মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আমাদের এই বাংলাদেশ। মুসলিম অধ্যুষিত একটি জনপদ। যে দেশের মানুষ ইসলামকে ভালবাসে। ইসলামের ডাক শুনলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেদিকে। আমরা ইসলামকে এত ভালবাসি, কেউ যদি ইসলামের নাম দিয়ে ডাক দেয়, নিজের জান মাল নিয়ে ছুটে চলি সেদিকে।
সেই ১৯৮১ সনের কথা। আমরা তখন অনেক ছোট। প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। সে সময়ে হাফেজ্জী হুজুর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করে ছিলেন। মার্কা ছিল বটগাছ। হাফেজ্জী হুজুর এর আগে কখনো নির্বাচন করেছিলেন না। সেটা ছিল তাঁর প্রথম ইলেকশন। সেই প্রথম নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুর সারাদেশের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়ে তুলে ছিলেন। সর্বস্তরের আলেম উলামা এবং সাধারন জনতা হাফেজ্জী এর নির্বাচনী আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ছিলেন। তখনকার সময়ে মানুষের মুখে মুখে রব উঠে গিয়ে ছিল বটগাছ মার্কার কথা।
সে নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুর জয় লাভ করতে না পারলেও দেশব্যাপী আলেম উলামার এক বিশাল অবস্হান তৈরী হয়ে ছিল। ইসলামের পক্ষে আলেম উলামার পক্ষে বড় গণ জোয়ার তৈরী হয়ে ছিল।
সেই আশির দশকে সাধারণ মানুষ হাফেজ্জী হুজুরকে এমন সমর্থন জানিয়ে ছিল, যা ইতিপুর্বে আমাদের দেশে আর কখনো হয়নি।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ইসলামের পক্ষে, আলেম উলামার পক্ষে যে গণ জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, কিছুদিন পরে আর সে গণ জোয়ারে চরম আকারে ধ্বস নেমে আসল। যারাই হাফেজ্জী হুজুরের আশে পাশে থেকে আন্দোলনকে চাঙা করে ছিলেন, হাফেজ্জী এর ডানে বামে থেকে খেলাফত আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে ছিলেন, তারাই যেন সটকে পড়লেন। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল আলেম উলামার জামাত। যে খেলাফত আন্দোলনের গণ জোয়ার তৈরী হয়ে ছিল, পরবর্তিতে সেটা যেন একদম জন শুণ্যে চলে গেল। এভাবেই আস্তে আস্তে খেলাফত আন্দোলন যেন লোক চক্ষুর আঁড়ালে চলে গেল। হাফেজ্জীর ইন্তেকালের পরে তো আরো করুন অবস্হা। নামে মাত্র খেলাফত আন্দোলন। কিন্তু সারাদেশে তাদের কার্যক্রম ব্যর্থে পরিণত হল।
খেলাফত এর পরে আমাদের আলেম গণ আরো বিভিন্ন নামে ইসলামী সংগঠন করেছেন। সে গুলোতে দেশ বিখ্যাত আলেমগণের যোগদান ও লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু হাফেজ্জী হুজুর যে ভাবে দেশব্যাপি গণ জোয়ার সৃষ্টি করে ছিলেন, সে রকম গনমত আর কেউ পারেন নি। এভাবেই চলে আসছিল এদেশের আলেমগণ। বিভিন্ন নামে ইসলামী সংগঠন এর মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আহবান করে আসছিলেন।
বিগত ২০১৩ সনে আমাদের বাংলাদেশের আলেম সমাজের মুরুব্বী , লাখো আলেমের উস্তাদ, আল্লামা আহমাদ শফী সাহেব দাঃ বাঃ তিনি নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়ে ছিলেন। তিনি গঠন করে ছিলেন “হেফাজতে ইসলাম” নামে এক অরাজনৈতিক সংগঠন।
হেফাজত ইসলাম নামক এই অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে এক বড় আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলেন আল্লামা আহমাদ শফি। যে আন্দোলনে আলেম উলামা সহ সাধারণ মানুষ অংশ গ্রহন করে ছিল।
হেফাজতের ডাকে সে সময় রাজধানী ঢাকা সহ দেশ ব্যাপী এক গণ জোয়ার সৃষ্টি হয়ে ছিল। দেশের যে প্রান্তে হেফাজতের প্রোগ্রাম হত, সেখানেই লাখো লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটত। হেফাজতের সর্বশেষ বড় প্রোগ্রাম হয়েছিল ৫ মে ২০১৩ ঢাকা শহরের শাপলা চত্তরে । যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতস্ফুর্ত ভাবে অংশ গ্রহন ছিল। শাপলা চত্তরের মতো এত মানুষের সমাবেশ ঢাকায় আর কখনো হয়নি। একদম রেকর্ড পরিমাণ মানুষের সমাগম।
এই শাপলার সমাবেশ। যেটা ছিল আলেম উলামা এবং খাঁটি দ্বীনদার মানুষের জন সমাগম। সেই শান্তি পুর্ণ জন সমাগমে চোখ পড়েছিল, এক শ্রেনীর মুনাফেক চক্রের। যারা শান্তি পুর্ন সমাবেশকে বিতর্কিত করার জন্য বিশৃংখলা সৃষ্টি করে ছিল। আবার হেফাজতের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা এক অশুভ চক্র, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে ছিল।
ওরা মঞ্চে অনেক গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে সটকে পড়েছিল শাপলা চত্তর থেকে।নিরীহ মাদ্রাসার ছাত্রদের বিপদে রেখে ওরা কেউ গিয়ে ছিল লন্ডনে। আবার কেউ আন্দোলন কে বেচা কেনা করে পালিয়ে ছিল অন্যত্র।
আবার কেউ তো চেয়ে ছিল, এই নিরীহ মাদ্রাসার ছাত্রদের সিঁড়ি বানিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতে। তালেবুল গণ হোক বলির পাঠা আর ওরা পায় যেন ক্ষমতা। এই মিশন নিয়ে সেদিন শাপলার আন্দোলনকে ওরা নস্যাত করে ছিল।
যে হেফাজতের আন্দোলনে গোটা দেশের সরকার ছিল টালটামাটাল। সেই হেফাজত মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থবাদী লোকের কারণে বিতর্কিত হয়ে গেল। সেই ১৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আর হেফাজত তার আগের অবস্হানে ফিরে যেতে পারেনি।
এভাবে আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি হয়। যে জাগরনটা সৃষ্টি করেন এদেশের আলেম সমাজ। আর তাতে শরীক হন,এদেশের দেশ প্রেমিক ঈমানদার জনতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে জাগরনকে আমরা ধরে রাখতে পারিনা। এক শ্রেনীর মুনাফেক চক্র সেই গণ জাগরনকে নস্যাত করে দেয়।
এজন্য বন্ধু, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ৫ মে শাপলার সে আন্দোলন কে আমরা ভুলব না। যারা এই আন্দোলনে শরীক ছিলেন, তাদের ভুলার নয়। তবে যারা এ আন্দোলনকে নস্যাত করেছে, তাদের চিহ্নিত করে ওসব স্বার্থান্নেষী মহল থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও বিশ্লেষক


