মওদুদীর পথেই হেঁটে চলেছেন মিজান আজহারী

মওদুদীর পথেই হেঁটে চলেছেন মিজান আজহারী

মওদুদীর পথেই হেঁটে চলেছেন মিজান আজহারী

আমিনুল ইসলাম :: এক সময় সাঈদী সাহেব জামায়াত ছেড়ে হকপন্থী ওলামাদের রাজনীতি করার “সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন”। ওয়াদাবদ্ধও হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার ওয়াদা রাখেননি। ওয়াদা খেলাফ হয় তার। অর্থাৎ তিনি স্বীয় গোত্রেই থেকে যান।দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব মওদুদীর পাক্কা একজন অনুসারী ছিলেন তা আলেমসমাজের তখন জানা ছিল না। মনে করা হত, তিনি না বুঝেই ঐ সংগঠন করছেন। তাই আলেমগণ তাঁকে সহি রাস্তায় আনার কোশেশ করেছিলেন। কিন্তু মওদুদীবাদী সংগঠন থেকে তার বেরিয়ে আসার আর সুযোগ তার হয়নি কখনো।

ভ্রান্ত মওদুদীবাদী সংগঠন সাঈদীকে ব্যবহার করেছেন বহু বছর। লাখো সরল-সোজা ধর্মভীরু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে, ব্রেইনওয়াশ করে উগ্র মওদুদীবাদী বানাতে মাঠে-ময়দানে তাদের এক নম্বর ক্যানভাসার হিসেবে সাঈদী‌ সাহেব দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। আর মওদুদীবাদীদের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাকে বড় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে।

মানে জামাতিদের তুরুপের তাস হিসেবে বারবার ধারাবাহিকভাবে তাকে দেখা গেছে। মওদুদীবাদী বিতর্কিত সংগঠনকে এগিয়ে নিতে এভাবে সাঈদী সাহেবকে বিশেষ ভূমিকা রাখতে লক্ষ্য করা গেছে। বেচারা সাঈদী সাহেব যুদ্ধাপরাধের মামলায় জেলখানায় যাবার পর মওদুদীবাদী সংগঠনের প্রচার-প্রসারে বড় ধরনের ভাটা পড়তে দেখা যায়। আর কোনো সুরেলা বক্তা তথা আকর্ষণযোগ্য ব্যক্তি না থাকায় বেশ ব্যাকফুটে চলে যায় জামাত-শিবিরগোষ্ঠী। বলে, আগের সেই অবস্থান এখন আর তাদের নেই।

তবে, বসে নেই তারা। ভালোভাবে খেয়াল করলে অস্পষ্ট থাকে না, সহজে অনুমিত হয়- ক’দিন পরপর একেকজন দিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে তারা।
তারেক মনোয়ারকে দিয়ে তারা কিছুদিন ময়দান গরম করল। কিন্তু জামাত নেতা-কর্মীদের মধ্যে সাঈদীর যে অবস্থান, তা থেকে তার অবস্থান বেশ দূরে। এরপর আমীর হামজা। তিনিও নানা বিতর্কিত কথার মাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত। তবে সাঈদীর অবস্থানে যেতে পারলেন না। শেষমেষ মিজানুর রহমান আজহারী। তিনি আসলে আজহারী কিনা জানি না। “আজহারী” লকব তো তারাই ধারণ করে, যারা নাকি বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামেয়া আজহারে কৃতিত্বের সাথে লেখা- পড়া করেন।

মিজান “আজহারী” যেভাবে ছেলেখেলা করছেন ইসলাম নিয়ে, তাতে মনে হয় না তিনি জামেয়া আজহারের ছাত্র।

মিজানুর রহমান যে ধরনের কথা-বার্তা এবং ফতোয়া দিচ্ছে তাতে করে কতদূর এবং কী লেখা-পড়া জানেন সে সংশয় স্পষ্টভাবে জাগে। কেননা, যিনি ইসলাম সম্পর্কে লেখা-পড়া করেন, তার তো ধরনই হয় আলাদা। কাজ-কর্ম, কথা-বয়ান সবই তো শরীয়ত মাফিক হবে। কিন্তু মিজানুর রহমান, ফিকহী কিতাবের নামটা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে পারেন না! আর বাকি ফতোয়ার বিষয় তো অনেক দূরে…।

আচ্ছা যাইহোক, তিনি জামেয়া আজহারে পড়ুক, চাই না-পড়ুক, সেটা নিয়ে কথা বলছি না। আমার আলোচনা হল, মওদুদীবাদীরা অবশেষে এই মিজানুর রহমানকে “তুরুপের তাস” হিসেবে খেলাতে চেয়েছে। তাকে দিয়ে এ দেশের ওয়াজের ময়দানে চাষ দেওয়া শুরু করল। মওদুদীর ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস সংগোপনে মানুষের মাঝে প্রচার-প্রসারের পরিকল্পনা করল তারা।

এ জন্য মিজান “আজহারী” তার বক্তৃতায় ঘরে ঘরে সাঈদী জন্মের আশা করেছেন। তিনি চান, এ দেশে সাঈদীর মতো ভ্রান্ত-মওদুদীবাদী আকিদার লোকে ছেঁয়ে যাক। এ দেশের মানুষ মওদুদীবাদী সংগঠনে দলে দলে প্রবেশ করুক!!

মিজানুর রহমান শুরুতে এতটা বেপরোয়া ছিল না। বর্তমানে যেভাবে কুরআন-হাদীস এবং ফিকহী মাসয়ালা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, এ রকমভাবে শুরুটা তার হয়নি। শুরুটা ভালই মনে হয়েছিল। একজন বক্তা এবং ধর্মীয় আলোচক হিসেবে সবাই ভালোবাসতে শুরু করেছিল।

কিন্তু সমস্যা হল, যখনই তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠল, তখনই প্রকাশ পেল তার আসল চেহারা। অরিজিনাল মওদুদীর রূপ। অবিকল মওদুদীর খাসলৎ মিজানুর রহমানের মধ্যে দেখা গেল। মওদুদী সাহেব প্রথমে ওলামায়ে কেরামের মন জুগিয়ে ছিলেন। ওলামায়ে হকের পত্রিকার এডিটর পর্যন্ত ছিলেন তিনি! এ কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে আলেমসমাজ হাইলাইট করেছিল মওদুদীকে। কিন্তু যখনই তার পরিচিতি ঘটল, তখন সে নিজের মতো করে ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনার শেকড় স্থাপন করল। শুরু হল তার জামাত ইসলামী নামে নতুন দলের যাত্রা।

ঠিক মিজানও ঐ পন্হা অবলম্বন করলেন। আগে মানুষের মন যুগিয়ে এরপরে মওদুদীর মতো বিষ ছড়াতে লাগলেন। মওদুদীর মতোই ভ্রান্ত কথা আর ফতোয়া প্রসব শুরু করে দিলেন।

বড় আফসোস, এরা মুহূর্তের মধ্যে খোলস পাল্টাতে পারে। আর নিমিষে ভিন্নরূপ ধারণ করতে পারে। মিষ্টার মিজান, সবচেয়ে যে সমস্যাগুলো করছেন, সেটা হল, তাঁর মনগড়া ফতোয়া; নিজের ইচ্ছে মতো করে শরীয়তের মাসয়ালাগুলো বয়ান করা।

কোনো পূর্বসূরী আলেম, মুতাকাদ্দিমিন- মুতায়াখ্খিরিনদের ধার তিনি ধারেন না। শরীয়াতের মীমাংসীত বিষয়গুলো টেনে টেনে বের করে এনে একের পর এক বিতর্কিত কথা বলে তিনি নিজেই “মুজতাহিদ” সাজতে চেয়েছেন!

সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হল, তিনি উম্মাহাতুল মু’মীনিন এবং জলিল কদর সাহাবীগণের সম্পর্কে যে উক্তিগুলো করেছেন, সেটা ক্ষমার অযোগ্য। তার এইসব বিভ্রান্তিকর কথায় এ দেশের আলেমসমাজ, সাধারণ দ্বীনদার মানুষেরা হতাশ হয়েছে। বহু প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা হয়েছে।

সারাদেশের আলেমসমাজ তার কথায় ফুঁসে উঠেছিল। সরকারের উপরস্থ মহল তার এহেন কর্মকাণ্ডে নারাজি দেখিয়েছেন। অনেকে তাকে মওদুদীবাদী সংগঠন জামাতের প্রোডাক্ট বলে সাব্যস্ত করেছেন। এরপর এক পর্যায়ে এ দেশের আলেমসমাজ এবং দ্বীনদার-ঈমানদার লোকদের ঈমানী চেতনা ধারণ করে মিজানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল, তখন সে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হল।

এখন মিষ্টার মিজানুর মালেয়েশিয়াতে। তবে দেশ ত্যাগ করলেও থেমে নেই তার মনগড়া ফতোয়া। মাঝে মাঝে অনলাইনে এসে তিনি নিজেকে জাহির করেন। আর যত শরীয়তবিরোধী কথা এবং ভুল মাসয়ালা বয়ান করে যান। আর সেটা নিয়ে তখন শুরু হয় সমালোচনার ঝড়।

বিগত মাহে রমজানে বেশ কয়েকবার তিনি অনলাইনে এসে আজগুবি ফতোয়া দিয়েছেন। যেগুলোর শরীয়াতে কোনো স্থান নেই, এমন এমন কথা জাতির সামনে উপস্থাপন করে হাসির পাত্র হয়েছেন তিনি।আলেমসমাজ বার বার মিজানুর রহমানকে সতর্ক করেছেন, আপনি আর ফতোয়া দিবেন না। কিন্তু তারপরেও সে বারংবার লাইভে এসে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

এখানেই চিন্তার বিষয়। ব্যাপারটা আসলে কী? তাকে বারংবার সতর্ক করার পর কেন তিনি এভাবে লাইভে এসে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? আবার এই দেশে যখন ওয়াজ মাহফিল করতেন, সে সময়ে অনেকবার আলেমগণ তাকে সতর্ক করেছে। কিন্ত মিজানুর রহমান বেহায়ার মতো সে তার নীতির উপর অনড়।

এমনিভাবে এমন এমন সহজ মাসয়ালা, যেটা সকলেই জানে। একজন সাধারণ ব্যক্তিরও জানা রয়েছে। সেসব বিষয়েও দেখা যায় মিজানুর রহমান ভুল ফতোয়া দিয়ে আলোচনায় থাকতে চান। অনেক কিছু মনে হয় আমাদের। ব্যাপারটা কী? এভাবে মিজান একেকটা ভুল ফতোয়া দিবে, আমীর হামজা একবার ভুল ফতোয়া শোনাবে, আবার কমেডিয়ান বক্তা আফসারী আরেক নতুন ফতোয়ার আবিষ্কার করে জনগণকে অন্য দিকে নিয়ে যাবে…!

মানে, এটা মওদুদীবাদীদের নয়া কৌশল বলে মনে হয়। ওরা এসব বক্তাদের ব্যবহার করছে। আর দূর থেকে কলকাঠি নাড়ছে। একেক সময় একেক উদ্ভট ফতোয়া দিয়ে, জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে চায় তারা। মনে হচ্ছে, ওরা এভাবে বিভ্রান্তিমূলক ফতোয়া দিতেই থাকবে। আর আলেমসমাজ প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়বে ওসব বক্তার দিকে। মাঝখানে মওদুদীবাদী সংগঠন কিছুটা নিরাপদ থাকবে। ওদের বিরুদ্ধে বুঝি আর কেউ কিছু বলবে না। ওরা নীরবে কাজ চালিয়ে সংগঠন মজবুত করতে থাকবে!

আলেমগণ মওদুদীর বিরুদ্ধে কিছু আর বলছে না। কেননা, তারেক, মিজান, আমীর হামজা, আফসারী… এদের কথার জওয়াব দিতে দিতে তো সময় পার হয়ে যাচ্ছে! অথচ, এদের বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা ও ফতোয়ার জবাব দিতে সিনিয়র কোনো আলেমের দ্বারস্থ হওয়ারও প্রয়োজন লাগে না, কওমীর তরুণ আলেমরা বা ছাত্ররাই যথেষ্ট।

ফলে, ওটা যে মওদুদীবাদীদের অন্যতম নয়াকৌশল এবং ওসব বক্তারা তাদের তুরুপের তাস সেটা মাথায় রেখে আমাদের সামনে চলতে হবে। আল্লাহ সকলকে হেদায়েত করুন। আমিন।

লেখক : ফাজেলে দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *