প্লট বরাদ্দ পেলেও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেননি ওষুধ শিল্প মালিকরা

প্লট বরাদ্দ পেলেও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেননি ওষুধ শিল্প মালিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ● অবশেষে মুন্সীগঞ্জের বাউশিয়ায় ওষুধ শিল্প মালিকদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেসব প্লটে এখনও অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু করেননি বরাদ্দ পাওয়া মালিকরা। শিল্পনগরীর জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইপিটি) নির্মাণের কাজও শুরু হয়নি। ওষুধ শিল্প মালিকরা বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন। আর ব্যাংক ঋণ পেতে হলে প্রয়োজন বরাদ্দ পাওয়া জমির দলিল। তাই জমির দলিল হাতে না আসা পর্যন্ত ওষুধ শিল্পনগরী পুরোপুরি কার্যকর করার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। যদিও ওষুধ শিল্প মালিক সমিতি বলছে, আগামী দুই বছরের মধ্যেই পুরোপুরি কার্যকর হবে বাউশিয়ার ওষুধ শিল্পনগরী।

২০০৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওষুধ শিল্পের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন বাউশিয়ার ও লক্ষ্মীপুর মৌজায় দুইশ একর জায়গাজুড়ে একটি অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) গড়ে তোলার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকা-ের প্রসার ঘটানো, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরতে পণ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি ও পণ্যের মান উন্নয়নে গবেষণা করাই এই পার্কের প্রধান উদ্দেশ্য।

এছাড়াও ওষুধ উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন ও যেসব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদাঁনি করা হয়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশেই সেগুলো উৎপাদন করা ও কাঁচামাল আমদাঁনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো বা বন্ধ করাও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে বছরে সাশ্রয় হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে মোট ২৭টি কোম্পানির তালিকা শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ ১০ একর ও সর্বনিম্ন ৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম শফিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জমি বরাদ্দ পেয়েছি। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে কোম্পানির অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’ এখনও বরাদ্দ না হওয়া প্লটগুলো প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে নতুন কোনও কোম্পানির নামে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

শফিউজ্জামান জানান, এই শিল্পনগরীতে প্রতি একর জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক কোটি টাকা, যা স্থানীয় দরের চেয়ে অনেক বেশি। তবে মালিকরা সবাই আন্তরিক বলেই এরই মধ্যে তারা তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লটের দাঁমের একাংশ পরিশোধ করেছেন।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সরকারি অর্থে নয়, শিল্প মালিকদের নিজেদের টাকায় শিল্প নগরীতে নির্মিত হবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার। আমরা প্রস্তুত। তবে অবকাঠামো নির্মাণে অবশ্যই ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে বরাদ্দ পাওয়া জমির দলিল। সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী দুই বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যেই নতুন শিল্প নগরীতে কাজ শুরু করতে পারবে দেশের ওষুধ কারখানাগুলো।’

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ৪২টি প্লটের শিল্পনগরী বা পার্কে ওষুধ শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য শিল্প স্থাপন করা হবে। এখানে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতা ও প্রতিকূলতার কারণে মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। এই পার্কে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। ৪২টি প্লটের মধ্যে ১০ বিঘা আয়তনের প্লট ৩৮টি, ৮ বিঘা আয়তনের প্লট চারটি। এখন পর্যন্ত মোট ২৭টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ওষুধ শিল্প নগরী সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, মালিকদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাকি সব কাজও শেষ। সেখানকার কাজ এখন মালিকদের।

প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরপরই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা স্থাপন শুরু হবে বলে জানান তিনি। এতে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল খাতে আমদানি খরচ ৭০ শতাংশ কমে আসবে বলেও আশাবাদী তিনি।

এ প্রসঙ্গে এস এম শফিউজ্জামান বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু কাজ শেষ করেছি। শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার হবে আমাদের ব্যবসায়ীদের টাকায়। সেটি ম্যানেজ করাও একটি বড় কাজ। সেটি করতে কিছুটা সময় লাগছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মিত না হলে তো শিল্প প্রতিষ্ঠান চালানো যাবে না। এছাড়াও ওষুধ শিল্পের জন্য পেনিসিলিন ও নন-পেনিসিলিন পণ্য উৎপাদন ভিন্নভাবে করতে হয়। তাই এর কাঁচামালও হয় ভিন্ন।

এপিআই শিল্প পার্ক প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল বাছেত বলেন, ‘মালিকদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এখন তাদের। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে উৎপাদিত ওষুধ বর্তমানে বিশ্বের ১৩৩টি দেশে রফতানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্যাটেন্টেড ওষুধ উৎপাদনের জন্য বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ছাড় পেয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিগগিরই এপিআই শিল্প পার্ক বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাতে আমদাঁনি ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি রফতানি আয় বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *