সাদালাপ । মাহবুব রেজা
বুকের ভেতরে লুকোনো আজিমপুর কলোনি
এক
অনেকদিন পর আজিমপুর কলোনিতে গেলাম। গেলাম মানে যেতেই হলো।
কেন যেতে হলো?
বন্ধুত্বের আহ্বানে।
বন্ধুত্বের আকর্ষণে।
বন্ধুত্বের দুর্বার টানে।
কনক, রিপন আড় সার্ত’র ডাকে সেদিন দীর্ঘদিন পর ছুটে গিয়েছিলাম আজিমপুরে।
অনেক প্রিয়মুখ দেখব- আর দেখব আমার ফেলে আসা প্রিয় স্মৃতির আজিমপুরকে।
সেদিন পার্টি হাউজের পুকুর পাড়ে আমরা আমাদের শৈশবের ফেলে আসা এক টুকরো আজিমপুরকে ফিরে পেয়েছিলাম। করোনা ক্রান্তিকালকে মাথায় রেখে আমাদের কথা ছিল ৫ টা থেকে মাগরেব পর্যন্ত আড্ডা হবে। কিন্তু আড্ডা দেয়ার সময় আর খেয়াল ছিল না কিসের করোনা, কিসের ক্রান্তিকাল!
বিকেল থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত কিভাবে যে সময় পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না আমরা।
আমাদের আড্ডা যেন শেষই হতে চায় না।
আড্ডারা ডালপালা মেলতে মেলতে দীঘল হয়ে উঠল- মধ্যবয়সে এসেও কিশোরদের মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে উঠলাম আমরা।
সময় আমাদের নিয়ে গেল মধুমাখা হিরন্ময় অতীতে।
আমরা হিতাহিত জ্ঞান ভুলে গিয়ে মেতে উঠলাম পুরনো দিনের স্মৃতিতে।
দুই
আমার শৈশবে, বাবামা মারা গেলে আমরা পুরাণ ঢাকা থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম আমার নানীর বাড়িতে।
আজিমপুর কলোনির ২ এর বি-তে। ১৯৮০ থেকে অনেকটা বছর কেটেছে আমার সেখানে।
কত স্মৃতি, কত ঘটনা, কত আনন্দ বেদনার সাক্ষী আমার এই আজিমপুর কলোনি।
আহা! আজিমপুর কলোনি-
সেসময় বেশ কয়েকজন বন্ধুর দেখা পেয়েছিলাম আমি।
যারা প্রকৃত পক্ষে আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল।
আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারের খেলার মাঠ।
লিটিল এঞ্জেলস স্কুলের মাঠে, কিংবা তার পাশের মাঠে সারা বিকেল বল খেলা।
টেনিস কোর্টে ক্রিকেট খেলা।
বালক সংঘ আর কিশোর সংঘের মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা।
সন্ধ্যার পর লোড শেডিঙ হলে, সন্ধ্যার পর কলোনির বিল্ডিঙের ফাঁকে, মাঠে মাদুর বিছিয়ে বড়দের পাশাপাশি ছোটদের ধুমসে আড্ডা।
টিলো এক্সপ্রেস খেলা।
কখনো কখনো কমিউনিটি সেন্টারের টেবিল টেনিস রুমে লাইন ধরে টেবিল টেনিস খেলা।
টেবিল টেনিস রুমের পাশে ছিল টিভি রুম- তার পাশেই ছিল কার্ড খেলার রুম।
বড়রা সেই রুমে বসে চিন্তিত ভঙ্গিতে সিগারেটে ধোঁয়া উড়িয়ে কার্ড খেলতেন।
আমরা ছোটরা বড়দের কার্ড খেলা দেখতাম আর ভাবতাম কবে আমরা বড়দের মতো বড় হবো আর এরকম করে মুখে সিগারেট গুঁজে, ধোঁয়া উড়িয়ে অভঙ্গি করে কার্ড খেলব।
এখন বড় হয়েছি ঠিকই কিন্তু সেসব আর নেই।
সময়ের ধাক্কায় সেই খেলার জায়গা দখল হয়ে গেছে নষ্টদের হাতে পড়ে।
তিন
বৃষ্টির দিনে কমিউনিটি সেন্টারের মাঠে ফুটবল খেলে মধ্যের পুকুরে গোসল করে বাড়ি ফিরেছি- খেলা শেষে ঘরে ফিরলে বড়দের হাঁতে নিশ্চিত উত্তম মধ্যমের শঙ্কা আর সম্ভাবনাকে কাঁধে নিয়ে।
‘ভয় কি মরণে’র আদলে আমরাও ভাবতাম ‘ভয় কি মাইর খাওনে’- তখন কারণে অকারণে বড়দের হাতে মার খাওয়া আমাদের জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না।
বৃষ্টি এলেই আমরা বন্ধুরা মিলে বড়দের উত্তম মধ্যমের বিষয়টাকে আমলে না নিয়ে বল খেলতে নেমে যেতাম- সেসময় সাহসের দিক থেকে আমরা একেকজন ছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীরপুরুষ।
সেসব দিনের বন্ধুরা এখন কে কোথায় আছে?
কেউ আছে দেশের বাইরে, কেউ দেশের ভেতরেই আবার কেউ হয়ত পৃথিবীর অপারে চলে গেছে। তবে যে যেখানেই থাকুক না কেন আমাদের বন্ধুদের সবাই যেন সুখে শান্তিতে থাকে- এই কামনাই করি।
চার
কনক, আমি, রিপন আর সার্ত- চার বন্ধু ফেলে আসা অতীত দিনে হারিয়ে গেলাম। আজিমপুরে বেড়ে ওঠা আর একে ঘিরে আমাদের জীবনে কত কত মধুর স্মৃতি-ভাণ্ডার আমাদের পরবর্তী জীবনকে কিভাবে মহিমান্বিত করেছে- ঐশ্বর্য মণ্ডিত করেছে বুঝতে পেরেছি।
আজিমপুর কলোনির জীবন- এক আলোকিত জীবনের নাম।
আজিমপুর কলোনির অগ্রজেরা নানাভাবে আমাদের মধ্যে বড় হওয়ার বীজটি বপন করে দিয়েছিলেন অতি যতনে।
আড্ডা শেষ হওয়ার আগে কনক বলল, সার্ত খুব ভালো গান গায়- ছায়ানটে শিখেছে। এখন ও একটা গান শোনাবে।
সার্ত খুব দরদ দিয়ে সন্ধ্যারাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গেচুরে গাইতেঁ থাকল,
সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে,
শোনো শোনো পিতা।
কহো কানে কানে,
শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।
ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে, সদাই ভাবনা।
যা-কিছু পায় হারায়ে যায়, না মানে সান্ত্বনা।
সুখ-আশে দিশে দিশে বেড়ায় কাতরে–
মরীচিকা ধরিতে চায় এ মরুপ্রান্তরে।
পার্টি হাউজের বাঁধানো পুকুর পাড়ে কলোনির অনেকেই বিকেল থেকে হাঁটতে আসে। সেদিন সন্ধ্যা উতরে যাওয়া রাতের বেলায় আমাদের আড্ডা শেষের এই গান তাদের কয়েকজন দাড়িয়ে শুনছিলেন।
সার্ত’র গান শেষে আমরা উঠে পড়লাম।
আমরা আমাদের বুকের ভেতর ধারণ করি এক টুকরো আজিমপুর।
এক টুকরো আজিমপুর কলোনি।
এক টুকরো মায়াময় আজিমপুর কলোনি- যে কলোনি-জীবনের কাছে আমরা নানাভাবে ঋণী।
প্রিয় আজিমপুর কলোনি, তুমি ভালো থেকো…
১৩ জুলাই, ২০২০


