চুক্তির মাহফিলে নেই মুক্তি

চুক্তির মাহফিলে নেই মুক্তি

চুক্তির মাহফিলে নেই মুক্তি

হেদায়াত তো সুর, সুন্দর চেহারা কিংবা আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি দিয়ে হয় না, হেদায়াত হয় বক্তার আন্তরিকতা ও আমলের ভিত্তিতে। চুক্তি করা বক্তাদের বড় একটি যুক্তি হলো, আমি যে দাওয়াতি কাজ করছি, আমার সংসার দেখবে কে? এ জন্য চুক্তি করি। কোনো যুগেই বিনিময় গ্রহণ করে দাওয়াতের রেওয়াজ ছিল না। যারা দাওয়াত দিতেন, তাদের সংসারও চলত। ওয়াজ-মাহফিলের খুঁটিনাটি নিয়ে লিখেছেন- আল ফাতাহ মামুন

‘দুই বছর আগে গিয়েছিলাম ঢাকার বাইরের একটি মাহফিলে। মাহফিলের প্রধান বক্তা হেলিকপ্টারে এলেন। তখনো আমি ওয়াজ করছি। প্রধান বক্তা আসায় আমার আলোচনা শেষ করে দিই।

আয়োজকদের সবাই বক্তাকে নিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দুপুরে না খেয়েই আমি আলোচনায় বসেছিলাম। স্টেজ থেকে নেমে কাউকে না পেয়ে পাশের একটি হোটেলে খাবার গেলাম। গণপরিবহনে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। মাহফিল কর্তৃপক্ষ আজও আমাকে কোনো হাদিয়া দেয়নি।’

ওয়ায়েজদের ‘চুক্তি’র বিষয়ে জানতে চাইলে এ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন একজন আলেম। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ সময় বক্তারা বাধ্য হয়েই চুক্তি করেন। সেদিন আমি চুক্তি করলে মাহফিলের আয়োজকরা ঠিকই আমাকে টাকা দিতেন এবং যথাযথ সম্মান দেখাতেন।’

দেশসেরা কয়েকজন ওয়ায়েজ বলেন, মূলত কমিটির দায়িত্বহীন আচরণের কারণেই আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হই। চুক্তি না করলে এখনকার কমিটির লোকজন বড় আলেম মনে করেন না বলেও জানিয়েছেন ওয়ায়েজরা।

রাজধানীর পোস্তগোলার ঐতিহাসিক ১২ দিনব্যাপী মাহফিলের উপস্থাপক মাওলানা কাজী মারুফবিল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন অনেক ভাইরাল বক্তা আছে, যাদের চায়ের পয়সাই দিতে হয় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা! জনপ্রিয় বক্তাদের দাওয়াত দিতে গেলে তারা আমাদের ঘুরাতে থাকেন। নানা অজুহাত দেখান। অনেক সময় সরাসরিই বলে দেন, আপনার ওখানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা পাব অন্য জায়গায়।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষক আলেম লেখক, মাওলানা মুফতি মুহসিন আল জাবির বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক বক্তারা ওয়াজের পবিত্র ময়দানটিই নষ্ট তো করেছেনই- ইসলামের সৌন্দর্য এবং বুজুর্গ আলেমদের সোহবত থেকেও দেশের মানুষকে বঞ্চিত করছেন। মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আবদুল মালেকের মতো যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের ক’জন সাধারণ মানুষ চেনে?

এসব আলেমরা চুক্তি করেন না। কমিটিকে বলব, ভাইরাল মাওলানা, হাসি তামাশা এবং অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলে ‘মাঠ গরম’ বক্তাদের বয়কট করে খাঁটি আল্লাহওয়ালা আলেমদের দাওয়াত দিন। ভাইরাল বক্তা ছাড়া তো মাহফিল জমে না?

সংসার-আয়রোজগার বাদ দিয়ে দাওয়াতি কাজের নির্দেশ পবিত্র কুরআন-সুন্নাহর কোথাও দেওয়া হয়নি।

কমিটির এমন মন্তব্যের জবাবে কী বলবেন প্রশ্ন করলে এ আলেম বলেন, মাহফিল তো যাত্রার আসর নয় যে এটা জমিয়ে তুলতে হবে। হেদায়াত তো সুর, সুন্দর চেহারা কিংবা আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি দিয়ে হয় না, হেদায়াত হয় বক্তার আন্তরিকতা ও আমলের ভিত্তিতে।’

চুক্তিকরা বক্তাদের বড় একটি যুক্তি হলো, আমি যে দাওয়াতি কাজ করছি, আমার সংসার দেখবে কে? এ জন্য চুক্তি করি।

দেশবরেণ্য মুফাসসির আল্লামা শাইখ জামালুদ্দিন বলেন, ‘কোনো যুগেই বিনিময় গ্রহণ করে দাওয়াতের রেওয়াজ ছিল না। তারা দাওয়াত দিতেন, তাদের সংসারও চলত। সংসার-আয়রোজগার বাদ দিয়ে দাওয়াতি কাজের নির্দেশ পবিত্র কুরআন-সুন্নাহর কোথাও দেওয়া হয়নি। তারপরও কারও যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে সব দিক ঠিক রেখে নিজ খরচে ফুলটাইম দাওয়াতি কাজ করবে, শরিয়তে এতে কোনো নিষেধ নেই। কিন্তু দাওয়াতকে ব্যবসা বানিয়ে ফেলা বা এর জন্য পারিশ্রমিক দাবি করা অবশ্যই ঘৃণ্য কাজ। তাবলিগ জামাতের লোকজনও তো ফুলটাইম দাওয়াতি কাজ করেন, কই তাদের তো কেউ ৫০ হাজার, এক লাখ টাকা দেয় না।’

চুক্তি করে দাওয়াতি কাজের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তোমরা রাসূলদের অনুসরণ করো। এরা সত্য পথের অনুসারী। এরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা পারিশ্রমিক চায় না। নিঃসংকোচে এদের অনুসরণ করো।’ (সূরা- ইয়াসিন ২১)

এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, সত্যিকারের ওয়ায়েজের বৈশিষ্ট্য কী? দাওয়াতের বিনিময়ে যে আলেম পারিশ্রমিক বা প্রতিদান চান না, তিনিই প্রকৃত আলেম, তাকেই নিঃসংকোচে মেনে নেওয়া যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য ওয়াজের ময়দান একশ্রেণির ক্যানভাসার, মূর্খ বক্তাদের হাতে জিম্মি। ওয়াজ যে এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর বড় প্রমাণ হলো, করোনাকালীন এফডিসির পরিত্যক্ত অভিনেতারাও এখন টাকা কামাইয়ের জন্য ওয়াজের চেয়ারে বসেছেন।

আমাদের জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কী হতে পারে? সরকার যোগ্য আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে ওয়াজের নীতিমালা প্রণোয়ন করা এখন সময়ের দাবি। যথাযথ ট্রেনিং না নিয়ে কেউই দাওয়াতের ময়দানে কথা বলতে পারবে না- এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে না পারলে ওয়াজের মাঠের দুর্গন্ধ আরও বাড়তেই থাকবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিন।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *