কার হাতে বাংলাদেশের রাজনীতি?

কার হাতে বাংলাদেশের রাজনীতি?

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কার হাতে! কার ইশারাতে চলছে এ দেশের রাজনীতি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষে কারোর হাতে নেই৷ এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদের ভূমিকা নেই বললেই চলে৷ তাহলে কে বা কারা নিচ্ছে সিদ্ধান্ত? কাদের হাতেই বা রাজনৈতিক চাবিকাঠি?

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পরে এই প্রশ্ন আরো প্রকট হয়েছে৷ সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আর বিএনপি’র সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এর মূলসূত্র বিষয়টিকে আরো বেশি স্পষ্ট করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে৷ সরকার দলের ব্যাপারে অনেকটা পরিস্কার যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া কিছু হয় না৷ আর দল হিসেবে বিএনপি’র সিদ্ধান্ত নেয়ার আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কিনা তাও ভাবার বিষয় যদিও বিএনপিতে খালেদা পুত্র তারেকের নির্দেশেই প্রায়ই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে ধারনা করা হয়। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির এই ধারায় ব্যক্তি আসলে কাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন? তারা কি আদৌ রাজনীতিবিদ?

বাংলাদেশের রাজনীতির পর্যবেক্ষক এবং গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, কোনো দলের রাজনীতিই আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই৷ এর নিয়ন্ত্রক এখন সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি এবং বিত্তশালীরা৷ আর সাধারণ মানুষও রাজনীতিতে নেই৷ তাদের গুরুত্বও নেই৷ ফলে যা হবার হয়েছে৷ রাজনীতি চলে গেছে রাজনীতিবিদদের হাতের নাগালের বাইরে৷

তিনি বলেন, রাজনীতি বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন৷ শাসন করার ক্ষমতা যার হাতে তিনি রাজনীতিবিদ৷ রাজনীতি শাসন করে৷ আর সেই দিক থেকে রাজনীতিকে বিবেচনা করলে বোঝা যাবে রাজনীতি কার হাতে৷ এটা স্পষ্ট যে শাসন করার ক্ষমতা এখন আর একক কারুর হাতে না৷ এটা নানা গ্রুপের হাতে ভাগ হয়ে গেছে৷

আফসান চৌধুরীর মতে যারা শাসন করেন তারা হলো-

১. সবার উপরে আছে সেনাবাহিনী৷ তারা সবচেয়ে সবল৷ এটা সারা দুনিয়ায়ই এখন একই রকম৷

২. ব্যবসায়ী শ্রেণি৷ একটি শ্রেণি গত ৫০ বছরে উপরে উঠে এসছে৷ মন্ত্রীই বলেছেন ব্যাংকের টাকা মেরে দিলে তা ফেরত আনা সম্ভব নয়৷ তাহলে কাঠামোটা হয়ে গেছে চুরির কাঠামো৷

৩. আমলা শ্রেণি৷ আমরা আগে এতটা সবল ছিল না৷ ৯০-এর পরে সিভিল আমলাদের ক্ষমতায়ন হয়েছে৷

৪. প্রফেশনাল রাজনীতিবিদ৷

‘প্রফেশনাল রাজনীতিবিদরাই হলেন একমাত্র গোষ্ঠী যারা সাধারণ মানুষের (পাবলিক) ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেন৷ এখন সাধারণ মানুষের যেহেতু কোনো ভূমিকা রাজনীতিতে নেই, সেকারণে রাজনীতিবিদরা সবচেয়ে দুর্বল হয়ে গেছেন৷’

দু’টি বড় দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রসংঙ্গে আফসান চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপিতে এখন আর রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়না৷ বিএনপি’র সেই সক্ষমতাও নেই৷ একজন জেলে৷ আরেকজন দেশের বাইরে৷ সেখান থেকে যা সিদ্ধান্ত আসে তাই দলের সিদ্ধান্ত৷’

সরকার দল আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বা সরকারে রাজনৈকিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না৷ সিদ্ধান্ত নেন শেখ হাসিনা৷ আর শেখ হাসিনার প্রধান লোক এইচ টি ইমাম৷’

সিদ্ধান্ত নেয়া প্রসংঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত নেন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ৷ আর গত ৩০ বছরে বিশ্বে রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে৷ জনগণ এখন রাজনীতিতে শুধু রাজনীতিদিদের দেখতে পায়না৷ তারা আরো অনেককে দেখতে পায়৷’

এখন প্রশ্ন থেকে রাজনীতিতে এই পরিস্থিতি কি ইতিবাচক? যদি না হয় তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে? আর এই পরিস্থিতির কারণইবা কী? এসব প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শামীম রেজা বলেন, ‘বাংলাদেশে নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনের পরও যারা পেশাদার রাজনীতিবিদ তাদের প্রাধান্য রাজনীতিতে ছিল৷ তবে গত দুই-তিনটি সংসদের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো যারা দীর্ঘদিন রাজনীতিতে আছেন তাদের জায়গায় অন্য পেশাজীবীরা চলে এসেছেন৷ আমলারাও এসেছেন কোন কোন জায়গায়৷ এখন প্রশ্ন উঠতে পারে অন্য রাষ্ট্রেতো প্রেসিডেন্টও হচ্ছেন ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে কিন্তু তারা একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন৷ আমাদের এখানে ব্যবসায়ী বা আমলারা যখন সিদ্ধান্ত নেন তা তাদের স্বার্থে নেন৷ জনগণের কথা ভাবেননা৷ যারা ভাববেন সেই প্রকৃত রাজনীতিবিদরা এখন গৌণ৷’

তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন ব্যবসা করে অল্প সময়ের মধ্যে রাজনীবিদ হওয়া, দীর্ঘদিন আমলা থেকে বা কোনো বাহিনীতিতে কাজ করে রাজনীতিতে অল্প সময়ে প্রভাবশালী হওয়া কোনো ভালো লক্ষণ না৷ রাজনীতিবিদরা যে রাজনীতি পরিচালনা করার কথা সেটা না থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত নয়৷ আমার মনে হয় এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য খারাপ খবর৷’

সূত্র : ডয়চে ভেল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *