শেষ করে দেওয়া হচ্ছে উইঘুর মুসলমানদের

শেষ করে দেওয়া হচ্ছে উইঘুর মুসলমানদের

শেষ করে দেওয়া হচ্ছে উইঘুর মুসলমানদের

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : চীনের জিনজিয়ান অঞ্চলে কথিত ‘পুনঃশিক্ষণ’ শিবিরে সংখ্যালঘু মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়ের নারীরা পদ্ধতিগত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যের বরাত দিয়ে আজ বুধবার বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, উইঘুর বন্দিশিবিরে নারীরা যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাঁরা ‘পদ্ধতিগত’ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।

উইঘুর ক্যাম্পে কী হচ্ছে, সে বিষয়ে নতুন করে বিস্তারিত বিবরণ বিবিসির হাতে এসেছে। সেই বিবরণের ভিত্তিতে বিবিসি একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বিবিসিকে এক ভুক্তভোগী বলেছেন, চীনা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো, উইঘুরদের সবাইকে শেষ করে দেওয়া। জিনজিয়ান অঞ্চলের শিবিরে নয় মাস বন্দী ছিলেন তুরসুনাই জিয়াউদুন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শিবির থেকে ছাড়া পান তিনি। পরে জিনজিয়ান থেকে পালান জিয়াউদুন। তিনি প্রথমে কাজাখস্তানে যান। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র। এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
জিয়াউদুনের ভাষ্য, শিবিরে করোনার প্রার্দুভাব নেই। তবু শিবিরের দায়িত্ব থাকা পুরুষেরা সব সময় মাস্ক পরে থাকেন। তাঁরা স্যুট পরেন। তবে তাঁদের পরনে থাকা সেই স্যুট ঠিক পুলিশের উর্দির মতো নয়।

জিয়াউদুন বলেন, ওই পুরুষেরা কখনো কখনো মধ্যরাতের পর শিবিরের সেলে আসেন। তাঁরা সেলে আসেন নারী বাছাই করতে। পরে তাঁরা বাছাই করা নারীদের ‘বিশেষ’ কক্ষে নিয়ে যান। সেই কক্ষে কোনো নজরদারি ক্যামেরা নেই।
জিয়াউদুন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁকে একাধিকবার রাতে সেল থেকে বিশেষ কক্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই পুরুষেরা।

জিয়াউদুন বলেন, তাঁর সঙ্গে শিবিরে যা ঘটেছে, তা ভোলার নয়। এটা সম্ভবত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত। সেখানে তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা তিনি আর বলতে চান না।

জিনজিয়ান অঞ্চলের ‘পুনঃশিক্ষণ’ শিবির বেশ বড়। স্বাধীন হিসাবমতে, এই শিবিরে ১০ লাখের বেশি উইঘুর নারী-পুরুষ বন্দী আছেন। সেখানকার ব্যবস্থা বেশ গোপনীয়। ফলে শিবিরের ভেতরে কী ঘটে, তার খবরাখবর তেমন বাইরে আসে না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, চীন সরকার ধীরে ধীরে উইঘুরদের ধর্মীয়সহ অন্যান্য স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। জিনজিয়ানের শিবিরে উইঘুর নর-নারীকে সব সময় কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। শিবিরে তাঁদের ওপর নানা নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। সেখানে তাঁদের প্রজনন ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জোর করে তাঁদের বিশেষ মতবাদ শেখানো হচ্ছে।
চীনের দাবি,এই শিবিরগুলোতে উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পুনঃশিক্ষণের কাজ চলে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে উইঘুরদের ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি সন্ত্রাসী হামলার জেরে ২০১৪ সালে জিনজিয়ান সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যায়, এরপরই তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের উইঘুরদের ব্যাপারে চরম নীতি গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
গত মাসে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, উইঘুরদের সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষের আচরণ গণহত্যার শামিল।
চীন দাবি করছে, উইঘুরদের গণহারে আটক ও জোর করে তাঁদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করার অভিযোগ ভিত্তিহীন, মিথ্যা।
জিনজিয়ানের শিবিরে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জানতে পারা অনেকটা বিরল ঘটনা। তবে ওই শিবিরের সাবেক কিছু বন্দী ও রক্ষীর অভিজ্ঞতা জানতে পেরেছে বিবিসি। তাঁরা ওই শিবিরগুলোতে ‘পদ্ধতিগত’ গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন। তাঁদের একজন জিয়াউদুন।

ভুক্তভোগী জিয়াউদুন বলেন, প্রতি রাতেই শিবিরের সেল থেকে নারীদের নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিশেষ কক্ষে নিয়ে এক বা একাধিক মাস্ক পরা চীনা ব্যক্তি এই নারীদের ধর্ষণ করেন।

জিয়াউদুন বলেন, তিনি নিজে একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রতিবারই তাঁকে দুই বা তিন ব্যক্তি ধর্ষণ করেছেন।
জিয়াউদুন আগেও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তা কাজাখস্তান থেকে। সেখানে তিনি চীনে ফেরতের ঝুঁকিতে ছিলেন।

জিয়াউদুনের ভাষ্য পুরোপুরি যাচাই করা অসম্ভব। কারণ, চীনে সাংবাদিকদের ওপর কঠোর বিধি জারি করে রেখেছে দেশটির সরকার। তবে তাঁর বিবরণের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ ও আগে প্রকাশিত হওয়া ভাষ্যের মিল রয়েছে।
জিয়াউদুন বলেন, শিবির থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি হয়তো বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি আসলে ‘মৃত’। ধর্ষণের শিকার হয়ে তিনি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছেন।

জিয়াউদুন বলেন, চীনা কর্তৃপক্ষ বলে, শিবির থেকে লোকজনকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাঁর মতে, যে বা যাঁরাই শিবির থেকে ছাড়া পান, তাঁরা আসলে শেষ হয়ে যান। চীনা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যই হলো—সবাইকে (উইঘুর) শেষ করে দেওয়া।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *