নিজস্ব প্রতিবেদক ● দেশজুড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে ভুয়া ডিবি পুলিশ। রাজধানীতেও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে তাদের তৎপরতা। ভুয়া ডিবি পুলিশের পরিচয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। তাদের কাছে থাকে ডিবি লেখা জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ, সিগন্যাল লাইটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত সরঞ্জাম। প্রথমে তারা ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়। তারপরই হয়ে যায় ডাকাতদল, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী। নানা ধরনের অপরাধ করে বেড়ায় ওসব ভুয়া ডিবি পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অতি সম্প্রতি খোদ রাজধানীর রামপুরা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ভুয়া ডিবি পুলিশের ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, দুই রাউন্ড গুলি, দুটি চাপাতি, চারটি ছুরি, একটি ওয়াকিটকি, তিনটি ডিবি জ্যাকেট, দুটি হ্যান্ডকাফ, দুটি বেতের লাঠি, একটি ব্যাগ ও দুটি ডিবি স্টিকার উদ্ধার করা হয় এবং তাদের ব্যবহার করা দুটি কার ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। ডিবি পুলিশ পরিচয়ের সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের সদস্যদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ডিবি পুলিশ। তার আগে রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা টিপরদি এলাকা থেকেও ১০ ভুয়া গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ সদর দফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র মতে, রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ভুয়া ডিবি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত সদস্যরা। সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি চক্র সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের বেশভূষা ধারণ করে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ করছে। এমনকি অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। তাদের বেপরোয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন। ডিবি পুলিশ অনুসন্ধানে জানাতে পাওে, ভুয়া ডিবি পুলিশসহ কথিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সরা বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ছদ্মবেশে অবস্থান নেন। ওসব প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বের হলে সোর্সরা তার দৈহিক ও পোশাকের বর্ণনা মোবাইল ফোনে চক্রের সদস্যের কাছে পৌঁছে দিয়ে টার্গেটের পিছু নেন।
সুবিধা মতো জায়গায় চক্রের ছদ্মবেশী সদস্যরা টার্গেটকে হুন্ডি ব্যবসায়ি অপবাদ দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে গাড়িতে তুলে নেয়। পরে নির্জন স্থানে গিয়ে টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। ওই অপরাধীদের খপ্পওে পড়া ভুক্তভোগীরা জানায়, তাদের বেশভূষা থাকে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মতো। সাথে থাকে রিভলবার হোল্ডার, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ, পুলিশ-র্যাব-ডিবির পোশাক, নামের ব্যাজ। বহনকারী গাড়িতে থাকে পুলিশ ও ডিবির স্টিকার। তাই শত শত মানুষের সামনে থেকে তুলে নেয়া হলেও কেউ তাদের প্রতিরোধ করে না। মূলত ডিবি পরিচয়েই ব্যবসায়িসহ বিভিন্ন মানুষকে অপহরণের চেষ্টা করে ওই চক্র। এমনকি পূর্বশত্রুতা উদ্ধারের জন্যও প্রতিপক্ষরা ব্যবহার করে ভুয়া ডিবি পুলিশের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে। অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ করার সময়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে এমন ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ের অপরাধী চক্রকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সম্প্রতি পল্লবী থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়দানকারী ৫ ডাকাতকে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ডিবি লেখা জ্যাকেট, হ্যান্ডকাফ, সিগন্যাল লাইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।
সূত্র জানায়, ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী ডাকাত দলের সদস্যরা বাসা বাড়িতে ঢুকে ডাকাতি করে। আর রাস্তায় বাস, প্রাইভেটকার থামিয়ে মালামাল লুট করে। তাছাড়াও মাইক্রোবাস যোগে ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়ে গ্রাহক বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় ডিবি পরিচয় দিয়ে তাদের আটক করে। পরে সুযোগ বুঝে টাকা লুট করে নিয়ে যায় তারা। ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি করার জন্য এই সংঘবদ্ধ দলের সদস্যরা ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপরাধীরা ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে ডাকাতি, ছিনতাই করছে। চাকরিচ্যুত অনেক পুলিশ সদস্যসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, রামপুরা ও বিমানবন্দর থানায় ওসব ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, রাজধানীতে শতাধিক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ওয়্যারলেস সেটের আদলে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করছে। তারা বিটিআরসি থেকে অনুমতি নিয়ে ফিকোয়েন্সি ব্যবহার করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ওই ধরনের এক হাজারেরও বেশি ওয়াকিটকি ব্যবহৃত হচ্ছে। আর ওই সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা ওয়াকিটকি সেট সংগ্রহ করে নানা ধরনের অপরাধ করছে। সাধারণ মানুষ ওয়াকিটকি সেট হাতে দেখলে মনে করে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরিবহন থেকে শুরু করে আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখন ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার হচ্ছে। তার মধ্যে সরকারবিরোধী অনেক রাজনৈতিক নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে বিটিআরসির অনুমতি নিয়ে ওয়াকিটকি ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তারা অবৈধভাবে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ওই সুযোগে তারা বাসাবাড়িতে ঢুকে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে মালামাল লুট করে। প্রাইভেট সেক্টরের নিরাপত্তায় যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকেই অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। তাদের কারো কারো সাথে অপরাধীদের যোগসূত্র আছে। যার কারণে অনেক সময় অপরাধের কাজে ওয়াকিটকি সেটের অপব্যবহার হচ্ছে। তাছাড়াও অনেকেই ওয়াকিটকি সেটের আদলে সেট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে কৌশলে ডাকাতি করছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মিডিয়া মাসুদুর রহমান বলেছেন, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ওয়াকিটকি সেট ব্যবহার করে ডাকাতি করতে যাওয়া অনেক অপরাধীকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি সেট, হ্যান্ডকাফসহ অন্য মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। ডিবি পরিচয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতদলের সদস্যদের গ্রেফতারের বিষয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।


