আহ, বিদায় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী

আহ, বিদায় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী

আহ, বিদায় নিলেন আমাদের বাজি! আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। কলমে যেন আজ কোন শক্তি নেই। যেমন বেদনায় ভরা হৃদয়, নির্বাক আমি। তেমন কলমে যেন কথা বলতে চাচ্ছেনা। অশ্রুর ফোঁটা গুলো যেন কলমের উপরে। কালি যেন আজ নেই। শুকিয়ে গেছে। নোনাজলের ফোটা গুলোতে লিখতে হচ্ছে।

আজ সকাল থেকে বাহিরে। ওলামা পরিষদের মিটিং ছিল। মিটিং শেষ করে ফরিদপুর শহরে টি, টি, সি, তে এক জরুরী কাজে বের হলাম। ইতিমধ্যে জোহরের নামাজের আজান। জলদি টি,টি সি, এর মসজিদে রওয়া হলাম।

মসজিদে এখনো পৌছাতে পারিনি। সবে মাত্র অজু খানার পাশে। মোবাইল টা বেজে উঠল। মাহবুব ভাই, রাজবাড়ী ওলামা পরিষদের নেতা। রিসিভ করলাম। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। মনে হল স্বজন কেউ হারিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে মাহবুব ভাই? কান্না জড়িত কন্ঠে শুধু বললেন, কাসেমী হুজুর,,,,,, । আর ভাল বোঝা গেল না।

আমি আবার ফোন ব্যাক করলাম। এবার আর বুঝতে বাকি রইল না। ওলামায়ে দেওবন্দের উজ্জল নক্ষত্র, ঢাকা বারিধারা মাদ্রাসার মোহতামিম, লাখো আলেমের উস্তাদ, হেফাজতে ইসলামের সেক্রেটারী , জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী ইন্তেকাল করেছেন।( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)

কাসেমী আমার আব্বা নয়, আমার চাচা নয়, আমার খালু নয়, ফুফা নয়, প্রতিবেশী নয়, কিন্তু তারপরেও বুক ফেটে কান্না আসছে। দুচোখ ছল ছল করছে। গোমরিয়ে ওঠছে হৃদয় মন্দির। নির্বাক হয়ে গেছি। সব ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছি। স্লথ হয়ে আসছে পা দুটো। হাঁটার শক্তি যেন নেই।

কিন্তু কেন? কেন এই ভালবাসা? কেন আজ ক্ষত- বিক্ষত হৃদয় আমাদের? কেন আজ কান্নার রোল পড়ে গেল দেশ ব্যাপি? লাখো আলেম আর তালেবুল ইলমের হৃদয় এখন ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল। অসাড় হয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের দেহ।

আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী এর সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক। তিনি আমাদের রাহবার। হাজার হাজার আলেম তিনি গড়েছেন। যাকে বলা হয় আলেম গড়ার কারিগর। এদেশের জাহেলী সমাজকে আলোকিত করার মিশন তিনি ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে ছিলেন। লাখো মানুষকে সঠিক রাস্তা বাতলে দিয়েছেন।

আমরা সাধারণ ছাত্র ছিলাম, ছিলাম অজ্ঞ- মুর্খ। কিন্তু কাসেমী সাহেব পথ বাতলে দিয়েছেন। তিনি আমাদের সন্ধান দিয়েছেন। রুহের খোরাক জোগাড় করেছেন। ঘোর অমানিশা কেটেছে তাঁর নিষ্ঠাবান প্রচেষ্টায়।

আহ, বাজি! বলে আর কেউ ডাকবেনা। খোকা ও কেউ বলবেনা। সেই আদুরে ডাক গুলো মনে হলে কান্না ধরে রাখতে পারিনা। কি যে মধুর ডাক ছিল তাঁর।

ছাত্র উস্তাদের ভালবাসা যে কি জিনিস,সেটা নুর হোসেন কাসেমী সাহেব দেখায়ে গেছেন। ছাত্রদের বুকে টেনে নিয়ে ভালবাসা দিয়ে কিভাবে লালন- পালন করতে হয়, তাঁর দৃষ্টান্ত তিনি স্হাপন করেছেন। অমনোযোগী, ডানপিটে ছেলেদের কিভাবে বাগে নিয়ে আসতে হয়, মেধাবী মুখগুলোকে কিভাবে আলোকিত করে পুরো দেশের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হয়, সে বিষয়ে তাঁর মত পারদর্শি ব্যক্তির বড় অভাব।

সত্যি কথা বলতে কি, যখন মালিবাগে পড়তাম, তখন বারিধারা যেতাম দুটো লোকের ভালবাসায়। লাজনার প্রোগ্রামে কিছু শেখার আশায় ছুটে গিয়েছি। সে দুজন ব্যক্তি হলেন,
১/ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ
২/ আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী।

আহ, এই দুই মনিষীর ভালবাসার টানে বহুবার বারিধারাতে ছুটে গিয়েছি। ইসলাহী মাহফিল, তরবিয়তী জলসা, সবটায় শরীক থাকার চেষ্টা করতাম।

কি যে মধুর ভালবাসা। দুই বুজুর্গের মহা মিলনের দৃশ্য তখন দেখতাম। বিশেষ করে, আমাদের বাজি, ( কাসেমী সাহেব) ফরীদ সাহেবকে এত মুল্যায়ন করতেন, যা বর্ননার ভাষা আমার নেই। বারিধারা টু চৌধুরীপাড়া, কতদুর? কিন্তু তারপরেও বাজি! ছাত্রদের ঠেলে পাঠাতেন। যাও যাও বাজি যাও!

কত যে উদার মনের মানুষ তিনি ছিলেন। কত পাহাড়সম ইখলাস ছিল তাঁর। দ্বীলের প্রশস্ততা কত বড়, সেটা মহান আল্লাহ ভাল জানেন। কাউকে তিনি ছোট করেন নি কোনদিন। বরং সকলকে ইজ্জত দিয়েছেন। ভালবেসেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক প্রধান মুফতী, শায়েখ জাকারিয়া রহঃ এর জা- নশীন, ফকীহুল উম্মাহ মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ, এর বিশিষ্ট খলিফা ছিলেন তিনি। সুলুকের লাইনে তাঁর সীমাহীন মেহনত। পুরো রমজান ইতিকাফ করতেন।

মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ,যখন মালিবাগ জামিয়ায় ১৯৯৬ সনে ইতিকাফ করেছিলেন, তখন থেকে দেখেছি, তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। একদম আঠারমত লেগে থাকতেন তিনি। নিজেকে নাচিজ মনে করে শায়েখের খেদমতে লেগেছিলেন। এরপরে মুফতী মাহমুদ সাহেব, যেখানে ইতিকাফ করেছেন,সেখানেই ছুটে গিয়েছেন তিনি।

বারিধারা মাদ্রাসার সেই দুর্দিনের কথা ভোলার নয়। কত মেহনত করতে হয়েছে। সেই বিশাল পুকুর ভরাট করেছে তখন ছাত্ররা। মাদ্রাসার বোর্ডিংএ কি নাজুক সময় গিয়েছে তখন। খাবার থাকতনা। কত বেলা যে চুলা জ্বলেনি বারিধারার, তা মহান আল্লাহ মালুম।

ইখলাসের পাহাড় ছিলেন।শত ভাগ তাওয়াক্কুল ছিল তাঁর মধ্যে। বারিধারা মাদ্রাসাকে তখন সবাই বলত তাওয়াক্কুলের মাদ্রাসা।কঠিন অধ্যবসায়। মোজাহাদা – কোরবানীর সকল ইমতেহান তিনি দিয়েছিলেন। নিজের জন্য নয়, পরিবার – পরিজনের জন্য নয়, দ্বীনী ইলমের তরক্কী, ইলমে হাদীসের সৌরভ ছড়ানোর মিশন নিয়ে তিনি ময়দানে বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন।

নিজেকে ছোট মনে করাই ছিল যেন তাঁর অভ্যাস। কোন দায়িত্ব নিজে নিতে চান নি। জমিয়তের মহাসচিব হওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল না, হেফাজতের সেক্রেটারীর পদও তিনি চান নি। কিন্তু জোর পুর্বক তাঁকে সব দায়িত্ব দেওয়া হত। কাসেমী সাহেবের কথা ছিল একটাই, বাজি! আমি কর্মি হিসাবে থাকতে চাই।শুধু কাজ চাই।

জমিয়তের জন্য যে মেহনত তিনি করেছেন, হেফাজতের জন্য যা করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবেনা। একজন লড়াকু সৈনিকের মত খেটেছেন। বাংলাদেশের আনাচে- কানাচে সফর করেছেন অসুস্হ শরীর নিয়ে। হার না মানা মুজাহিদ।

আহ,, বাজি! এক সাথে ওমরা করেছিলাম। আজো মনে পড়ে সে স্মৃতিগুলো। কত ধৈর্যশীল তিনি ছিলেন। সেবার আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী সাহেব মক্কার মসজিদুল হারামে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন। খাদেম হিসেবে ছিলাম আমরা। মাওলানা মতিউর রহমান গাজীপুরী( জমিয়তের ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী) এবং আমি হুজুরের খেদমত করার সৌভাগ্য হয়েছিল। হুজুরের হুইল চেয়ার ধরে তাওয়াফ করায়েছিলাম আমরা দুজন।

সবচেয়ে বড় এক ভুল হয়েছিল আমাদের দুজনের।খেদমতে ত্রুটি করেছিলাম। বিষয়টা ছিল এমন, কাসেমী সাহেব মসজিদে হারামে ইতিকাফ করতেন, আর আমরা দুই বন্ধু খানা পৌছাতাম। একদিন তো খানা পৌছাতে পারিনি। সেহেরীর খাবার। আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। আমরাও সাহরী না খেয়ে রোজা।সেই সাথে হুজুরেরর খানাও পৌছাতে পারিনি।

পরেরদিন তো আমি আর মতিউর রহমান গাজীপুরী ভয়ে ছিলাম। সাহস পাচ্ছিলাম না। নিশ্চয়ই আজ হয়ত দুজনের বকা খেতে হবে। তবুও দুজন সাহস করে গেলাম। হুজুর যা বলেন সব মাথা পেতে নেব। অনেক ভয়ে ভয়ে হুজুরের হুইল চেয়ারের কাছে গিয়ে বসলাম।

আহ, কি মাটির মানুষ।হৃদয় খানা যেন তাঁর মোমের মত। আমাদের দেখে মৃদু হাসলেন। ঐ ভুলের ব্যাপারে কোন কথাই তিনি বললেন না।

প্রিয় বাজি! আপনি চলে গেলেন।তবে লাখো লাখো মানুষের হৃদয়ে ভালবাসা জিইয়ে রেখে গেলেন। একদম নবী ওয়ালা আখলাকের মুর্তপ্রতিক যেন আপনি ছিলেন।

মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, জান্নাতে সুউচ্চ মাকামে আসীন হোন।সেই কামনা। আল্লাহুম্মা আমিন।

শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *