বিভিন্ন ফেরকা নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না
সগীর আহমদ চৌধুরী :: “বিভিন্ন ফেরকা, মাযহাব, দল-মত ও ঘরনাকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে বেশি দূর এগোনো যায় না।”
ইসলামি ঐক্যের জন্য দুটো জিনিসের ভীষণ প্রয়োজন। যথা-
#এক. পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পরমত সহিষ্ণুতা ও সহযোগিতা।
#দুই. রাজনীতিতে ইসলামপন্থিদের নির্বাচনী সমঝোতা, যাতে একই আসনে ইসলামপন্থিদের একাধিক প্রার্থী না হয়।
ঐক্য বলতে আপতত এটুকুও হলেই অনেক কিছু হয়ে যায়, এটুকু হলেও ইসলামপন্থিরা অনেক দূর এগিয়ে যায়। ১৯৭৭ সাল থেকে আইডিএল, ইত্তেহাদুল উম্মাহ, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ইসলামপন্থিদের অনেক ঐক্যপ্রচেষ্টা জাতি দেখেছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, “বিভিন্ন ফেরকা, মাযহাব, দল-মত ও ঘরনাকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে বেশি দূর এগোনো যায় না।” এটাই বাস্তব, এটাই সত্য।
সহীহ নিয়ত, ভালো উদ্দেশ্য ও প্রবল জযবার সাথে প্রাথমিকতা শুরু হলেও বেশ অনেকগুলো বাস্তবতার কারণে ইসলামি ঐক্য বেশি দূর এগুতো পারে না। যেমন- (১) দলীয় প্রাধান্যের চেষ্টা, (২) নেতাদের পারস্পরিক আত্মমর্যাদা, (৩) ইলমি যোগ্যতার বড়াই, (৪) পরস্পরকে তাচ্ছিল্যজ্ঞান, (৫) আত্মকেন্দ্রীক নেতাগণ তাদের সাহেবজাদা ও খাদেম দ্বারা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়া, (৬) সর্বোপরি ঐক্যসনদ লঙ্ঘন করা।
১৯৭৭ সালে গঠিত আইডিএল ভেঙে গিয়েছিল শরীক জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রাধান্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে, সেই দিন ওই ঐক্য ভেঙে গিয়েছিল দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদ জামায়াতের দখল করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। খেলাফত আন্দোলন থেকে প্রথম বেরিয়ে গিয়েছিল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, তারা সেদিন হযরত হাফিজ্জী (রহ.)-কে শিয়াদের দোসর ঘোষণা করেছিলেন।
এরপর খেলাফত আন্দোলন চূড়ান্তভাভে ভেঙে যায় নেতৃবৃন্দের আত্মকলহের কারণে। এই আত্মকলহের একটি পক্ষ ছিল সাধারণ নেতৃবৃন্দ এবং অন্যপক্ষ ছিল হযরতের পরিবার তথা সাহেবজাদা মরহুম হামিদুল্লাহ ও জামাতা মরহুম মুফতি আমীনী। সেদিন খেলাফতে তাঁদের ভূমিকা ছিল আজকের আনাস মাদানীর মতো। সেদিন তাঁদের বিরুদ্ধে হাটহাজারীর ছাত্রআন্দোলনের ন্যায় যে অভূত্থ্যান সাধারণ নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে হয়েছিল তার মাধ্যমেই খেলাফত আন্দোলন ভেঙে যায়।
নেতৃত্বের প্রতি সবারই কম-বেশ আগ্রহ ছিল, স্বৈরচারিতাও কম ছিল না, নিজের ইলমি যোগ্যতার অহমিকাবশত অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা হতো এখানে। ফলে ইসলামি ঐক্য বেশি দিন টিকতো না। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে ১৯৯১ সালে ইসলামী ঐক্যজোট গঠনকালে বেশ কয়েকটি নীতি অবলম্বন করা হয়। যেমন-
#এক. চেয়ারম্যান-মহাসচিবের মেয়াদ হবে দু’বছর, প্রতি দু’বছর পর চেয়ারম্যান পরিবর্তিত হবে এবং ক্রমান্বয়ে শরীক দলগুলো থেকে নতুন চেয়ারম্যান-মহাসচিব নির্বাচিত হবেন।
#দুই. নীতি নির্ধারণী বিষয়ে শরীক দলসমূহের ঐক্যমত জরুরি, কোনো বিষয়ে শরীক দলসমূহের কেউ আপত্তি উত্থাপন করলে সেই প্রস্তাব বাতিল হবে।
#তিন. জোটের শরীক হবে দল, কোনো ব্যক্তি জোটের শরীক হবে না, ব্যক্তিকে অবশ্যই কোনো না কোনো দলের সদস্য হতে হবে।
ইসলামী ঐক্যজোট থেকে প্রথম বেরিয়ে যায় খেলাফত আন্দোলন, জোটের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মরহুম শায়খুল হাদীসের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদ ত্যাগ না করায়। ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৯১ ও ১৯৯৬ দুটো নির্বাচন করে, এই দুইটি নির্বাচন পর্যন্ত মুফতী আমিনী সাহেব ইসলামী ঐক্যজোটে ছিলেন না। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি জোটে শরীক হলেন, কিন্তু যেহেতু তাঁর কোনো দল ছিল না তাই অনৈসলামিক প্রতিরোধ মোর্চা নামের একটি ইস্যুভিত্তিক সংগঠনকে দল বানিয়ে তিনি জোটে শরীক হন।
১৯৯৯ সালে যখন চার দলীয় জোট গঠন হয় তখন এ ধরনের নীতি নির্ধারণী বিষয়ে শরীক দলসমূহের ঐক্যমতের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে যে সনদ ছিল সেটি লঙ্ঘন করা হয়। চার দলে যোগ দেওয়ার তারিখ থেকে বিগত এক বছরের মধ্যেও এই বিষয়টা জোটের কোনো সভায় আলোচিতও হয়নি প্রস্তাব আকারে। এমনকি কখনো কোনো মিটিংয়ের সাধারণ অ্যাজেন্ডায়ও ছিল না সেটা। এ ছাড়া চেয়ারম্যান-মহাসচিব পদে স্থায়ীভাবে আঁকড়ে থাকার ব্যাপার তো ছিল, যদিও তা জোটনীতির পরিপন্থী ছিল।
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশে সবগুলো ইসলামি দল শরীক হলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও আগ্রহী ছিল। কিন্তু দুইটা পক্ষ (সংগত কারণে নাম প্রকাশ করছি না) বরাবরই হেফাজতের কর্মসূচিতে ইসলামী আন্দোলনের শরীক হওয়ার প্রবল বিরোধিতা করেছে। এমনকি তারা প্রভাব খাটিয়ে সমাবেশে নিষিদ্ধ করে রেজুলেশনও পাশ করিয়েছিল। সেই দিন হেফাজতের সমাবেশসমূহে বিপুল লোকসমাগমে অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে হটকারিতায় লিপ্ত হয়েছিল তারা। না, ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, দরকার নেই তাদের। আজকে অনেকে মজলুম বলে খ্যাত হচ্ছেন, হাকীকত হচ্ছে, তাঁরাও সেদিন ঐক্যপরিপন্থী সেই নিষিদ্ধকরণের নূন্যতম বিরোধিতা করেননি।
মূল কথা হচ্ছে, “বিভিন্ন ফেরকা, মাযহাব, দল-মত ও ঘরনাকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে বেশি দূর এগোনো যায় না।” এ ধরনের সর্ববাদী ঐক্য বেশি দিন টিকে না। এই বাস্তবতায় এখন এটুকু করা যেতে পারে যে, আসুন আমরা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করি, পরমত সহিষ্ণু হই, বিপদাপদে পরস্পরের পাশে দাঁড়াই। আর নির্বাচন এলে একই আসনে ইসলামপন্থিদের একাধিক প্রার্থী যাতে না আসে অন্তত সেই সমঝোতায় উপনীত হই। এমনকি যেসব ইসলামপন্থি দল বিএনপি-আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচনে দাঁড়াবে প্রার্থী যদি আলেম-ওলামা হন সেক্ষেত্রেও সেই আসনে ইসলামপন্থিদের একটি সমঝোতা হতে পারে।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতিক
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়


