কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ● কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতের কাছে জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছর ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের জামাতের সময় চর শোলাকিয়া সবুজবাগ মোড়ে মুফতি মোহাম্মদ আলী জামে মসজিদের সামনে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। কথা ছিল, বরাবরের মতো আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ঈদের জামাত পরিচালনা করবেন। হঠাৎ শোলাকিয়া মাঠের আড়াইশ মিটারের মধ্যে আজিমুদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের ফটকের কাছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপর বোমা হামলা চালায়। পরে গোলাগুলিতে দুই কনস্টেবলসহ চারজন নিহত হন; যাদের মধ্যে একজন ঝর্না রাণী ভৌমিক। ওই সময় পুলিশের গুলিতে এক জঙ্গিও নিহত হয়। গুরুতর আহত হয় আট পুলিশসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন। গুলিতে নিহত গৃহবধূ ঝর্না রানীর পরিবারের কান্না থামেনি এক বছরেও।
সংসারের প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট ভুলতে পারছেন না স্বজনরা। ঝর্নাকে হারিয়ে বিপর্যস্ত পরিবারটির সদস্যরা বলছেন সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি তারা ভুলতে পারেননি; বেঁচে আছেন চলে যাওয়া মানুষটির স্মৃতি আগলে। ঝর্নার স্বামী গৌরাঙ্গ নাথ ভৌমিক বলেন, এই শোক এখনও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ঘটনার পর অনেকেই অনেক ধরনের সহায়তার কথা বলেছেন। বাস্তবে কিছুই পাইনি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের দুঃখ-বেদনার কথা জানানোর ইচ্ছার কথা জানান গৌরাঙ্গ। সেইসঙ্গে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি। ঝর্নার বড় ছেলে বাসুদেব ভৌমিক বলেন, মায়ের মৃত্যুতে পরিবারটি ল-ভ- হয়ে গেছে। বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। ছোট ভাইটিও মায়ের শোকে লেখা-পড়াতে মন বসাতে পারছে না। মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতে চোখের কোণে জল আসে ঝর্নার ছোট ছেলে শুভ দেব ভৌমিকের। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শুভ কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলেন, মা আমাকে কত আদর করত। নিজের হাতে খাওয়াত, ঘুম পাড়াত, পড়াশুনা করতে বলতো। মাকে আমি আর পাব না। আমার কোনো কিছু ভালো লাগে না। শুধু ঝর্ণার পরিবার নয় সেদিনের ঘটনা তাড়া করে প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এলাকাবাসীদেরও।
সবুজবাগের বাসিন্দা নীরেন্দ্র চন্দ্র দাশ ও দলিল লেখক হাবীবুর রহমান বলেন, এখনও সেদিনের কথা মনে হলে তারা আঁতকে ওঠেন। এখনও অজানা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে শিশুদের মন থেকে এই ঘটনার স্মৃতি দূর হচ্ছে না কিছুতেই। এদিকে ঘটনার এক বছর পেরোলেও পুলিশ এখনও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোর্শেদ জামান বলেন, এখনও তদন্ত শেষ হয়নি; তাই অভিযোগপত্র দিতে আরও সময় লাগবে। তবে তদন্তে অনেক অগ্রগতি রয়েছে। ওইদিন ঘটনাস্থল থেকে আটক হন জাহিদুল হক ওরফে তানিম, আনোয়ার হোসেন এবং জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধী। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। হামলার তিনদিন পর ১০ জুলাই কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে পাকুন্দিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সামছুদ্দিন বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনেও একটি মামলা করেন।
প্রসঙ্গত, শান্তিপ্রিয়ভাবেই এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ পরিচালনা করেছেন দেশের বরেণ্য আলেম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও এবার কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। জঙ্গিবাদের মোকাবেলায় শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের ঈদের জামাতে হাজির হয়েছিলেন লাখো মানুষ।


