বানের পানির ভয়াল রূপ
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বানের পানির ভয়াল রূপ দেখছে রংপুরের মানুষদের। গ্রামটির নাম পাঠক শিকড়। এই গ্রাম থেকে তিস্তা নদীর দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার ও ঘাঘট নদীর দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। ফলে গ্রামের মানুষ নদী ভাঙন ও বন্যার সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। তবুও গ্রামটি অবহেলিত ও উন্নয়ন বঞ্চিত গ্রাম হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর গ্রামটির রাস্তাঘাটের কোন উন্নয়নই হয়নি। এখনও খানাখন্দে ভরা কাঁচা রাস্তা দিয়েই মানুষজন চলাচল করেন। গ্রামটির অবস্থান রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নে।
১৯৮৮ সালে গ্রামের মানুষ প্রথম বন্যার সঙ্গে পরিচিত হয়। ওই বন্যায় রাস্তাঘাট তলিয়ে না গেলেও কিছু বাড়িঘরে পানি ওঠে। তবে এবার ঘাঘট নদের সৃষ্ট বন্যা ১৯৮৮ সালের বন্যাকে হার মানিয়েছে। গ্রামের প্রতিটি রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রায় বাড়িতে পানি উঠেছে। রোপা আমনসহ রবিশস্য পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে ছোট-বড় পুকুরসহ অসংখ্য মৎস্য খামারের মাছ। চারদিকে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
শুধু পাঠক শিকড় গ্রাম নয়, পাশের দাদান, পূর্বপাঠক শিকড়, কৈকুড়ী ইউনিয়নের, মকরমপুর ও সুন্দরগঞ্জের ফলগাছা, দেওডোবাসহ অসংখ্য গ্রামে বন্যা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুরের পীরগাছা ও মিঠাপুকুর উপজেলার মাঝ দিয়ে ঘাঘট নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৩৬ কিলোমিটার। এর পানি প্রবাহমাত্রা অবস্থাভেদে ৫০ থেকে আড়াই হাজার কিউসেক। দখল হয়ে যাওয়ায় ৫০ ফুট প্রশস্ত ঘাঘট নদ এখন ১০ ফুটে এসে ঠেকেছে। ফলে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ঘাঘট নদীটি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। একদিকে পার উপচে ফসলের মাঠে, লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে পানি, অন্যদিকে ভাঙছে নদ। গত পাঁচ দিন থেকে উপজেলার আটষট্টিপাড়া গ্রামসহ আশপাশের ঘাঘটসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় অর্ধশত বাড়ি।
শিকড় গ্রামের নাজিউর রহমান মারুফ বলেন, এই গ্রামের মানুষ এমন ভয়াবহ বন্যা আগে কখনও দেখেনি। প্রতিটি সড়কের ওপর দিয়ে হাঁটু পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বেশকিছু সড়ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্রামটিতে প্রবেশের চারদিকে কাঁচা সড়ক। সড়ক ভেঙে গেলে উন্নয়ন বঞ্চিত গ্রামটির মানুষ চরম বিপাকে পড়বে।
স্থানীয় উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২০ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ১০০ হেক্টর রবিশস্য পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার শামীমুর রহমান বলেন, ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ঘাঘট তীরবর্তী বেশীরভাগ এলাকায় রোপা আমনসহ রবিশস্য পানি নিচে তলিয়ে গেছে। এতে অনেক ফসলের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে নাটোরের সিংড়ায় আত্রাই নদীর পানির প্রবল স্রোতে শোলাকুড়া মহল্লার ১০টি বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৫টি বাড়ি আংশিক প্রবল ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পানি কমলে ও ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে, আতংকে মানুষ মালামাল অন্যত্র সরে নিচ্ছে। সকালে সরেজমিনে গিয়ে নদীর পানি তীব্র বেগে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। পানিবন্দি মানুষেরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই বাড়িতেই মাচা করে তার ওপরে অবস্থান করছে। যাদের সে অবস্থাও নেই তারা ২৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। জেরা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, ইতিমধ্য বিধস্ত হয়েছে জহুরুল, জহির, কুদ্দুস, রহিম, সফের, বাবলু, মতলেব, শাজা, শামিমসহ ১৫টি বাড়ি। আতংকে মানুষ মালামাল সরিয়ে নিচ্ছে। মানুষের নাওয়া, খাওয়া ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা ও স্বেচ্ছাসেবকরা জানায়, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ এমপির নির্দেশনায় ভাঙন রোধে সিংড়া পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব জান্নাতুল ফেরদৌস, শেরকোল ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফুল হাবিব রুবেল ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমাম ও ভিপি সজিব ইসলাম জুয়েলের নেতৃত্বে স্বচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। তবে জনবল দ্রুত বাড়ানো দরকার। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দ্রুত না নিলে আরো ক্ষতি হবার আশংকা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ঢের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান জানান, আত্রাই নদীর পানি বিপদ সীমার ১১১ সেন্টিমিটার থেকে ৫১ সেন্টি মিটারে নেমে এসেছে। তবে বন্যার পানি নেমে যেতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালির বস্তা ফেলে বিভিন্নস্থানে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে।
অপরদিকে বেলা তিনটায় প্রতিমন্ত্রী সিংড়া পৌর এলাকায় বানভাসী মানুষদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। নাটোরের জেরা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ বলেছেন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব ধরণের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।


