স্মরণ । আমিনুল ইসলাম কাসেমী
আমার দেখা পীর সাহেব চরমোনাই রহ.
খানকার পীর তিনি আবার ময়দানে বীর। বাংলাদেশে মনেহয় এই প্রথম। এর আগে এরুপ দেখা যায় নি। আমরাতো মনেকরি, পীর মানে খানকার চৌহদ্দিতে বসে থাকবেন। মুরীদ- ভক্তবৃন্দ হাদিয়া নিয়ে আসবে। ব্যস, এতটুকু। পীর হয়ে আবার আন্দোলন সংগ্রাম করবে? পীর হয়ে রাজপথে মিছিল মিটিং? পীরেরা রাজনীতি করবে? এরকম বহু প্রশ্ন দানাবেঁধে আছে মানুষের অন্তরে। কিন্তু সকল প্রশ্নের দাঁতভাঙ্গা জওয়াব দিয়ে খানকার গন্ডি থেকে রাজপথে নেমেছিলেন চরমোনাই এর মরহুম পীর সৈয়দ ফজলুল করীম রহঃ।
পুরোপুরি আকাবির – আছলাফের অনুসারী এই মহান ব্যক্তি খানকায় আত্মশুদ্ধি করেছেন। লক্ষ লক্ষ ভক্তকুলের ইসলাহী কাজে ছিলেন অবিরামভাবে। আবার পাশাপাশি বাতিল শক্তির মোকাবেলায় ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েছেন তিনি। একই মানুষের এমন সিফাত,এমন বৈশিষ্ট খুব কম চোখে পড়ে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন চরমোনাই এর পীর সৈয়দ ফজলুল করীম রহঃ
এ যেন সাহাবাআজমাঈনদের অনুসারী, যাদের বৈশিষ্ট ছিল ” ফুরাসান ফিন্নাহারি ওয়া রুহবানান ফিল লাইল” সাহাবায়েকেরাম দিনে ছিলেন অস্বারোহী সৈনিক আর রাতে দুনিয়া বিমুখ সন্নাসী”। পীর সাহেব চরমোনাই রহ, এর জীবনটা সেভাবে পরিচালিত হয়েছিল। এ মহান সাধক আল্লাহ তায়ালার খাছ ওলী, যিনি রাতে মহান রবের ইবাদতে মশগুল থাকতেন। বিপথে চলা মানুষগুলোকে আল্লাহর রাহে ডেকে-ডেকে নিয়ে আসতেন, আবার তিনি বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। খোদাদ্রোহী- নাস্তিক- মুরতাদ, ইসলামবিরোধী শক্তির আতঙ্ক হিসেবে তাঁর রুপ প্রকাশ পেত। এক সাহসী সৈনিক বাতিলের মোকাবেলায়। ঈমানের বলে বলীয়ান এক প্রাণপুরুষ। সত্য- ন্যায়ের পথে সুদৃঢ় অবস্হান।
সৈয়দ ফজলুল করীম রহ, আপোসহীন নির্ভীক- সৈনিক।। সংগ্রাম- সাধনার এক মহান ব্যক্তিত্ব। কশ্চিনকালেও বাতিলের সাথে তাঁকে সখ্যতা গড়তে দেখা যায় নি। কেউ তাঁর সাথে আসুক চাই না আসুক, তিনি হক- হক্কানিয়্যাতের মিশন নিয়ে বিরামহীন ভাবে ছুটে চলেছেন। বাতিলকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেন নি। স্পষ্টবাদী এক সাহসী নেতা। কোন পেশীশক্তি তাঁকে কাবু করতে পারি নি কখনো।
কত ঝড়- ঝন্জা এসেছে। কত ভয়ভীতি। দুশমুনের রক্তচক্ষু দেখতে হয়েছে।হুমকি- ধমকি এসেছে অগণিতবার। মামলা- হামলা হয়েছে বেশুমার। তারপরেও ইস্পাতের মত অটল- অবিচল ছিলেন। যত বাতিল ফেৎনার আভির্ভাব হয়েছে, সর্বাগ্রে তাঁর হুঙ্কার গর্জে ওঠেছে। তাঁর সংগঠন নেমে পড়েছে সেই বাতিলকে মুলোৎপাটন করার জন্য। কাদিয়ানী,মওদুদী, দেওয়ানবাগী, বেদআতী, সকল ফেৎনার আতঙ্ক ছিলেন চরমোনাই এর পীর সাহেব। কাউকে তিনি সমীহ করে কথা বলেন নি।
দেওয়ানবাগী ফিৎনার বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে ময়দানে লড়াই করেছিলেন, তা যেন ইতিহাস হয়ে থাকবে চিরদিন। বাংলাদেশের কোন খানকা থেকে দেওয়ানবাগীর ভন্ডামীর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন নি, এমনকি কোন ইসলামী সংগঠন দেওয়ানবাগীর অসারতা ধরতে পারেনি, কিন্তু চরমোনাই এর মরহুম পীর সাহেব রহ: দেওয়ানবাগীর বিরুদ্ধে এমন আওয়াজ ওঠায়েছিলেন, সারাদেশের হক্কানী আলেম এবং হক্কানী পীর- মাশায়েখ তখন নড়ে চড়ে ওঠেছিল। সেই থেকে দেওয়ানবাগী তার কুফরী আকিদা এবং মানুষকে পাইকারীভাবে তার দলে ভেড়ানোর কাজ ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন তিনি। কোন শক্তিকে তিনি ভয় পান নি। কিছু মিডিয়া পীর সাহেব রঃ এর বিরুদ্ধে গিয়ে কুৎসা রটনা করেছিল। সেগুলো আমলে নেয়নি। পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ” দুই পীরের লড়াই”। পরের দিন তিনি প্রতিবাদে বলেছিলেন, দুই পীরের লড়াই নয়।হক আর বাতিলের লড়াই।
দেওয়ানবাগীর বিরুদ্ধে সে আন্দোলনে সফল মুজাহিদ রুপে খ্যতি লাভ করেছিলেন আলেম সমাজের মাঝে। সেসময়ে যদি তিনি দেওয়ানবাগীর টুটি চেপে না ধরতেন, দেওয়াবাগীর মুখোশ উম্মোচন না করতেন, তাহলে এদেশের হাজারো মুমিন- মুসলমানের ঈমান হরণ করে নিয়ে যেত।
মওদুদী ফিতনার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন তিনি। পীরদের মধ্যে তাঁকেই দেখাগেছে মওদুদী জামাতের অসারতা তুলে ধরতে।
আলেমদের মধ্যে আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ, আল্লামা ফরীদ উদ্দিন মাসউদ দামাত বারাকাতুহুম যেমন মওদুদী ফিতনার মুখোশউম্মোচন করে জাতিকে সতর্ক করেছেন, ঠিক পীর সাহেবদের মধ্যে একমাত্র চরমোনাই এর মরহুম পীর সাহেব রহ, মওদুদী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠতেন। তিনি প্রকাশ্যে রাজপথে বহু বক্তৃতা করেছেন মওদুদী মতবাদের বিরুদ্ধে। যার জন্য তাঁকে এবং তাঁর সংগঠনের কর্মিদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে মওদুদীবাদী সংগঠনের লোকেরা।
তিনি বহুবার ঢাকার বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটের জনসভায় ঘোষনা দিয়েছিলেন, মওদুদীবাদের অনুসারী জামাতে ইসলামী কোন ইসলামী দল নয়। তিনি চ্যালেন্জ ছুঁড়ে ছিলেন আলোচনার টেবিলে বসার জন্য। কিন্তু কোনদিন মওদুদীবাদীরা সাহস পাননি তাঁর সাথে বসার জন্য। বরং দুর থেকে পীর সাহেবকে নানান ভাবে অপমান- অপদস্হ করেছে তারা। এরপরেও দৃঢ় ছিলেন তাঁর কথার উপরে। সে কথা থেকে ফিরে আসেন নি। বাতিল শক্তিতো চিরদিনই বাতিল, সে যতই হকের রুপ ধারন করুক, তাকে বাতিল বলতেই হবে।
একজন মুখলিস পীর ছিলেন সৈয়দ ফজলুল করীম রহ,। জীবনে পীর দেখেছি অনেক। কিন্তু চরমোনাই এর মরহুম পীর সাহেবের মত এত সাদাসিধে পীর আমার নজরে পড়েনি। যার চাল- চলন ছিল এত সাদামাটা কল্পনা করা যায় না। সাধারণ লুঙ্গি পরে থাকতেন। যত বড় অনুষ্ঠান হোক, যত নামী- দামী লোকেরা সেখানে আসুক, তাঁর লুঙ্গি আর নেসফেছাক জুব্বা পরা থাকত।কাঁধের উপর একখানা গামছা। এভাবেই চলা-ফেরা ছিল তাঁর। লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দের যিনি পরিচালক, তারঁ এধরনের সাধারণ জীবনযাপন বড়ই আশ্চার্যের বিষয়।
দেশ- বিদেশে যেখানেই তিনি সফর করতেন, সেখানেই ঐ সাধারণ পোষাক। কোন বিশেষ পোষাক- পরিচ্ছেদ ছিল না। চোখ ধাঁধানো কোন জামাকাপড় তিনি পরেন নি।
চলাফেরা খাওয়া- দাওয়ার মধ্যে কোন আড়ম্বরীতা দেখা যায়নি। থাকার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্হা, কোন আরাম- আয়েশের চিন্তা তাঁর মাথায় আসেনি। দেশের প্রত্যন্ত- অ্ঞ্চলে সফর করতেন। একদম গহীন গ্রাম।অজপাড়াগাঁয়। কোন অভিযোগ থাকত না।
সৈয়দ ফজলুল করীম সাহেব একবার রাজবাড়ী সফরে আসলেন। আমরা তাঁকে রিসিভ করে আনার জন্য ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার সাতৈর এলাকায় গিয়েছিলাম। সাতৈর বাজার থেকেও অনেক ভিতরে। দেখলাম, সেখানকার মুরীদেরা রাত্রি যাপনের জন্য টিনসেড মসজিদের এক কোনার মধ্যে ব্যবস্হা করেছেন। বাথরুম ছিল চাটাই- এ ঘেরা। সারারাত সেখানে থেকেছেন।কোন অভিযোগ তাঁর মুখ থেকে বের হতে দেখলাম না। অবাক হয়ে গেলাম, লক্ষ লক্ষ মুরীদের পীর যিনি, তাঁর এই সাধাসিধে জীবন- যাপন দেখে।
একজন নিরহংকার পীর ছিলেন মরহুম পীর সাহেব। অহমিকার কোন লেশ তাঁর মাঝে দেখিনি। যেখানে রাত সেখানেই কাত। যে কোন ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে পারত।নিজের মনের কথা বলা যেত তাঁর কাছে। ভক্তরা নিজের হালাত শোনাত, পরিবারের হালাত শোনাত, বিভিন্ন পরামর্শ চেত তাঁর কাছে।কিন্তু বিরক্ত হননি কোনদিন।
আমি ছাত্র জীবনে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে জনসভা শেষে তাঁর সাথে মোলাকাত করলাম। একদম আমার দিকে ফিরে, আমার দিকে তাঁকিয়ে তিনি মোসাফাহা করলেন। যেখানে শত শত লোক মুসাফাহা করছে। সকলের সাথে অনেক গুরুত্বের সাথে সাক্ষাত করছেন। কারো সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে মুসাফাহা করেন নি।
অনেকে তো মুসাফাহা করেন দায়সার ভাবে। কথাও বলেন না। পুরোপুরি সুন্নাতের অনুসরণ করতে দেখেছি তাঁকে মুসাফার মধ্যে।
মোটকথা, মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই একজন কামেল পীর, তাকওয়া – পরহেজগারীর মুর্তপ্রতিক ছিলেন। ইখলাস আর নিষ্ঠার সাথে তিনি অগ্রসর হয়েছেন। পুরোপুরি শরীয়াতের পাবন্দী হয়ে চলা একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবটা কেটেছে সুন্নতে নববীর উপরে।
চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের রাজনীতি
বরিশালের সেই সাধাসিধে কালোলোকটা যখন রাজনীতি শুরু করেন, বহু মানুষ ঠাট্রা- বিদ্রপ করেছে তখন। অনেকে ব্যঙ্গ করেছেন। এখনো করেন। চরমোনাইকে বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক শব্দ ব্যবহার করে ডাকতেন। আসল নামটা কেউ ভালভাবে উচ্চারণ করতে চাইতেন না।
সেই আশির দশকের শেষের দিকে চরমোনাই পীর সাহেব রাজনীতিতে যখন আত্মপ্রকাশ করেন।। তখন কতজন কত ভবিষ্যতবাণী করেছিল। কত কথাই না শুনতে হয়েছে। একদম অযোগ্য, গন্ড- মুর্খ, অশিক্ষিত, গোঁড়া, রাজনীতি বোঝেনা। এরকম বহু লকব দেওয়া হত চরমোনাই এর পীর সাহেব এবং তাঁর অনুসারীদের। তারপরেও কিন্তু চরমোনাই পীর সাহেব দমে যান নি। স্বজাতি ভাইদের গালিকে আশির্বাদ মনে করে সামনে বেড়েছিলেন।।কোনদিন কারো কথার জওয়াব তারা দেননি।। মুখ বুঝে সহ্য করেছেন।
মরহুম সৈয়দ ফজলুল করীম রহঃ তো ছিলেন মুখলিস এবং উদার মনের মানুষ। যে যাই বলুক, তিনি কর্ণপাত করতেন না। নিজের কাজকে প্রাধান্য দিতেন। সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়ার ফিকির করতেন সদা- সর্বদা। মর্দে মুজাহিদ এক ব্যক্তিত্ব তিনি। অদম্য সাহস। হার মানা তাঁর কাজ নয়। বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে সামনে পা ফেললেন। কোন সমালোচনা পাত্তা দেন নি কখনো।
আসলে কি সমালোচনাকারীরা, ওঁরা যতই সমালোচনা করেছে, আর চরমোনাই তত এগিয়ে গেছে।। ওঁরা যতই হিংসা করেছে, চরমোনাই আরো সামনে অগ্রসর হয়েছে। সমালোচনাকারীরা যেই সেই। ওঁরা এখনো বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আজো রাজপথে বীরের বেশে দাঁড়াতে পারেনি।
যাদেরকে বলা হয়েছে তখন। অযোগ্য,গন্ড- মুর্খ, অশিক্ষিত, ওঁদের ভাষায় রাজনীতি বোঝেনা! সেসব লোকেরাই কিন্তু দেশ ও জাতির রাহবার বনে গেছে। তারাই এখন শিক্ষা দিচ্ছে রাজনীতি কি এবং কেন?
মহান আল্লাহর কারিশমা বোঝা বড় দায়। যাদেরকে নিচু মনে করত, তারাই এখন রাজনীতির ময়দানের গুরু। চরমোনাই পীর সাহেব এবং তাঁর অনুসারীরা রাজনীতি বোঝেনা বলতেন ? এই না বোঝা লোকেরাই পুরো বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছড়িয়ে দিয়েছে সংগঠন। এমন কোন জেলা- উপজেলা বাকি নেই,যেখানে চরমোনাই এর মজবুত টিম নেই।
আর আমরা যারা বেশী বুঝি আমাদের অবস্হান কোথায়? আমরা কতদুর এগোতে পেরেছি? আমরাতো এখনো পরগাছার মত চলছি। অন্যের কাঁধে সওয়ার হয়ে এখনো। নিজ পায়ে দাঁড়াতে এখনো শিখিনি। এবার বলুন তো কে রাজনীতি বোঝে আর কে বোঝে না।
বাপেরবেটা কাকে বলে? মরহুম চরমোনাই এর ফজলুল করীম রহঃ, সেই ২০০১ সনে ইসলামী আন্দোলনের সাথে এরশাদ সাহেব নির্বাচনী সমাঝোতা করেছিল। কিন্তু বিন্দুপরিমাণ ছাড় দেন নি এরশাদকে। এরশাদ সাহেব ছিলেন দেশের নয় বছরের প্রেসিডেন্ট। তাকে বলে দিলেন, আমার সাথে নির্বাচনী সমাঝোতা হতে হলে, আপনার যতটুকু পাওয়ার আমারও ততটুকু পাওয়ার থাকবে। তাই তো দেখেছিলাম, এরশাদ সাহেব এবং চরমোনাই এর পীর সাহেব, দুইজনই কো – চেয়্যারম্যান ছিলেন।কোন প্রগ্রামে গেলে এরশাদ সাহেবের যেমন চেয়্যার থাকত, পীর সাহেবের তেমন চেয়ার।
দেশের নয় বছরের শাসক।তাকে নাকানী – চুবানী খাওয়ায়ে ছিল চরমোনাই এর পীর। এরশাদ সাহেব হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছিলেন, চরমোনাই ওয়ালারা রাজনীতি কতটুকু বোঝে। পীর সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কতখানি।
আজকাল তো আমাদের নেচার হয়েছে শুধু বিবৃতি মারা। এখন তো অনলাইনে রাজনীতি হচ্ছে। কিছুলোক অনলাইনে নিজেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছেন।মাঠে- ময়দানে তাদের পাওয়া যায় না। কিন্তু চরমোনাইওয়ালারা শুধু বিবৃতিবাজ নয়। আর অনলাইনের রাজনীতি তারা করেনা। চরমোনাইওয়ালাদের রাজনীতি মাটি- মানুষের। জনতার স্বার্থের রাজনীতি। ইবাদত হিসেবে তারা রাজনীতি করে থাকে।
সৈয়দ ফজলুল করীম সাহেব রহ, কথায় নয় কাজে বিস্বাসী ছিলেন। তিনি রাজনীতির শুরু থেকেই একাগ্রতার সাথে সংগঠন পরিচালনা করতেন। কোন ঢিলেমী নয়। কারো প্রতি ভরসা নয়। এক আল্লাহর উপর ভরসা করে তিনি সামনে বাড়িয়েছিলেন। বহু ঘাত- প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে,তারপরেও তিনি হকের উপর ছিলেন অটল।
আরো একটা দুঃখজনক বিষয় হল, চরমোনাইকে দমন করতে গিয়ে বলি, ” আরে ওরা কি? আমরাই তো আকাবির- আছলাফের উত্তরসুরী, আমাদের সাথে যত আলেম- উলামা, চরমোনাই এর সাথে কেউ নেই”।
আমাদের ভালকরে বোঝার দরকার, আসলে কারা আকাবির- আছলাফের উত্তরসুরী? শুধু ঘরে বসে বিবৃতি দেওয়ার কাজ কি আকাবিরগণ করে গেছেন? আমাদের আকাবিরগণ কি এভাবে প্রতিহিংসার রাজনীতি সাপোর্ট করেছেন? শুধু চারদেয়ালের মাঝেই তারা রাজনীতিকে বেধেঁ রেখেছিলেন?
আকাবির- আছলাফগণ কি এভাবে কাপুরুষের মত অন্যের কাঁধে ভর করে জীবন চালিয়েছেন? না তারা তা করেন নি। তারা ছিলেন আপোসহীন। তারা কখনো বাতিলের সাথে সখ্যতা দেখান নি।
পুর্বসুরীগণ শুধু চারদেয়ালের মাঝে ছিলেন না। তারা দেশ ও দশের খেদমতে নিজেকে সঁপে দিতেন।
দেখুন! যারা ছিলেন আমাদের দেওবন্দের মুরুব্বী। শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ,, কাসেম নানুতবী রহ, একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন, তারা বিবৃতির মধ্যে ছিলেন না।। সরাসরি ময়দানে লড়াই করেছেন তারা। সিংহের মত গর্জে ওঠেছেন পরাক্রমশালী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। একদম কুপোকাত করেছিল তাদের। ঘরে বসে কেউ থাকেন নি।কোন আপোস- রফা হয়নি কারো সাথে।
ঠিক চরমোনাই ওয়ালারা বিবৃতিতে নয় রাজপথে। মরহুম পীর সাহেব সব সময় মানুষের পাশে থেকেছেন। মাঠে- ময়দানে, মানুষের পাশে । আর্ত- মানবতার সেবায়। অসহায়, নিপীড়িত মানুষের খেদমত করেছেন বিরামহীনভাবে। নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন মানুষের জন্য।
আকাবির আছলাফগণের হুবহু নকশে-কদমে পা রেখে চলেছিলেন চরমোনাই এর পীর সাহেব রহ,। পুর্বসুরীদের বাতলানো রাস্তায় বিদ্যুৎবেগে ছুটে চলেছিলেন তিনি।। আকাবিরদের পুরোপুরি অনুসরণ করতেন। আকাবির – আছলাফের খানকার আমল আবার জিহাদ, সবই তিনি জারি করে গেছেন।
পুর্বসুরী মুরুব্বী রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ, সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী সাহেব, যেভাবে মানবতার সেবায় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, ঠিক, চরমোনাই মরহুম পীর সাহেব সেভাবে দৃষ্টান্তস্হাপন করেছেন। বসে থাকেন নি। একেরপর এক কর্মসুচি দিতেন। মানব সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতেন।
এক মহামানব যেন তিনি ছিলেন। রাজনীতির পাঠ তাঁর এরকম রপ্ত! ভাবা যায় না। সত্যিকারের রাজনীতিবিদ, সত্যিকারের সেবক ছিলেন তিনি।
সর্ব দিকে সোচ্চার ছিলেন চরমোনাই পীর সাহেব।। সর্ব সেক্টরে । কোথায় ছিলেন না তিনি? মিল- কারখানা, শ্রমিক,ক্ষেত- মুজুর,কৃষক, সর্ব শ্রেণীর জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। কোন মৌসুমী রাজনীতি নয়। বা কোন ইস্যুর অপেক্ষায় থাকতেন না। বা শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক নয়। পুরো দেশ জুড়ে তাঁর রাজনীতি। এমনকি বিশ্ব পরিস্হিতির উপরে তিনি রাজনীতি চালিয়েছেন।
পীর সাহেব রহ: ওআইসি এর মিটিংএ মুসলিম জাতিসংঘ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর সে বক্তব্যটি বিশ্বব্যাপি হাইলাইট হয়েছিল তখন।
তাঁর রাজনীতি সর্বস্তরের মানুষের জন্য ছিল। নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায়ের জন্য নয়। তাঁর আন্দোলন- সংগ্রাম বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে। যখনই জনতার কোন স্বার্থে আঘাত এসেছে।তখনই প্রতিবাদে নেমে যেতেন তিনি।
মানে আকাবির – আছলাফগণ যেভাবে জনতার স্বার্থ আদায়ের সংগ্রাম করেছেন, ঠিক চরমোনাই পীর সাহেব সেই তরিকায় এগোতেন।
একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলেন সৈয়দ ফজলুল করীম সাহেব। তাঁর পলিসি জ্ঞানের প্রসংসা করেছে তাঁর সমকালিন সময়ের রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তিনি যে রাজনীতি বুঝতেন, সেটা কম লোকই বুঝেছে। কেননা, রাজনীতি কিন্তু সবাই বোঝেনা। আর এটা সকলের কাজ নয়।
একটা ঘটনা মনে পড়ল, কারগিলে যখন যুদ্ধ হয়েছিল, ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহঃ তিনি হিন্দু সৈন্যদের জন্য রসদ পাঠায়েছিলেন। যেটা নিয়ে সমালোচনা বয়ে গিয়েছিল পুরো মুসলিম জাতির মধ্যে। অনেকে আসআদ মাদানী সাহেবকে হিন্দুদের দালাল, অনেক গালিগালাজ করেছিল। মাদানী সাহেব তখন ছিলেন সফরে।
যুদ্ধে হিন্দু সৈন্য মারা গেল। অনেক ক্ষতিগ্রস্হ হল। পার্লামেন্টে খুব হট্রগোল হল। মুসলমানদের উপর দোষ চাপানো হল, মুসলিম নিধনের পরিকল্পনা করা হল। কিন্তু কিছু হিন্দু সদস্য তখন প্রতিবাদ করলেন। না, না, মুসলিমদের উপর সবদোষ চাপানো যাবেনা। কেননা, মুসলিম নেতা আসআদ মাদানী সাহেব, হিন্দু সৈন্যদের জন্য রসদ পাঠিয়েছিলেন।তখন সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল।
আসআদ মাদানী সাহেব যখন সফর থেকে দেওবন্দে আসলেন, তখন সাঈদ আহমাদ পালপুরী রহ: বলেছিলেন, হযরত! “সিয়াছাত আপকা হায়, হামারা নেহী” ( রাজনীতি আপনাকে মানায়, আমাদের জন্য রাজনীতি নয়। রাজনীতি সবাই বোঝে না)
ঠিক, রাজনীতি কিন্তু সবাই বোঝে না। রাজনীতি করতে হলে একটা ভিন্ন সমঝ থাকা প্রয়োজন।
পীর সাহেব চরমোনাই রহঃ এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল ঈর্ষনীয়। তাঁর মেধা- মননশীলতা প্রসংসনীয়। আমাদের দেশের বহু ইসলামী রাজনীতিবিদ মিসগাইড হয়েছেন। তাঁরা ইস্তেহাদী ভুল করেছেন। কিন্তু পীর সাহেব চরমোনাই যেটা বুঝে ছিলেন, সেটা সঠিক ছিল। পীর সাহেব তো চেয়েছিলেন, আমরা কারো কাঁধে সওয়ার হবনা। হকপন্হী দলগুলো এক হয়ে থাকব। কিন্তু অনেকে সেটা বোঝেনি। যার দ্বারা অন্যান্য ইসলামী সংগঠনগুলো ক্ষতির সম্মুখিন।
আজকের এই ক্রান্তিকালে মনে পড়ে তাঁকে। আসলে তিনি বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর মত ব্যক্তিত্ব হারিয়ে আমাদের ইসলামী অঙ্গনের অপুরনীয় ক্ষতি হয়েছে।
শেষকথা, মরহুম সৈয়দ ফজলুল করীম রহ,, একজন জবরদস্ত পীর এবং বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ছিলেন। খানকার পাশাপাশি ময়দানে বাতিল শক্তির মোকাবেলায় সোচ্চার ছিলেন। পুরোপুরি আকাবির- আছলাফের অনুসারী এক মহান ব্যক্তিত্ব।
মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসিন করুন। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক : কলামিস্ট


