ফিরে দেখা; বইমেলায় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভিড় এবং কিছু কথা
ফয়জুল্লাহ আমান ● বইমেলায় সেই শূন্য দশকের গোড়া থেকেই আমার যাতায়াত। আজ থেকে বিশ বছর আগে যখন মেলায় গিয়েছি তখনের পরিবেশ ছিল এখন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একুশে মেলায় কওমি মাদরাসার কারও কোনো বই প্রকাশ তো দূরের ব্যাপার, ইসলামিক মাইন্ডের লোকেরা একাডেমি প্রাঙ্গনের মেলায় পা রাখাও যেন মহা পাপ মনে করত।
সত্যি কথা হচ্ছে আমরা যারা তখন বইমেলা গিয়েছি, নিজেদের ভেতর দারুণ সঙ্কোচ অনুভূত হয়েছে। এমনও শোনতে পেতাম, ওখানে গেলে নিসবত কেটে যাবে। টিএসসির সীমানা পেরোলে কারো ভেতর ইলমের সঙ্গে যে নিসবত রয়েছে তা মুনকাতি হয়ে যায়। এসব কথা শুনেও মেলায় যেতাম আর ভাবতাম কোনো দিন বোধ হয় আহলে ইলম হতে পারব না আমরা। ইলমের একটা রঙ আছে সেই রঙ নষ্ট হয়ে যায় ঢাকা ইউনিভার্সিটির সীমানায় ঢুকলে।
সেসময়ের সাথে বর্তমান অবস্থা মেলানো যায় না। এখনকার মেলার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণ পাঠকের তুলনায় মেলায় এখন মাদরাসা ছাত্র কম নয়। শুধু কি কওমি মাদরাসা? আলিয়া ও কলেজের ইসলামি মাইন্ডের ছেলে মেয়েদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মত। স্ত্রী পরিবার নিয়েও অনেক আলিমকে যেতে দেখা গেছে সেখানে। বোরখাওয়ালিতে পুরো মেলা ছিল ভরা। একসময় বাংলা একাডেমির ভেতর ছোট্ট যে মসজিদ ছিল, সে মসজিদ ছাড়া আলাদা কোনো নামাজের স্থান ছিল না। ছোট্ট মসজিদটিও মুসল্লি দিয়ে ভর্তি হতো না। এক কাতার কোনো রকম হতো। আমি একবার তখন জুমার নামাজও পড়িয়েছি সেখানে। মনে পড়ে সেসব স্মৃতি।
এত নামাজি মানুষ মেলায় কেন? মেলায় ইসলামি বইয়ের স্বল্পতা রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার নতুন বই ছিল এবারের মেলায়। তার ভেতর ধর্মীয় বইয়ের সংখ্যা মাত্র ২০টি।
এবার সহরোয়ার্দি উদ্যানের ভেতর নামাজের জন্য নারী পুরুষের পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুবন্দোবস্ত বলা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এ নামাজের স্থানে পাঁচ ছয় জামাতও অনুষ্ঠিত হয় একেক ওয়াক্তে। বিশেষত মাগরিবের সময় নামাজের স্থান পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কয়েকজন ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওজু ও ইস্তিনজার ব্যবস্থাও করা হয়েছে মোটামুটি মানসম্মত।
ভাববার বিষয় হচ্ছে- এত নামাজি মানুষ মেলায় কেন? মেলায় ইসলামি বইয়ের স্বল্পতা রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার নতুন বই ছিল এবারের মেলায়। তার ভেতর ধর্মীয় বইয়ের সংখ্যা মাত্র ২০টি। যেসব ইসলামি বই আছে তা কোনো আলেম উলামার লেখা নয়। ইসলামি মাইন্ডের লেখকরা মেলার প্রতি কখনও গুরুত্ব দেয়নি। এখন আমরা মেলায় গিয়ে বুঝতে পারছি এখানে কেমন শূন্যতা রয়েছে। নিজের বাচ্চার জন্য শিশুতোষ সিরাত বা অন্য কোনো বই নিব; পুরো মেলা খুঁজে একটা বই পাওয়া যায় না। তারপরও মাদরাসা অঙ্গনের ছেলেরা যাচ্ছে। দুটি বিষয় এতে বিশেষভাবে আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রথম বিষয় হচ্ছে- বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনের মানুষের দৃষ্টির প্রসারতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগের সঙ্কীর্ণ চিন্তা থেকে হয়ত বেরিয়ে আসতে পারছেন তারা। পুরোপুরি আবদ্ধতা থেকে মুক্তি হয়ত সহজ হবে না কিন্তু চরম অবস্থাটা দূর হচ্ছে। এটা আমাদের এক বড় সাফল্য। দীর্ঘ সাধনায় এ পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। এক সময় আমরা একুশকে একটা শিরকি বিষয় মনে করতাম। ভাষার জন্য জীবন দিয়ে বাঙালিরা নিকৃষ্ট কাজ করেছে এমন এক ভাবনা ছিল। জীবন তো দিতে হবে ইসলামের জন্য। ভাষার জন্য কেন জীবন দেওয়া হবে? এভাবে বিভ্রান্ত করা হয়েছে ইসলামি ঘরানার লোকদের। একটুও তারা ভাবে না সালাম জাব্বার রফিকরা একুশ তারিখ সকালেও ভাবেনি তাদের এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে। তারা তো তাদের মায়ের মুখের ভাষা রক্ষা করতে গিয়েছিল। জীবন দেওয়া অপরাধ হলে নিরীহ ছেলেদের জীবন নেওয়া কি পাকিস্তানিদের অনেক বড় পুণ্যের কাজ হয়েছে?
বইমেলাকে বাঞ্চাল করার জন্য ইসলামি ঘরানার লাইব্রেরি মালিকরা কিতাবমেলার ঘোষণাও দিয়েছে বিভিন্ন সময়। বাঞ্চাল করা সম্ভব না হলেও তারা ভেবেছে বইমেলার বিকল্প কিছু করার। সেখান থেকে উঠে আসার সময় হয়েছে মনে হচ্ছে। তরুণদেরকে আর প্রাণের মেলায় আসা থেকে বিরত রাখা সহজ হবে না। অনেক তরুণ এখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে একুশে মেলায় তার বই প্রকাশ পাবে। এটাকে একসাথে ইসলাম ও বাঙালি জাতিয়তার জাগরণ বলা যায়।
২য় বিষয় হচ্ছে- এই যে বাঙালি মুসলিমের জাগরণ এর সুফল নষ্ট করার জন্য একটা শ্রেণি ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিভিন্ন জামাতি সালাফি গোষ্ঠি মেলায় ভিড় করছে সেখানের পরিবেশ নষ্ট করার নিয়তেই। কোনো ভালো মতলব তাদের ভেতর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত মাদরাসার সাধারণ হুজুর লেখক পাঠকদের কথা আমি বলছি না। জামাতি সালাফি একটা গোষ্ঠি মেলা দখলের কথা উঠিয়েছে। হুজুরদের লেবাস পরেই তারা মেলা প্রাঙ্গনকে অপবিত্র করতে ভীড় করছে। এধরনের মানসিকতা নিয়ে মেলায় যাওয়া নিন্দনীয় ব্যাপার। মাদরাসা ছাত্রদের বিপথগামী করার হীন প্রয়াস। এতদিনে আকাবিরে দেওবন্দের জাতীয়তাবাদের চিন্তা গ্রহণ করা শিখছে বাঙালি ধার্মিক শ্রেণি। এদেখে মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উগ্রপন্থি জামাতিদের। মেলা দখলের উদ্দেশ্যেই এখন তারা শোডাউন করছে সেখানে বিভিন্ন সুরতে। হুজুর বেশ ভূসা ছাড়াও তারা যাচ্ছে। অনেকের বইও ছাপছে। এমন কয়েকজন ডক্টর লেখকের সঙ্গে এবারের মেলায় আমার দেখা হলো। তাতে বুঝতে পারলাম এরা ভেতরে ভেতরে কোনো ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। প্রকাশকদের ভেতর খুব কম প্রকাশকই ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখেন। যার কারণে কি ধরনের বই ছাপতে হবে তা তারা বুঝতে পারেন না। মাত্র ২০টি নতুন ধর্মীয় বই বের হয়েছে মেলায়। তার অধিকাংশই আমি উল্টে পাল্টে দেখেছি। সত্যি বলতে খুবই হতাশ হতে হয়েছে আমাকে। ধর্মের অপব্যাখ্যামূলক বইই ধর্মের নামে চালানো হচ্ছে আজকাল।
আমাকে ঐতিহ্যের স্বত্ত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় নাইম ভাই বলেছেন, আমাদের বই কেন ছাপতে আগ্রহী তিনি। কারণ মাদরাসা ছাত্ররা প্রচুর বই কেনে। আমাদের বই ছাপলে এই পাঠকদের ধরা যাবে। আরও বেশ কিছু প্রকাশকের খবর জানি তারাও ইসলামি ভালো বই তালাশ করছেন।
সম্প্রতি বছরগুলোয় পাঠকরা এসে ইসলামি বই চায় দেখে কিছু প্রকাশক ইসলামি লেখকদের বই ছাপতে আগ্রহী। এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদি লেখকরা সুযোগ গ্রহণ করছে তাদের বই ছাপানোর। আমাকে ঐতিহ্যের স্বত্ত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় নাইম ভাই বলেছেন, আমাদের বই কেন ছাপতে আগ্রহী তিনি। কারণ মাদরাসা ছাত্ররা প্রচুর বই কেনে। আমাদের বই ছাপলে এই পাঠকদের ধরা যাবে। আরও বেশ কিছু প্রকাশকের খবর জানি তারাও ইসলামি ভালো বই তালাশ করছেন। তাদের আগ্রহ দেখে উগ্রবাদি জামাতি লেখকরা তাদের পাণ্ডলিপি জমা দিচ্ছে। কত যে আবোল তাবোল বই এবারের মেলায় দেখেছি ইসলামি বই হিসেবে চালানো হচ্ছে। রীতিমত অটোগ্রাফ দিচ্ছে বসে বসে। এক লেখককে দেখলাম অনেকে লাইন ধরে এসে পা ছুয়ে সালাম করছে। আর বলছে মুহতারাম আপনাকে সবাই চেনে না তো তাই..। জামাতিদের সেই শো ডাউন সংস্কৃতি এখানেও। এসব কিছুকেই ওরা ধর্ম মনে করে।
আমার মনে হচ্ছে এখন কওমি ঘরানার লেখকদের এসুযোগ হাত ছাড়া করা উচিত হবে না। মানুষ ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায়। ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার প্রতি বাঙালিদের এ আগ্রহকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে দেশের মানুষ কোন বিভ্রান্তিতে হারাবে বলা যায় না। ইসলামিক কুতুবখানাগুলোয় মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায় বই ছাপলে। মেলা কেন্দ্রিক মূলধারার প্রকাশনীগুলিতে সে তুলনায় টাকা নাই বললেই চলে। এজন্যও অনেক আলেম লেখক এখান থেকে বই ছাপতে আগ্রহী নন। কিন্তু কথা হচ্ছে আমরা কাদের হাতে বাজার ছেড়ে দিচ্ছি? আমাদের বন্ধুদের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে বলব।
বাঙালি হয়ে যে মুসলিম হতে পারবে না তা তো নয়। একজন খাটি বাঙালি খাটি মুসলিমও হতে পারে। বাঙালি হবার কারণে ইসলাম থেকে কেউ খারিজ হয়ে যায় না। বাংলায় কথা বলেও ভালো মুসলিম হওয়া যায়।
২০০১ থেকে ২০২০ সাল। এই কুড়ি বছরে একটা পরিবর্তন আমরা দেখলাম। বাঙালি ও ইসলামি জাগরণ একসঙ্গে হয়েছে। আগামী কুড়ি বছর টার্গেট করতে হবে এর সুসমন্বয় যাতে হয়। আকাবিরে দেওবন্দ এটাই চেয়েছিল, জাগতিক ও ধর্মীয় উভয়বিধ ভাবধারার মাঝে যেন সংঘর্ষ না থাকে। বাঙালি হয়ে যে মুসলিম হতে পারবে না তা তো নয়। একজন খাটি বাঙালি খাটি মুসলিমও হতে পারে। বাঙালি হবার কারণে ইসলাম থেকে কেউ খারিজ হয়ে যায় না। বাংলায় কথা বলেও ভালো মুসলিম হওয়া যায়। নামায রোজা রমজানের বদলে সালাত, সিয়াম, রামাদান, বি ইযনিল্লাহ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে ইসলামের ব্রান্ডিংয়ের প্রয়োজন নেই। পোষাকি ইসলাম নয়, সত্যিকারের হৃদয়ের গভীর থেকে স্বজাতিকে ভালোবেসে দেশের কল্যাণে কাজ করার চেতনা আমাদের হোক। ধর্মের নামে অধর্মের দিন শেষ হোক। বন্ধ হোক ইসলামের নামে সব ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড। অমর একুশে গ্রন্থমেলার এই জনসমাগম থেকে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: কবি ও বিশ্লেষক
সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ
বইমেলায় অটোগ্রাফ দিচ্ছেন লেখক ‘ফয়জুল্লাহ আমান’



