদে সরকার কাউকে মনোনয়ন দিলে তার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। কোনো ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাউকে নির্বাচিত বা মনোনীত করার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তা অনুমোদন না দিলে তার নিয়োগ হবে না।


