করোনাকে হারিয়ে যেভাবে রোল মডেল হল কেরালা

করোনাকে হারিয়ে যেভাবে রোল মডেল হল কেরালা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করোনাভাইরাসে যখন পর্যদুস্ত গোটা বিশ্ব তখন ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য কেরালার সফল করোনা-নীতি আলোচিত হচ্ছে দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে৷ কিন্তু আসলেই কেমন এই ‘কেরালা মডেল’?

জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারতের প্রথম করোনা-আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া যায় কেরালা রাজ্যে৷ তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কেরালার মোট ৩৭৬জন আক্রান্তের মধ্যে ১৭৯জন সুস্থ হয়েছেন৷ প্রাণ হারিয়েছেন দুই জন৷ ভারতের অন্যত্র যখন হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের, মৃতের সংখ্যা, অন্যদিকে কেরালা দেখাচ্ছে আশার পথ৷ রাজ্যের অর্থমন্ত্রী টমাস আইজ্যাক টুইট করে নিশ্চিত করেছেন, যে করোনা সংক্রমণের বাঁক এখন নিম্নমুখী৷

কীভাবে করলো কেরালা?
দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে এখন আলোচিত হচ্ছে করোনার লড়াইয়ে ‘কেরালা মডেল’৷ কিন্তু ঠিক কেমন এই মডেল? চিকিৎসক অর্জুন দাশগুপ্তকে এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘যে সমস্ত মডেল আমরা কার্যকরী হতে দেখছি সবকটিই কোনো না কোনো ভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলের সংস্করণ৷ কেরালাতেও তাই৷ গণহারে করোনা-পরীক্ষা বা ‘মাস টেস্টিং’ এবং আইসোলেশন এই দুটিই হচ্ছে এই মডেলের মূল পদক্ষেপ, লকডাউন নয়৷ কেরালায় শুধু বিশাল আকারে পরীক্ষাই হয়নি, পাশাপাশি অন্যান্য অনেক কিছু আনুষঙ্গিকতার দিকে নজর দিয়েছেন তারা৷ সমাজের দুর্বল অংশের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো একাধিক সামাজিক পদক্ষেপ নেওয়ায় জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা৷ ফলে মানুষ আরো বেশি করে এগিয়ে এসে নিজেদের পরীক্ষা করিয়েছেন৷”

করোনা সংক্রমণ বর্তমানে স্বাস্থ্যের পাশাপাশি একটি সামাজিক ব্যাধিতেও পরিণত হয়েছে বলে জানান ডঃ দাশগুপ্ত৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে এই সংক্রমণের সাথে নানা ধরনের স্টিগমা জড়িয়ে রয়েছে, রয়েছে লোকলজ্জার ভয়৷ গণহারে পরীক্ষার ক্ষেত্রে মানুষ ও সরকার যেভাবে একসাথে কাজ করেছে, তাতে এই দিকটাকে মোকাবিলা করা গেছে৷ সঙ্কোচ ও করোনা দুটোকেই হার মানানো গেছে৷”

পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্টা’ জানাচ্ছে, ৮ এপ্রিল পর্যন্ত কেরালায় করা হয়েছে মোট ১১ হাজার ৯৮৬টি টেস্ট, যা ভারতের অন্য যে কোনো রাজ্যের চেয়ে বেশি৷ উন্নত মানের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ফলে আক্রান্তদের সুস্থ হওয়ার হারও দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (প্রথম স্থানে মহারাষ্ট্র)৷ এছাড়া, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য কেরালার সরকার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে, দরিদ্রসীমার নিচে জীবনযাপন করা পরিবারদের জন্য চালু করেছে খাবার বিতরণ ব্যবস্থা৷ ছোট ছোট ‘কিওস্ক’ বা স্টলের মাধ্যমে স্বল্প খরচের করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে সেখানে৷ রয়েছে দীর্ঘদিনের কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের পরিবেশ৷

কেরালার মডেল মূলত অর্থনৈতিক-স্বাস্থ্য-সামাজিক এই তিন নীতির মিলিত ফল৷ শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোটের মধ্যে সমন্বয় ও বোঝাপড়া গোটা দেশের কাছে উদাহরণস্বরূপ৷ কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায় যে কেরালার দেখানো পথে কি ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলি চলতে সক্ষম? বা কেন্দ্রীয় স্তরেও কি নেওয়া যেতে পারে একই ধাঁচের নীতিমালা?

কেরালার পথে অন্যরা?
কেরালার মডেলের প্রায়োগিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনে কর্মরত তরুণ গবেষক সৌম্য ভৌমিক জানান, ‘‘মধ্যপ্রাচ্য কর্মরত মালায়ালি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স কেরালার জন্য একটা বড় আয়ের মাধ্যম৷ ফলে, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কেরালায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেশি৷ তাই অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দারা লকডাউনের পরিস্থিতিতে যত বেশি বাজার-হাটে বা কাজের জন্য বাইরে যেতে বাধ্য হন, কেরালায় তেমনটা না হওয়ায় মানুষকে অনেক আগে থেকেই ঘরে রাখা গেছে৷ পাশাপাশি, কেরালায় শিক্ষার হার অন্যান্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি, ফলে এই মহামারী সম্বন্ধে অবগত করার প্রক্রিয়াটা সেখানে অনেক সহজ৷”

কেরালায় ভারতের অন্যান্য রাজ্যের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কাজের খোঁজে আসেন৷ লকডাউনের আগে এই শ্রমিকেরা নিজেদের রাজ্যে ফিরে গিয়ে কেরালার জন্য পরিস্থিতি সহজ করে দিলেও অন্য রাজ্যের জন্য তার ঠিক উল্টোটা হয়েছে, জানান ভৌমিক৷ ফলে কেরালার সাথে অন্য রাজ্যের তুলনা করতে গেলে কেরালার সার্বিক অবস্থার পাশাপাশি এই ফ্যাক্টরগুলিকেও বিবেচনা করতে হবে বলে জানান তিনি৷

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সৈকত সিংহ রায় বলেন, ‘‘কেরালা মডেল দেশে বা অন্য রাজ্যের পক্ষে এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা কঠিন৷ এর কারণ দুটি৷ প্রথম, জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও উন্নত মানের স্বাস্থ্য পরিষেবা থাকার ফলে সেখানে এমনিতে মৃত্যুর হার বেশি থাকলেও করোনায় মৃত্যুর হার অন্যান্যদের তুলনায় কম৷ ১৯৯০ থেকে সেখানে একধারে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা গণস্বাস্থ্যকে শক্তিশালী করে৷ দ্বিতীয়ত, কেরালায় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ রয়েছে যা অন্য রাজ্যের নেই, কেন্দ্রেরও নেই৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সেই পর্যায়ের কাছাকাছি যেতে গেলে জিডিপি’র অন্তত ৬ শতাংশ করোনা মোকাবিলায় অবিলম্বে বিনিয়োগ করতে হবে৷”

কিন্তু কেরালা থেকে সবার শিক্ষণীয় কী, এই প্রশ্নে ‘বন্ধু’ সংস্থার যুগ্ম-অধিকর্তা, সমাজ ও শিল্পকর্মী অর্ণা শীল বলেন, ‘‘আজকের এই দেখনদারির সময়ে কেরালা প্রমাণ করে দিলো যে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী, পরিশ্রমী প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প হয় না৷ এছাড়া, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে সরকারি বিনিয়োগই আসলে ঠিক করে দেয় কেমন হবে একটা জাতির ভবিষ্যৎ৷ এটাই কেরালা থেকে শেখবার৷”

সেকারণেই হয়তো কেরালাকে উদাহরণ বানিয়ে করোনার স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক প্রকোপ থেকে নিস্তারের রাস্তা খুঁজছেন অনেকে৷ কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকেই যায়৷ স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপগুলি যদিও বা দেশের অন্যত্র প্রয়োগ করা যায়, কিন্তু কেরালার দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার পরিবেশ কি রাতারাতি লাভ করা সম্ভব? ক্ষমতাসীন বনাম বিরোধী দল, এই বাইনারির বাইরে গিয়ে জনপ্রতিনিধিদের যৌথ জোট কি সম্ভব?

সূত্র : ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *