সিয়ামের আবেদন | ইশতিয়াক আহমেদ

সিয়ামের আবেদন | ইশতিয়াক আহমেদ

সিয়ামের আবেদন

ইশতিয়াক আহমেদ ❑ আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্য। ইবাদতের মধ্যে শ্রেণী ও প্রকারের বিবেচনায় বৈচিত্রতা রয়েছে। কিছু ইবাদত রয়েছে যা শারিরিকভাবে মেহনত করে আদায় করতে হয়, আবার কোন কোন ইবাদতের সম্পর্ক সরাসরি সম্পদের সাথে, কিছু রয়েছে উভয়ের মিশেলে। যার মধ্যে কিছু পরিলক্ষিত হয়, আবার কিছু পালিত হয় অলক্ষে।

দীর্ঘ একটি বছর ঘুরে রমজান এসেছে, মালিকের সেই ঘোষণার পুনরাবৃতি হয়েছে। ‘আমি তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছি যেমন করেছিলাম তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর’। (সুরা বাকারা ১৮৩)

আমরাও মালিকের আদেশ পালনার্থে সীয়াম সাধনা ও রাতে কিয়ামের মাধ্যমে মালিকের নৈকট্য আর্জনে ব্রতী হয়েছি। কিন্তু একটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি কি? কখনো ভেবেছি কি? কি আবেদন নিয়ে রোজা কড়া নেড়েছে আমাদের ঘরে? কি তার উদ্দেশ্য? কেন মালিক কর্তিক এ জমকালো আয়োজন? আবার নিজ কুদরতি হাতে দিবেন তার পুরস্কার! আসুন জেনে নেই এবং হিসেবের খাতা খুলে হিসেব মিলাই।

সিয়াম মানুষকে ফেরেশতাদের অনুকরণের মাধ্যমে যতদুর সম্ভব প্রবৃত্তির গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়।

ইমাম গাযালী রহঃ তার স্বভাবসুলভ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, আখলাকে ইলাহী তথা আল্লাহর গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই হচ্ছে সিয়ামের উদ্দেশ্য।সিয়াম মানুষকে ফেরেশতাদের অনুকরণের মাধ্যমে যতদুর সম্ভব প্রবৃত্তির গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। কেননা ফেরেশতাগণ সকল চাহিদা থেকে মুক্ত। পক্ষান্তরে মানব প্রকৃতিতে রয়েছে জৈবিক চাহিদা ও পাশবিকতার মত পশুত্বের স্বভাব,কিন্তু মানব কে দেয়া হয়েছে বিবেক, বুদ্ধি, সংযমের শিক্ষা ও তার সঠিক প্রয়োগের সুনিপুন দিক্ষা।

এখানেই মানব ও পশুত্বের মাঝে ভিন্নতার দেয়াল।
মানুষ যখন এসব রিপুর কামনা থেকে কঠোর মুজাহাদার মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখতে সক্ষম হয়, তখন ধীরে ধীরে সে ফেরেশতাদের গুণে নিজের জীবনকে পরিপাটি করতে পারে, তখন তার স্থান নির্ধারিত হয় নুরের ফেরেশতারও উপরে। আবার কখনো মানুষ পাশবিক ইচ্ছার সুতীব্র স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, তখন সে অধঃপতনের নিম্নতম স্থানে নেমে আসে, লোকালয়ের মানব আর আরণ্যের পশুতে কোর প্রভেদ থাকেনা তখন। (এহয়াউল উলুম, খ.১,পৃ.২১২)

অন্তর বিগলিত হয় মহান রাব্বুল আলামীনের প্রতি কৃতজ্ঞতায়।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহঃ এ বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক অভ্যাস ও চাহিদা সমুহের মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠিত করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই মানুষ আত্নশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। চিরন্তন জীবনের অনন্ত সফলতার শিখরে আরোহণ করে। কেননা ক্ষুদা ও পিপাসার কারণে জৈবিক ও পাশবিক ইচ্ছাতে ভাটা পড়ে। পশুত্ব নিস্তেজ হয়। মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় এবং দারিদ্র-পীড়িত অগণিত আদম সন্তানের আহারক্লিষ্ট মুখ তখন তার অন্তরে সহানুভূতির উদ্রেক করে। অন্তর বিগলিত হয় মহান রাব্বুল আলামীনের প্রতি কৃতজ্ঞতায়। এজন্যই তো পেয়ারে হাবীব সাঃ অসচ্ছলতা হেতু বিবাহে অক্ষমদের রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা এতে রয়েছে সংযম ও আত্নবিনির্মানের শিক্ষা।

মোটকথা: রোজার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের মধ্যের পশুত্ব ও পাশবিকতা থেকে নিজেকে উত্তোলন করে ফেরেশতার গুণে গুণানন্নিত হয়,প্রবৃত্তিকে দমন করে কঠিন মুজাহাদার মাধ্যমে সে মনুষ্যত্বের স্বর্ণ চূড়াই সমাসীন হয়। এর মাধ্যমে একজন মুমিন সে তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছতে থাকে ক্রমাগতভাবে।মালিকের রেজাও তুষ্টির আশে এমনই হওয়া চাই আমাদের সিয়াম সাধনা।

তাই আসুন আমরা নিজেদের মধ্যের পাশবিকতা ও জৈবিক চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেরেশতাদের গুনাবলীর পবিত্রতায় আবৃত করি নিজেদের আন্তরাত্মা ও সমাজকে।

লেখক: ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *