নেমে যাচ্ছে পানির স্তর, সুপেয় পানির সংকটের শঙ্কা

নেমে যাচ্ছে পানির স্তর, সুপেয় পানির সংকটের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক ● ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বর্তমানে দেশে কৃষি ও পানের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানিই একমাত্র ভরসা। কিন্তু নিচে নেমে যাচ্ছে পাতালের অফুরন্ত জলাধা। রাজধানীসহ সারাদেশে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ মিটার নিচের দিকে যাচ্ছে। ফলে এখন বিশুদ্ধ পানি সুবিধার বাইরে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ। সরকারিভাবে নানা ধরনের উদ্যোগের কথা বলা হলেও কার্যকর বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের চিত্রের কোনো হেরফের হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আগামী দিনগুলোতে দেশে সুপেয় পানির ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূ-গর্ভের পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা না হলে ভবিষ্যতে সুপেয় পানি পাওয়া দুঃসাধ্য হবে। সংকট আরও বাড়বে, কমবে না। পানির লেভেল চলে যেতে থাকবে। তাতে পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তীব্র হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের এক যৌথ গবেষণা জরিপে জানিয়েছেÑ বাংলাদেশে সাড়ে ৯ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। ভয়ানক ঝুঁকিতে রয়েছে যশোর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চর, পার্বত্য ও হাওর এলাকার দুর্গম জনপদের মানুষ। মূলত অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা পানি উত্তোলনের ফলে এমনটা হচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে গৃহস্থালি কাজকর্ম, চাষাবাদ নানা প্রয়োজনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। দেশের উজানে পদ্মা ও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীতে ভারত কর্তৃক বাঁধ নির্মাণসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণেও ভূ-গর্ভস্থ পানির চাহিদা বেড়েছে।

সূত্র জানায়, বিগত এক যুগে রাজধানীর পাতাল পানির স্তর নেমেছে দ্বিগুণেরও বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পানির স্তর বছরে ২ থেকে ৩ মিটার নিচে নামছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ নলকূপ রয়েছে। ওই নলকূপ থেকে সেচের জন্য, খাওয়ার জন্য ও শিল্পের জন্য পানি তোলা হয়ে থাকে। ফলে পাতাল পানির লেভেল প্রতিবছর গড়ে প্রায় কয়েক মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। তাছাড়া দেশে বৃষ্টির পরিমাণ দুই মিটার। তা থেকে ১ মিটার পানি রিচার্জ হয়। বর্ষায় নদীর কূল ছাপিয়ে পানি যখন ক্ষেত-খামার ও জলাভূমিতে ঢুকে যায়, সেখান থেকে বাকি পানি রিচার্জ হতো। কিন্তু বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে পাতাল পানি রিচার্জ হচ্ছে না। ফলে পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক গবেষণায় দেখা যায়, ষাটের দশকে ৫০ ফুট নিচ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উঠানো যেতো। কিন্তু এখন ১৬০ ফুট নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। গবেষণায় আরো দেখানো হয়েছে, সাধারণত মাটির নিচ থেকে যে পানি উঠানো হয়, সেটি নদী, খালবিল ও মাটি থেকে পাওয়া। পানি উঠালে প্রাকৃতিকভাবেই আবার পানি চলে আসতো। কিন্তু এখন আর ভূ-গর্ভে সেই পানি যায় না। কারণ সেচ ব্যবস্থা। বোরো মৌসুমে প্রতিবছর যে হারে পানি সেচের জন্য ভূ-গর্ভ থেকে তোলা হয়, সে পরিমাণ পানি মাটির নিচে যায় না। সেচ বিভাগের তথ্যানুযায়ী ২০০৫ সালেও ঢাকা শহরে ১১০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন পানির নাগাল পেতে দ্বিগুণ নিচে নামতে হয়। অর্থাৎ পানি পেতে এখন রাজধানীতে ২২০ ফুট নিচে যেতে হয়।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের জরিপে বলা হয়েছে, সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারার কারণে এবং মৌসুম ভেদে পানি সঙ্কটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘিœত হচ্ছে, শিল্পোন্নয়ন ও কৃষি কাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের ৫৯ ভাগ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এ জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা দুটি। তবে গত দু’বছর এ বিষয়ের ওপর তারা কাজ করেনি। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্রগতির হার বিবেচনায় দেখা গেছে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ ভাগ মানুষ বিশুদ্ধ পানির আওতায় এসেছে। সেই হিসাবে এখনো ৫০ ভাগ মানুষ এ সুবিধার বাইরে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলেছে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে এনে বৃষ্টি, বন্যার পানি শোধনাগারে পরিশোধিত করে সরবরাহ করা হবে। তাহলে একদিকে যেমন ভূ-গর্ভস্থ পানির আধারকে রক্ষা করাও সম্ভব হবে। অন্যদিকে অতিমাত্রায় ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমে আসবে এবং পানিতে আর্সেনিকের আগ্রাসনও অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *