পৃথিবীর জন্য মানুষ নয়; মানুষের জন্য পৃথিবী : মাওলানা মাহমুদ মাদানী
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পৃথিবীর জন্য মানুষ নয়; মানুষের জন্য এ পৃথিবী বলে বলে মন্তব্য করেছেন জমিয়তে উলামা হিন্দের জেনারেল সেক্রেটারি, জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহপাকের পরম মমতার সৃষ্টি মানুষ। পৃথিবীকে মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে চতুর্দিক থেকে তাঁর সীমাহীন নেয়ামতের মমতাময় চাদরে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। পৃথিবীর জন্য মানুষ নয়; মানুষের জন্য এ পৃথিবী। মানুষের একমাত্র লক্ষ্য এ পৃথিবীতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় সাফল্য নিহিত আছে এর মধ্যে। আর লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হলে জীবনই হয়ে যাবে জান্নাত।’
বুধবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সিলেটের গোলাপগঞ্জ চৌমহনী মসজিদে আয়োজিত এক ইসলাহী মজলিসে এসব কথা বলেন হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
আল্লাহ তায়ালার রহমত মানুষকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। তাকে দিয়েছেন কথা বলার জন্য যবান, দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কান, ধরার জন্য হাত, চলার জন্য পা। অগণিত নেয়ামত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন তিনি মানুষকে। মানুষের শরীরের অভ্যন্তরে ও বাইরে তাকে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতে আল্লাহ তায়ালা সীমাহীন নেয়ামতের মমতাময় চাদরে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। তিনিই নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, ‘দুনিয়ার সকল সৃষ্টিই মানুষের জন্য।’ রাসূল সা. বলছেন, ‘ দুনিয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে তোমার জন্য আর তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আখেরাতের জন্য।’
নিউক্লিয়ার- পারমাণবিক অস্ত্র এতোটা ভয়ংকর নয় যতটা এই হতাশাবোধ। মানুষের ভেতর ধ্বংস করে দেয়। কুরে কুরে খায় ভেতরটাকে। তাকে ধ্বসিয়ে দেয় জায়গাতেই। কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলেই আক্রান্ত এই ভয়ংকর ব্যাধিতে। শুধুমাত্র উদ্দেশ্য পৃথিবীকে বেছে নেয়ায়।
‘দুনিয়ার জন্য মানুষ’ এই ভাবনার কুফল ও ভয়াবহতা তুলে ধরে মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানী বলেন, ‘আজ মানুষ নিজেকে দুনিয়ার জন্য ভাবছে বলেই যত অশান্তি। গাড়ি করতে হবে, বাড়ি করতে হবে, টাকা কামাতে হবে, প্রাচুর্য থাকতে হবে। আর তা না হলেই ঘিরে ধরে ডিপ্রেশন। হতাশাবোধে আচ্ছন্নতা। পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল এই ডিপ্রেশন বা হতাশা। নিউক্লিয়ার- পারমাণবিক অস্ত্র এতোটা ভয়ংকর নয় যতটা এই হতাশাবোধ। মানুষের ভেতর ধ্বংস করে দেয়। কুরে কুরে খায় ভেতরটাকে। তাকে ধ্বসিয়ে দেয় জায়গাতেই। কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলেই আক্রান্ত এই ভয়ংকর ব্যাধিতে। শুধুমাত্র উদ্দেশ্য পৃথিবীকে বেছে নেয়ায়।’
তিনি বলেন, ‘মানুষের উদ্দেশ্য তো হবে আখেরাত। পৃথিবী তার উদ্দেশ্য নয়। বরং পৃথিবীকে তার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছ। মানুষের উদ্দেশ্য তো হবে আল্লাহ। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা হবে তার জীবনের লক্ষ্য। যদি কেউ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে ফেলতে পারে তবে তার জীবন স্বার্থক। পার্থিব জীবন তার জান্নাত হয়ে যাবে। হৃদয়-তনুমনে বিরাজ করবে শান্তি। মনজুড়ে যদি শান্তি বজায় না থাকে তাহলে কী হবে প্রাচুর্য দিয়ে? কারো উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন এর প্রমাণ হল তার মনে শান্তি চলে আসা।’
পৃথিবী ফূর্তির জায়গা নয়; জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তই মূল্যবান উল্লেখ করে আওলাদে রাসূল বলেন, ‘মুসলমানের জীবন তো এমন নয় যে, ‘পৃথিবীর সামান্য কয়েকটা দিন ফূর্তি করে কাটিয়ে দাও। এদিন আর ফিরে আসবে না। যত পারো মজা লুটে নাও।’ হ্যাঁ এইদিন আর ফিরে আসবে না সত্যি! মানুষ অনুতাপ করবে এই দিনগুলোর জন্য। ঈমান যার ভাগ্যে জুটেছে সে অনুতাপ করবে, যার জোটেনি সেও অনুতাপ করবে। অনেক আমল নিয়ে জীবন পাড়ি জমানো ব্যক্তিও করবে সেদিন অনুতাপ। হায়! আগে যদি জানতাম এই কাজে আল্লাহ এত খুশি হন তাহলে আরো বেশি বেশি করে করতাম!’
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনটি কাজ আমাদের করতে হবে। ১. সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করা। যিকিরের পর্যায় তিনটি। আল্লাহকে স্মরণ করা, স্মরণ রাখা, তাঁর নামে ডুব দেয়া। বিলীন হয়ে যাওয়া। ২. হারাম সম্পদ বর্জন করা। ৩. দৃষ্টির হেফাজত করা। বিশেষতঃ বর্তমানে মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা।
যিকিরের প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সময় ধার্য করে আল্লাহর যিকির করুন। কেউ আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। ব্যক্তি নিভৃতে স্মরণ করলে আল্লাহও তাকে নিভৃতে স্মরণ করেন। কোন মজলিসে স্মরণ করলে আল্লাহ তায়ালা উত্তম মজলিস-ফেরেশতাদের মাঝে তাকে নিয়ে আলোচনা করেন। দুর্বিপাকে কোনদিন যিকির ছুটে গেলে পরে কাযা করে নেন। ছুটে গেলে ভাববেন আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন।’
মাওলানা মাহমুদ মাদানী বলেন, ‘পাবন্দির সাথে যিকির করলে আল্লাহ ব্যক্তিকে পৌঁছে দেন উন্নতির শিখরে। তাকে বাঁচিয়ে রাখেন সকল গুনাহ থেকে। যিকির না করলে গুনাহ সম্পর্কে তাকে নিস্পৃহ করে রাখেন। ফলে গুনাহ করলেও তার কোন (অনুতপ্ততার) অনুভূতি জাগ্রত হয় না।’
এছাড়াও তিনি সবাইকে সুন্নাতের উপর আমলে উৎসাহিত করে বলেন, ‘সর্বত্র সুন্নাতের অনুসরণ করুন, বিশেষত মু’আমালা সংক্রান্ত বিষয়ে। সকলের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুন।’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় দুই দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে আগমন করেছেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের জেনারেল সেক্রেটারী মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানী।
বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক আন্তর্জাতিক মাহফিলে অংশগ্রহণ শেষে ঢাকায় বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের বাসভবনে তাঁর রাত্রি যাপন করার কথা রয়েছে।



