মহাপুরুষের মহাপ্রয়াণ : কিছু কথা কিছু ব্যথা
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রোজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬:২০ মিনিটে কোটি কোটি বাঙালি, আরবি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও অপরাপর বিশ্বে বসবাসকারী মুসলিম জাতীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান রাব্বুল ইজ্জতের পূণ্যময় সান্নিধ্যে চলে যান শায়খুল আরব ওয়াল আজম শায়খুল ইসলাম মাদানী রহঃ এর সুযোগ্য খলিফা, বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় অর্ধ কোটি মানুষের স্বপপুরুষ, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারি মাদ্রাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমাদ শফী সাহেব (নাওয়ারাল্লাহু মারক্বদাহু)। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হযরতের মৃত্যুতে গোটা দেশ থমকে যায়, নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় বাংলাদেশ। গত কয়েক দশকে শুধু বাংলা নয় বিশ্বের বুকে এভাবে কারো মৃত্যুতে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরে হাহাকার নেমে আসে নি। এটা সত্যিই বিরল। শায়খের ইন্তেকালের খবর শুনতেই হকচকিয়ে যায় বিশ্ব মিডিয়া। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়চে ভেলে, হিন্দুস্থান টাইমস, আনন্দবাজার পত্রিকা সে রাতেই হযরতের মৃত্যু খবর ফলাও করে প্রচার করতে থাকে।
সাথে দেশের প্রথম সারীর সকল পত্র পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ ও ইলেকট্রিক মিডিয়া, আঞ্চলিক পত্রিকাদির সরব উপস্থিতি তো আছেই।
মহাপ্রয়াণের রাতেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রী, মন্ত্রী, এমপি, আমলা পুলিশের আইজিপি, র্যাব, বিডিআর, সেনাবাহিনী, দেশবরেণ্য উলামা, বুদ্ধিজীবী সহ দেশের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে শোকাতুর হৃদয়ের অভিব্যক্তি আসতে থাকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গন- আরব, আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা, শ্রীলঙ্কা থেকে একের পর এক ও লাগাতার আসতে থাকে শোক বার্তা। আর দোয়া দুরুদ? ইয়া মাবুদ! শায়খের ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ফল্গুধারার মতো বাংলাদেশের সকল মসজিদ মাদ্রাসায় একযোগে হযরতের জন্য দোয়া হয়। হাজার হাজার কুরআন খতম হয়। (আমি অধমও হযরতের রূহের মাগফিরাত ও দারাজাত বুলুন্দীর জন্য এক খতম কুরআন পড়েছি)
প্রিয় পাঠক! বাংলার ইতিহাসে এমন বিরল অমর কীর্তি শেষমেশ একজন নবীর ওয়ারিশই গড়ে গেলেন সুবহানাল্লাহ! উস্তাদের মাইর শেষ রাতে বলে একটা কথা আছে না!
সাথে সাথে শায়খের এ প্রস্থান বিশ্ববাসীকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিল “এমন জীবন করিবে গঠন মরিয়া হাসিবেতুমি কাঁদিবে ভূবন”।
এক নজরে আল্লামা শাহ আহমাদ শফী সাহেব রহ
জন্ম :
১৯১৬ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা বরকত আলী ও মেহেরুন্নেছা দম্পতির আদুরে সন্তান আমাদের শায়খ আল্লামা আহমদ শফী (রহঃ)।
অধ্যয়নের সোনালি সময়ে :
বালক শাহ আহমদ শফী বিশ্ব জয়ের নেশায় রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মাদ্রাসায় তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর পটিয়ার আল জামিয়াতুল আরবিয়াতুল ইসলামিয়া জিরি মাদ্রাসায় কিছুদিন লেখাপড়া করেন। তারপর দশ বছর বয়সে তিনি হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘদিন অধ্যায়ন করার পর ১৯৪১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে যান এবং দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং এখানে তিনি চার বছর তাফসির, হাদিস, ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসাইন আহমদ মাদানির সংস্পর্শে আসেন এবং তার কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষালাভ করেন।
দরসের ময়দানে :
১৯৪৬ সালে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলামে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে মাদ্রাসাটির মজলিশে শুরা তাকে মহাপরিচালক বা মুহতামিম নিযুক্ত করে। পরবর্তীতে তিনি মাদ্রাসাটির শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পান।
নেতৃত্বের আসনে :
২০০৮ সালে তিনি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড– বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হাটহাজারী মাদরাসা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠন করা হলে শায়খ আল্লামা আহমদ শফী সাহেবকে এর আমির মনোনীত করা হয়।
কালের খেয়ায় জীবন সায়াহ্নে :
হযরতের জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল বড় বেদনা বিধুর, শোকাতুর। জামাত শিবিরের বলয়ে গড়ে উঠা বাহিনীর উপর্যুপরি চাপে কয়েক যুগ ধরে আপন সন্তানের মতো নিজের শ্রম, মেধা, সময় ব্যয় করে অনন্য উচ্চতায় আসীন করা প্রিয় প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক পদ থেকে সরে উপদেষ্টা হতে বাধ্য করা হয়।
জীবন সায়াহ্নে এসে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া তাঁর জন্য কতটা হৃদয়বিদারক ছিল তা কেবল তিনিই বলতে পারতেন। আমার তো মনে হয় তিনি যদি মদীনা যাওয়ার সুযোগ পেতেন তাহলে রওযায়ে আতহারে গিয়ে করুণ সুরে গেয়ে উঠতেন `নবীয়ে আকরাম শাফীয়ে আ’যম দুখে দিলু-কি সালাম লে- লো’।
কিন্তু সে সময়ের আগেই জঞ্জালে ভরপুর দুনিয়াকে গুডবাই বলে মাওলায়ে কারিমের স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে পরম শান্তির ঠিকানা খুঁজে নিলেন বাংলার প্রবীণ এই শায়েখ।
স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ জানাজা :
শায়খের জানাজাকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী উপজেলায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। জানাজায় শরিক হতে আসা সবাই চোখে করে অনবরত পড়তে থাকা জল নিয়ে এসেছেন। আর হা হুতাশ, নিদারুণ হাহাকার তো আছেই।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরো হাটহাজারীর সব প্রবেশ পথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দিতে প্রশাসন বাধ্য হয়। ৪ উপজেলায় ১০ প্লাটুন বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ এবং ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়।
জানাযা শেষে তাকে হাটহাজারী মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বায়তুল আতিক জামে মসজিদের সামনের কবরস্থানে দাফন করা হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এটিকে বাংলাদেশের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাযা বলে অবহিত করেছে।
কিছু ব্যথা ও অসহনীয় দৃশ্য :
`বাংলা ট্রিবিউন’, `প্রথম আলোর’ কল্যানে আমরা সব শেষে যে চিত্র দেখেছি তাতে মুখগহ্বর মাছি প্রবেশের বিরাট হা অপরিহার্য হয়েছিল। শায়খের খাটিয়া বহনের লোকের এত অভাব পড়ল যে, যারা শায়খের সোনায় মোড়ানো জীবনকে বারবার কলুষিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছে, তাদের চক্রান্তেই প্রিয় হাটহাজারীর পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি পেতে হয়েছিল। সেই দেশ, জাতী ও ধর্মের শত্রু, বেঈমান জামাত শিবিরের সদস্যরা হযরতের খাটিয়া কাঁধে বহন করে কেমন যেন তেতে উঠা আগুনে ঘিঁ ঢেলে দিল!
কি দুঃসাহসটাই না তারা দেখাল কিন্তু কার বদৌলতে, কার অনুকম্পায়? এ দেশের অগণিত মানুষের মুখে সবকিছু ছাপিয়ে এখন এই একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে উচ্চারিত হচ্ছে। অনেকে তো অলরেডি বলেই ফেলেছে, যারা এদেরকে শায়খের খাটিয়া বহনের সুযোগ দিয়েছে নিশ্চয়ই তারাই ২০১৩ ইং তে পশ্চাতে হেফাজত আন্দোলনকে নস্যাৎ করার সুযোগ দিয়েছে।
সাউন্ড গ্রেনেড সাহেবদের উপস্থিতিতে এহেন কাজ এদেশের আপামর জনতা ভালো চোখে গ্রহন করেনি। আপনাদের উপস্থিতিতে যখন জামাত শিবির নেতারা শায়খের খাটিয়া কাঁধে নেয় তখন মনে মনে ভাবি, `ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’।
শেষ বিদায়ে খাটিয়া বহনের এত এনার্জি শিবিররা পেল কই? দেশ জাতী ধর্ম নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলতে ভালোবাসে তাদের বিরুদ্ধে যিনি সারা জীবন সোচ্চার ছিলেন আজ তার মরদেহ তারাই বহন করে! নিজেদের হক্ব ও হক্বানিয়্যাতের ডিলার পরিচয় দিতে তোমাদের লজ্জা করা উচিত। গোলাম গোলামই থাক, মনিব হওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখিও না। তোমরা মনিব হলে এ দেশ আবার রসাতলে যাবে। চারপায়া খাটিয়া বহনের হিম্মত যাদের নেই তারা আবার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ষোল কোটি মানুষের ভার কিভাবে বহন করিবে?
বিদায়ের আগে :
২০০৮ সালের কথা,আমি তখন আশুলিয়ায় জামিয়াতুল আবরারে পড়ি। আমাদের বার্ষিক মাহফিলের প্রধান অতিথি আল্লামা শাহ আহমাদ শফী সাহেব। রাত জেগে জেগে সানন্দে ফেস্টুন, ব্যানার, চুনকাম করে মাদ্রাসা এলাকা সজ্জিত করলাম। চোখেমুখে উজ্জ্বলতার ছাপ নিয়ে মহাপুরুষের আগমনের প্রতিক্ষায় রইলাম। কিন্তু না, আমাদের কচি হৃদয়গুলো চুরমার করে সংবাদ এলো, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় তিনি এ যাত্রায় আসতে পারছেননা! এখানে আসার জন্য যখন তিনি মাদ্রাসার সিড়ি ভেঙে নিচে নামছিলেন তখন সিড়ি থেকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।
মাহফিলের ঠিক চার মাস পরে এক দুপুরে অনাড়ম্বর পরিবেশে একটি হায়েস গাড়িতে আমাদের চোখের শীতলতা, জগদ্বিখ্যাত বরেণ্য মনিষী আসলেন। খুব কাছ থেকে কালের মহাপুরুষকে নয়ন ভরে অবলোকন করলাম। বড় আলেমরা এত সাদাসিধেও হয়? তিনি তাঁর সরলতায় আমাদের আকাস কুসুম ভুল ভেঙে দিলেন। ইজলাসের মধ্যমনি হয়ে চাটগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, `তালিবুল ইলমের জমানাকে প্রাধান্য দাও, সদা সর্বদা সুন্নতের পাবন্দি করিও’। আরো অনেক অনেক কথা যা আজো কানে ঝংকৃত হয়।
লেখক : খতিব, শিক্ষক ও গবেষক।


