মায়ের মত আপন কেউ নেই

মায়ের মত আপন কেউ নেই

মায়ের মত আপন কেউ নেই

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: মায়ের মত আপন কেউ হয় না। যে যতই দরদ দেখাক, মা তো সবার সেরা। তার ভালবাসার কাছে সবাই হার মেনে যায়। এই পৃথিবীতে কত মানুষের দরদ- ব্যাথা দেখলাম, কিন্তু মায়ের ভালবাসার কাছে সব ম্লান হয়ে যায়। মা যতটকু সন্তানকে ভালবাসে, আর কেউ তার সমকক্ষ যেতে পারেনা কোনদিন।

লকডাউন শুরু হয়েছে তিনমাস। এর মধ্যে মায়ের কাছে যেতে পারিনি। ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয়নি। যাতায়াত ব্যবস্থা সব বন্ধ। মা কিন্তু নিয়মিত মোবাইলে খোঁজ নেয়। আমি ফোন করার আগে বেজে ওঠে মায়ের ফোন। আমি কথা বলার আগে মা বলে ওঠে “বাবা তুমি কেমন আছ?

এত দীর্ঘ সময় সব কিছু বন্ধ থাকলেও মায়ের ফোন কখনো বন্ধ হয়নি। কেউ ভাল- মন্দ জিজ্ঞেস না করলেও মা কিন্তু খোঁজ নেয় প্রতিদিন। এই জীবনে কত বন্ধু- বান্ধব, গুণগ্রাহী আমার। কত ধরনের ভালবাসার মানুষ। কত জনের সাথে এক সাথে খাই, আড্ডা দেই, ঘুরে বেড়াই। কত মানুষকে উপহার দিই, বিভিন্ন ভাবে সম্পর্ক গাঢ় রাখার চেষ্টা করি। কত বন্ধু আছে, যাদের একদিন না দেখলে মনটা ছটফট করতে থাকে। কিন্তু সবার ইমতেহান হয়ে গেল লকডাউনে। কে কত ভালবাসে, কে কার খবর রাখে, পরিস্কার হল এই দীর্ঘ সময়।

একমাত্র মাকে পেলাম, তাঁকে কিছু দেই আর না দেই, সে আমার নিঃস্বার্থ কল্যাণকামী। আমি ফোন দিতে ভুল করলেও মায়ের কখনো ফোন দিতে ভুল হয়না। আমি মায়ের খোঁজ না নিলেও মা ঠিকই খোঁজ নেয়।

আশ্চার্য হই! আমি ভাত খেয়েছি কিনা এখনো মা ফোন করে খোঁজ নেয়। রাতে কখন বাসায় ফিরলাম, সেটাও ফোন করে আমার বিবি সাহেবার কাছ থেকে জেনে নেয়। আমার ডায়েবেটিকস কোন পর্যায়ের, সেটাও প্রায় প্রতিদিন খোজ নিচ্ছে। আমি এত করে বলি, আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি, আমার এখন ডায়েবেটিকস বাড়ে না, নিয়ন্ত্রণে থাকে। তারপরেও মায়ের ফোন। সব সময় আমার খোঁজ রাখে।

মায়ের বয়স সত্তর পার হয়ে গেছে। আমার এখন ৪৮। তবুও যেন মায়ের কাছে এখনো আমি সেই ছোট খোকার মত। মা আমার খাওয়া – দাওয়া, স্বাস্থ্য, চলাফেরা,সব কিছু মায়ের নখদর্পনে। দৈনন্দিন তিনি খবর নেয় আমাদের।

আরো একটা অবাক করা কাণ্ড, লকডাউন শিথিল হলে মাকে দেখতে চলে গেলাম। কেননা,মনটা বেশ আনচান করছিল তাঁকে দেখার। প্রায় তিনমাস পর সরাসরি মায়ের সাথে সাক্ষাত। বাড়িতে ঢুকে মাকে ডাক দিলাম। এঅভ্যাসটা অনেক পুরোনো। যেখানেই থাকি, বাড়িতে ঢুকে প্রথমে সালাম দেই। এরপরে মাকে একটা ডাক দেই। মা বাড়ির যেখানেই থাকে, সালামের উত্তর নিয়ে আমার ডাকে সাড়া দেয়।

সেদিন ও তাই, আগের অভ্যাসানুযায়ী সালাম দিয়ে মাকে ডাক দিলাম। মা রান্না ঘর থেকে উত্তর দিয়ে বললেন, এখানে এস না। মেজে বউমা আছে, তোমার ঘরে চলে যাও।

সরাসরি আমার ঘরে ঢুকলাম। কেননা,রান্না ঘরে আমার ছোট ভায়ের বউ। তার সাথে তো আমার পর্দা ফরজ। তাই আর ওদিকে না গিয়ে আমার ঘরে গিয়ে বসলাম। ঘুরে ঢুকে তো একদম “থ” খেয়ে গেলাম। পুরো টেবিল ভরে গেছে বিভিন্ন খাবারে। আমের আচার, হাতে কাটা সেমাই, আম,কাঠাল, লিচু, পেঁয়াজু, নানান খাবারে সাজানো। আমি যা পছন্দ করি, সব এনে হাজির করেছে মা।

আমি একটা একটা করে জিজ্ঞেস করলাম, মা এটা কি? বাবা এটা আমের আচার। তুমি তো কাঁচা আমের সময় বাড়িতে আসলেনা। তাই তোমার জন্য আচার বানায়ে রেখেছি। এটা কি? এটা হাতে কাটা সেমাই পিঠা। মার্চ মাসের শেষের দিকে বাড়িতে মেহমান এসেছিল, তখন আমরা সেমাই পিঠা তৈরী করে ছিলাম, তোমার জন্য ফ্রিজে রাখা ছিল। মার্চ টু জুনের সাত তারিখ। এতদিন ধরে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে সেমাই পিঠা, আহ,,,,,

এভাবে প্রত্যেক জিনিসের নাম কৌতূহল বশত: জিজ্ঞেস করলাম। মা তার উত্তর দিতে থাকল। আরো যে কত জিনিস হাজির করেছে, সব গুলো লেখা সম্ভব নয়। মা জানে, আমি রান্নাতে সয়াবিন তৈল খাই না। তাই একদম খাঁটি সরিষার তৈল এবং নারিকেল তৈলের ব্যবস্হা করে রেখেছে। সাথে আমাদের ক্ষেতের পোলার চাল, খেসাড়ির ডাল, আরো অনেক কিছু প্যাকেট করে করে সব টেবিলে সাজানো। আমি যেন বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরার সময় সব কিছু সাথে নিয়ে যাই।

মানে “মা ” যা করে তার ছোট্ট খোকার জন্য। তা আজো করে যাচ্ছে। আমি কি পছন্দ করি, কোন জিনিসের বেশী ভক্ত আমি, সবই মা তৈরী করে রাখে সব সময়। ছোট বেলার একটা স্মৃতি এখনো আমার খুব মনে পড়ে। মিষ্টি পিঠা বানালে আমি খেতে চেতাম না। মিষ্টি জাতীয় পিঠা আমার অপছন্দ ছিল। একদিন দেখি, মা আমার জন্য ঝাল দিয়ে “পাটি সপটা ” পিঠা বানিয়ে রেখেছে।

এই কথাটা আমার এখনো সব সময় মনে হয়। মায়ের যত বয়স হচ্ছে, তত বেশী স্মরণ হচ্ছে মায়ের স্মৃতিগুলো। মা তো মাই। মায়ের ভালবাসার সামনে সব কিছু কুপোকাৎ। যে যত কথাই বলুক, যে যত মহব্বত- ভালবাসার দাবী করুক। মায়ের ধারে কাছে কোন দিন যেতে পারবেনা। মা চায় তাঁর সন্তানের কল্যাণ। সন্তান যত বড় হোক, মায়ের কাছে, সেই ছোট্ট খোকা।

এখানে আমাদের কওমী নেসাবে একটা কিতাব পড়ানো হয়, ” হেকায়েতুল লতীফ” এর একটা ঘটনা মনে পড়ল।

” দুইজন মহিলা একটা শিশু বাচ্চা নিয়ে ঝগড়া করছিল, বাচ্চাটি আমার। দুই মহিলার একই দাবী। বাচ্চাটা আমার। এই ঝগড়া নিরসনের জন্য কাজীর দরবারে পাঠানো হল তাদের দুজনকে। কাজী সাহেব তাদের নিয়ে বিচারে বসলেন। দুই মহিলার একই দাবী এটা আমার বাচ্চা। কাজি সাহেব তো বিপাকে পড়ে গেলেন, কি করবেন? কোন সমাধানে আসতে পারছেনা। বাচ্চা হল একটা। আর দাবী করছে দুজনে। শেষমেষ কাজি সাহেব একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, জল্লাদকে বললেন, এই শোন! এই বাচ্চাটিকে দু ভাগ করে দুই মহিলার হাতে তুলে দাও। কেননা, দুজনই তাদের দাবীতে অনড়।

কাজী সাহেবের এহেন সিদ্ধান্ত শুনে যিনি বাচ্চার আসল মা, তিনি বলে উঠলেন, খবরদার! খবরদার! আমি বাচ্চা চাই না। আপনি যাকে মনে চায় তাকে বাচ্চা দিয়ে দিন, তবুও আমার সন্তান ভাল থাকুক। দীর্ঘজীবি হোক।

আর ওদিকে নকল মা যিনি। সে তো কিছুই বলেনা, চুপ মেরে বসে আছে। হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনা। কাজী সাহেবের তো বুঝতে বাকি রইল না, কে আসল আর কে নকল। কেননা, যিনি মা, তিনি তো সন্তানের কল্যাণকামী হবেন। তাই আসল মায়ের কাছে কাজী সাহেব সেই বাচ্চাটি তুলে দিলেন।

এজন্য মা সব সময় তার সন্তানের মঙ্গল চায়। যেখানেই থাকুক, কখনো অমঙ্গল কামনা করেনা।

এই নেয়ামত যার ঘরে আছে,সেই সবচেয়ে ধনী। আর কিছু লাগবেনা তার। মায়ের দোয়ার বরকতে সে এগিয়ে যাবে অনেকদুর। তাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। এগুলো লেখার উদ্দেশ্য এটাই, যে সব বন্ধুরা, মায়ের সাথে অসাদাচারণ করেন, সাবধান! সাবধান! দুনিয়া – আখেরাত সব কিছু কিন্তু বরবাদ হয়ে যাবে। দুনিয়ায় কোন দিন শান্তি হবেনা। আবার বেঈমান হয়ে কবরে যাওয়ার সম্ভবনা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ওয়াবিল ওয়ালিদাইনে ইহছানা” তোমরা মাতা- পিতার সাথে সৎ ব্যবহার কর। ( সুরা বণী ইসরাইল)

হাদীসে এসেছে, মাতা – পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মাতা- পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। এ কারণে হুশিয়ার হওয়া চাই। মা- বাবাকে কষ্ট দেওয়া যাবেনা কোন দিন। যদি কেউ দিয়ে থাকেন, তওবা করুন। মা- বাবার কাছে ক্ষমা চান।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের মা- বাবাকে ক্ষমা করুন। যারা কবরবাসি হয়েছেন,তাদের জান্নাত দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *