বন্যার পানিতে একাকার দেশের মধ্যাঞ্চল

বন্যার পানিতে একাকার দেশের মধ্যাঞ্চল

বন্যার পানিতে একাকার দেশের মধ্যাঞ্চল

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে বন্যা। বন্যার পানিতে মানুষের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ। দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। অনেক এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে।

শহরাঞ্চলে সরকারি বিভিন্ন অফিসেও ঢুকেছে পানি। কোথাও কোথাও রেলপথও প্লাবিত হয়েছে। ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি ঢুকেছে বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে।

ঢাকার চারপাশে এই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সুখবর দিতে পারেনি বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তাদের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সোমবার ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর পানি আরো বাড়তে পারে।

এ ছাড়া ঢাকার পাশের মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির খবর নেই। ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আজ আরো অবনতি হতে পারে। তবে গত কয়েক দিন উজানে যেভাবে ভারি বর্ষণ হয়েছিল, রোববার তেমনটি হয়নি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি পানির স্টেশনের মধ্যে ৪৪টি স্টেশনের পানি বাড়ছে। ৫৪টির কমছে। অপরিবর্তিত রয়েছে তিনটি স্টেশনের পানি। বিপৎসীমার ওপরে স্টেশনের সংখ্যা এখন ২৮ আর বিপত্সীমার ওপরে নদীর সংখ্যা ১৮। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল থেকে বাড়ছে। সোমবারও পানি বাড়তে থাকবে। যমুনা নদীর পানিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল থেকে কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পানি আরো কমবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে কমছে। এটি আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরো কমবে।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর ও নওগাঁর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। আবহাওয়া অফিস বলছে, এই বন্যা আগস্টেও ভোগাবে।

এদিকে, মানিকগঞ্জে রোববার বিকেলে আরিচা পয়েন্টে যমুনার নদীর পানি বিপত্সীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নদী কালিগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পানিও বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। পদ্মা ও যমুনা নদী সংলগ্ন হরিরামপুর, দৌলতপুর ও শিবালয় ১৫ দিন ধরে বন্যাকবলিত। এই তিন উপজেলায় লাখো মানুষ গৃহপালিত পশু নিয়ে এখন পানিবন্দি। হরিরামপুরের সঙ্গে ঢাকা ও জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমসে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। কুমুদিনী মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাসের রাস্তাও প্লাবিত হয়েছে। কুমুদিনী হাসপাতাল রোড প্লাবিত হয়ে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এদিকে ভূঞাপুরের ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়েছে লাখো মানুষ। বেশির ভাগ বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকেছে। অনেক কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি ঢুকে পড়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

মাদারীপুরের রাজৈরের কবিরাজপুর, ইশিবপুর, বদরপাশা ইউনিয়ন ও মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া, রাজটি, শিলারচর, পাঁচখোলা, কালিকাপুর ও খোয়াজপুর ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

রাজবাড়ীতে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পাঁচ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে গোয়ালন্দ পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লায়। তলিয়ে গেছে গোয়ালন্দ বাজার দৌলতদিয়া ঘাট রেলপথের দুই কিলোমিটার অংশ। দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ডুবে যাওয়ায় সেখানে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেরিতে ওঠানামা করছে গাড়ি। পাশাপাশি পদ্মায় প্রবল স্রোতের কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি সার্ভিস ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে মধুমতী নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী এলাকায়। প্রতিদিনই ভাঙছে নদীর পার। এতে পাকা সড়ক, বাড়িঘর, কৃষিজমি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ গাছপালা ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

পদ্মা ও কীর্তিনাশার পানি বাড়তে থাকায় শরীয়তপুরের নতুন নতুন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কটির আট-দশটি স্থান। সড়কটি দিয়ে গত শুক্রবার থেকে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার চারটি পৌরসভা এবং জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৫০টি গ্রামের প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কীর্তিনাশা নদীর বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এতেও প্রায় ২০টিরও বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বেড়ে সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে ১৬৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের জন্য ৫৭টি আশ্রায়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এদিকে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপৎসীমার ওপর স্থিতিশীল থাকলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্যাকবলিত সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

নাটোরের সিংড়ায় অসংখ্য বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। ২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে বানভাসি মানুষ। সিংড়ায় পাঁচ হাজার ৬০০ পরিবার, নলডাঙ্গা ও গুরুদাসপুরে এক হাজার পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাইবান্ধা জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি রোববারও অপরিবর্তিত ছিল। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি স্থির রয়েছে। ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তার পানি কমছে খুব ধীরে।

জামালপুরের সরিষাবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ফের পানিতে ডুবে যাওয়ায় রোগীরাও পড়েছে দুর্ভোগে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে তৃতীয় দফা বন্যায় প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জের তিন হাজার ৩৪৯ জন খামারির চার হাজার ৫২টি পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। চলতি রোপা আমনের জন্য বীজতলা তৈরি করায় ৫৯ হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে ২২০ হেক্টর জমির আউশ ধান। সড়কব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। চার উপজেলার সঙ্গে এখনো সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

হবিগঞ্জের বানিয়চংয়ে ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে এরই মধ্যে সব কটি ইউনিয়নই বন্যার কবলে পড়েছে। হাট-বাজার এমনকি একটি পশুর হাটও বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। লাখাই ও মাধবপুরেও বাড়িঘরে ঢোকে পড়েছে পানি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *