অপ্রতিরোধ্য চট্টগ্রামকে থামাল মুশফিকের ঢাকা
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইনিংসের ১৩তম ওভারের শেষ বল, রবিউল ইসলাম রবির স্ট্যাম্পের ওপর থাকা ডেলিভারিতে স্কুপ শট খেলেন তৃতীয় ফিফটির অপেক্ষায় থাকা লিটন দাস। ঠিকঠাক ব্যাটে-বলে হয় সেই শট, যাচ্ছিল ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারির দিকেই। কিন্তু শর্ট ফাইন লেগ থেকে দৌড়ে এসে ফুল লেন্থ ডাইভ দিয়ে অসামান্য দক্ষতায় সেটি তালুবন্দী করেন শফিকুল ইসলাম। বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেন ৩৯ বলে ৪৭ রান করা লিটনের।
পরের ওভারে শফিকুলের হাতেই বল তুলে দেন বেক্সিমকো ঢাকার অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম। অধিনায়কের মুখে হাসি ফোঁটাতে মাত্র তিন বল নেন শফিকুল। তার গুড লেন্থ ডেলিভারিটি মিডউইকেট দিয়ে হাঁকান গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন। কিন্তু সীমানা পার করতে পারেননি, ধরা পড়ে যান ইয়াসির আলি রাব্বির হাতে। আউট হওয়ার আগে করেন ২০ বলে ২১ রান।
দুই ওভারে শফিকুলের ফিল্ডিংয়ের পর বল হাতে এ দুই জাদুতেই নিশ্চিত হয়ে যায় চট্টগ্রামের প্রথম পরাজয়। ব্যাট হাতে মুশফিকের ফিফটির পর বল হাতে যেমন পারফরম্যান্স দরকার ছিল, ঠিক তেমনটাই উপহার দিয়েছেন শফিকুল, রুবেল ও রবিউলরা। যার সুবাদে টানা তৃতীয় জয় পেয়েছে ঢাকা। অথচ নিজেদের প্রথম তিন ম্যাচে হেরেছিল তারা।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের এটি প্রথম পরাজয়। টুর্নামেন্টের প্রথম চার ম্যাচে অপরাজিত থাকার পর ফিরতি পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই হেরে গেল তারা। ঢাকার করা ১৪৫ রানের জবাবে চট্টগ্রামের ইনিংস থেমেছে ৯ উইকেটে ১৩৮ রান করে। ঢাকা ম্যাচ জিতেছে ৭ রানের ব্যবধানে। ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন ৫০ বলে ৭৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলা মুশফিক।
চলতি টুর্নামেন্টে অপ্রতিরোধ্য চট্টগ্রামের জন্য ১৪৬ রানের জন্য লক্ষ্যটা খুব বড় ছিল না। কিন্তু প্রথম ওভারের তৃতীয় বলে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরে যান বাঁহাতি ওপেনার সৌম্য সরকার। তবে উইকেটে এসে প্রথম বলেই দারুণ এক কভার ড্রাইভে বাউন্ডারি হাঁকান অভিষিক্ত মাহমুদুল হাসান জয়। পরের ওভারে নাসুম আহমেদকে জোড়া ৪ মারেন ফর্মে থাকা লিটন দাস।
প্রথম স্পেলে রুবেল হোসেনকে দিয়ে টানা ৩ ওভার করান মুশফিক। যেখানে দ্বিতীয় ওভারে মাত্র ২ রান দেন রুবেল। তবে তার তৃতীয় ওভারেই আসে জোড়া বাউন্ডারি। পাওয়ার প্লে’র শেষ ওভারে শফিকুলের বোলিংয়ে এক্সট্রা কভার দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ছক্কা হাঁকান মাহমুদুল। তবে বেশিদূর যেতে পারেননি, রবিউল রবির ওভারে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ধরা পড়েন নাঈম হাসানের হাতে। তার ব্যাট থেকে আসে ৩ চার ও ১ ছয়ের মারে ২৪ বলে ২৬ রান।
মাহমুদুল ফিরে যাওয়ার পর জুটি বাঁধেন অধিনায়ক মিঠুন ও লিটন। দেখেশুনে জয়ের পথেই এগুচ্ছিলেন এ দুজন। কিন্তু তখন ১৩তম ওভারে দুর্দান্ত ক্যাচে লিটনকে এবং পরের ওভারে ইয়াসিরের হাতে ক্যাচ বানিয়ে মিঠুনকে সাজঘরে পাঠান শফিকুল। মূলত তখনই ঘুরে যায় ম্যাচ, জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায় ঢাকা। লিটন করেন ৪৭ ও মিঠুনের ব্যাট থেকে আসে ২১ রান।
এরপর প্রাণপন চেষ্টা করেছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন, নাহিদুল ইসলামরা। বিশেষ করে উইকেটে এসেই ১৮তম ওভারের শেষ দুই বলে জোড়া চার মেরে সমীকরণটা ১২ বলে ২৩ রানে নামান নাহিদুল। পরের ওভারের প্রথম বলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ম্যাচ আরও জমান মোসাদ্দেক। কিন্তু এর দুই বল পরই ১৩ রান করা মোসাদ্দেককে সাজঘরে ফেরান রুবেল। শেষ ওভারে চট্টগ্রামের জয়ের জন্য বাকি থাকে ১৬ রান।
মুক্তার আলি করেন শেষ ওভার, প্রথম বলেই আউট করেন ৪ বলে ৯ রান করা নাহিদুলকে। তবে পরের বলেই ছক্কা হাঁকান মোস্তাফিজ, সমীকরণ নেমে আসে ৪ বলে ১০ রান। কিন্তু শেষ ৪ বলে আর ভুল করেননি মুক্তার। মোস্তাফিজের উইকেটসহ পুরো ওভারে খরচ করেন মাত্র ৮ রান, ঢাকা পায় ৭ রানের জয়।
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই সাজঘরে ফিরে যান নাইম শেখ। প্রথম ওভারে নাহিদুল ইসলামের অফস্পিনে ভোগার পর, শরীফুল ইসলামের করা দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে ৪ ও তৃতীয় বলে ৬ মেরে চাপ সরানোর চেষ্টা করেন নাইম। কিন্তু সে ওভারের পঞ্চম বলে আবারও মারতে গিয়ে ধরা পড়েন নাহিদুলের হাতে। পরের ওভারে বল হাতে নিয়ে তানজিদকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন নাহিদুল। মাত্র ১৩ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসে ঢাকা।
দলের চাপ আরও বাড়ে পঞ্চম ওভারে সাব্বির আউট হয়ে গেলে। গতকালই প্রথম সুযোগ রাকিবুল হাসানের করা প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলে লেগবিফোরের ফাঁদে পড়েন সাব্বির। তানজিদ আগেই রিভিউ নষ্ট করায় সাব্বির আর তা নিতে পারেননি। এ তিন ব্যাটসম্যানের বিদায়ের কারণে পাওয়ার প্লে’তে মাত্র ২৫ রান হয় ঢাকার। তবে এরপরই মুশফিক ও ইয়াসিরের জুটিতে ঘুরে দাঁড়ায় তারা।
দুজনের পঞ্চম উইকেট জুটিতে আসে ৮৬ রান। শুরুতে হাত খুলে খেলতে পারেননি দুজনের কেউই। ইনিংসের দশ ওভারে পূরণ হয় ৫০ রান। সেখান থেকে শেষ ১০ ওভারে আসে ৯৫ রান। আগের ম্যাচে ফিফটি করলেও গতকাল আর তা পারেননি ইয়াসির। ইনিংসের ১৬তম ওভারে ইয়াসিরকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন মোস্তাফিজুর রহমান। আউট হওয়ার আগে ৩ চারের মারে ৩৮ বলে ৩৪ রান করেন ইয়াসির।
পরে আকবর আলিকে নিয়ে ইনিংসের বাকিপথ পাড়ি দেন মুশফিক। ইনিংসের ১৮তম ওভারে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ২৫তম টি-টোয়েন্টি ফিফটি। শরীফুলের করা সেই ওভারের শেষ দুই চার ও ছয় মারেন মুশফিক। তবে শেষ দুই ওভারে আসেনি কাঙ্ক্ষিত রান। সৌম্যর করা ১৯তম ওভারে ১২ রান হলেও, শেষ ওভারে মাত্র ৭ রান খরচ করেন মোস্তাফিজ।
শেষপর্যন্ত ৭ চারের সঙ্গে ৩ ছয়ের মারে ৫০ বলে ৭৩ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন মুশফিক। আকবরের ব্যাট থেকে আসে ৯ বলে ১০ রান। ঢাকার ইনিংস থামে ৪ উইকেটের বিনিময়ে ১৪৫ রানে। চট্টগ্রামের পক্ষে বল হাতে ৪ ওভারে মাত্র ১৬ রান খরচায় ১ উইকেট নেন নাহিদুল। মোস্তাফিজের ৪ ওভারে হয় ১৯ রান, শিকার ১টি উইকেট। বাকি দুই উইকেট নেন শরীফুল ও রাকিবুল।


