করোনার বৈশাখ; এক ভিন্ন নববর্ষ

করোনার বৈশাখ; এক ভিন্ন নববর্ষ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ। বাঙালির জীবনে আজ নতুন বছরের প্রথম দিন, নতুন বারতা। আজকের সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে সূচনা হল বাংলা ১৪২৭ সালের। তবে আজকের এই বৈশাখ বাঙালির জীবনের যেকোনো বৈশাখের চেয়ে আলাদা। করোনা মহামারীর কারণে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের সময় আমাদের জীবন অবরুদ্ধ। ঘরে বসেই দেশের মানুষ মোকাবেলা করছে এই মহামারীর।

আজ পহেলা বৈশাখের বাংলা ঢোলের বাজনা বাজবে বাঙালির মনে মনে। প্রাণে প্রাণ মিলবে রাস্তা বা খোলা ময়দানে নয়, যার যার বাসায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেঞ্জারে। আজ পহেলা বৈশাখের উৎসব হবে বাংলার ঘরে ঘরে, নিজের মতো করে। ১৪২৬-এর আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে আজ থেকে শুরু হবে নতুন এক পথচলা।

বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে চলছে সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টিন) কাল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণের চিরাচরিত রীতির চেহারাও পাল্টে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহ্বান জানিয়েছেন ডিজিটাল মাধ্যমে বর্ষবরণের আয়োজনের। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা তাতে সাড়া দিয়ে তাঁদের নিজ নিজ কর্মসূচিতে সে অনুযায়ী পরিবর্তন এনেছেন। আর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে বাড়িতে থেকেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর পাশাপাশি এই ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রমের জন্য মনোবল অটুট রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবারের পহেলা বৈশাখের রংটাই পাল্টে দিয়েছে। ভাইরাসটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত করেছে। জনসমাগম এড়িয়ে চলাই এই ভাইরাস প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা। তাই সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ ছুটি বলবৎ থাকবে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। ছুটি বলা হলেও কার্যত লকডাউন অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে দেশ। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় এমনিতেও অনেক জেলা, শহর, এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। সীমিত করা হয়েছে মানুষের চলাচল। একেবারেই প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘরের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সে কারণে অন্যান্য সময় পহেলা বৈশাখের আগে যে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে তা এবার অনুপস্থিত। দোকানপাট বন্ধ বলে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য হালখাতার আয়োজন নেই, নেই বৈশাখী কেনাকাটা। নেই পান্তা-ইলিশ আয়োজনের তোড়জোড়।

এই মহাদুর্যোগের মধ্যেই বৈশাখ আসায় সরকারি আদেশেই এদিন খোলামাঠে সকল আয়োজন বন্ধ। পহেলা বৈশাখের অন্যতম আয়োজন রমনা বটমূলে প্রভাতী আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শিশু পার্কের সামনে ঋষিজের অনুষ্ঠানসহ সব বন্ধ করা হয়েছে। বাঙালি আজ ঘরে বসেই তার সাধ্যমতো খাবার আয়োজন করবে। পড়বে নতুন পোশাক। মোবাইল মেসেজ বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেবে। ঘরে বসে থাকলেও তাদের মনে সত্যি সত্যি খেলে যাবে বৈশাখের রং।

নববর্ষের আনন্দ উৎসবজুড়ে থাকে মিষ্টান্নসহ হরেক রকম খাবার আর সাজসজ্জা। ব্যবসায়ীদের বড় আয়োজন থাকে হালখাতা নিয়ে। নববর্ষের আগের দিন থাকে চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান। সেসবও বাদ পড়েছে এবার। মিষ্টির দোকানগুলো বন্ধ। বাংলাদেশ সুইট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আমিনুর রহমান বললেন, মিষ্টি ব্যবসার জন্য খুব সংকটপূর্ণ সময় যাচ্ছে। দোকান বন্ধ। বছরের একটি প্রধান ব্যবসা হয় পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। নববর্ষের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই সাধারণত বিক্রি বাড়তে থাকে। নববর্ষের আগের দিন ও নববর্ষের দিনে দ্বিগুণ হয়ে যায় বিক্রি। ঢাকায় প্রায় ৫০০ বড় ও মাঝারি মিষ্টির দোকান আছে। নববর্ষের দিনে প্রায় ১০ হাজার কেজি মিষ্টি বিক্রি হয়ে থাকে। এবার তা হচ্ছে না।

পোশাক ও কারুশিল্পের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাইফুর রহমান জানালেন, পয়লা বৈশাখে সারা দেশে কারুপণ্যের মেলা হয়। মাটি ও কাঠের পণ্য বিক্রি হয় প্রচুর। এবার অনেক বড় ক্ষতি হচ্ছে তাদের। নববর্ষ উপলক্ষে দেশের ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন পোশাক তৈরি ও বাজারজাত করে থাকে। ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এ বছর উদ্যোক্তারা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় মার খেয়েছেন। এই শিল্পের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ৫ লাখ মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। এর সঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় তিন লাখ তাঁত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবাই।

গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা গেল রমনা উদ্যানের ফটকগুলো বন্ধ। রমনা বটমূল নির্জন। চারুকলা অনুষদের বকুলতলা জনশূন্য। প্রতিবছর এমন দিনে চৈত্রসংক্রান্তির আয়োজন আর মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে শেষ পর্বের ব্যস্ততায় মুখর থাকত পরিবেশ। এখন সেখানে গভীর মৌনতা।

আজকের অন্যরকম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশবাসীকে নতুন বাংলা বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানরা। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের। আরও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *