যেভাবে পাকিস্তানে তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসার যাত্রা

যেভাবে পাকিস্তানে তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসার যাত্রা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানের প্রথম মাদরাসা চালু করেছেন রানি খান। এখানে তিনি ইসলাম ধর্মের মৌলিক শিক্ষা, পবিত্র কোরআন পাঠ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা প্রদান করেন। নিজের সঞ্চয় ব্যয় করে তা প্রতিষ্ঠা করেন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রানি খান।

মসজিদের ইবাদতে অংশগ্রহণ বা মাদরাসায় ধর্মীয় পাঠগ্রহণে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কোনো আইনি বাধা-বিপত্তি না থাকলেও অনেক দেশের মতো পাকিস্তানেও দীর্ঘদিন যাবত তাদের সামাজিক অবস্থান ছিল না। তবে সম্প্রতি একজন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য হয়ে নিজেদের জন্য মাদরাসা স্থাপন একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।

রানি খানের মাদরাসায় আগত শিক্ষার্থীরা কোরআন পাঠ, ইসলামের মৌলিক জীবনবিধান ও প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। রানি খানের মতো তাদের মাথাও লম্বা ওড়নায় আবৃত। এক সময় তিনিও তাঁদের মতো কোরআন পাঠ ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ মাদরায় পড়েছেন।

৩৪ বছর বয়সী রানি খান বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে মেনে নেন না। তাই নিজ ঘর থেকে তাদেরকে বের করে দেন। তাদের অনেকের ধারণা তৃতীয় লিঙ্গের লোকেরা মন্দ কাজে লিপ্ত হয়।’

নিজের অশ্রু মুছতে মুছতে রিনা খান নিজের দুঃখভরা অতীতের কথা শোনান। মাত্র ১৩ বছর বয়সে রিনা খান পরিবার থেকে বিচ্যূত হোন। এরপর তিনি ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করতে বাধ্য হোন।

এরপর ১৭ বছর বয়সে রানি খান তৃতীয় লিঙ্গের একটি নৃত্যদলে যুক্ত হোন। বিয়ে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁরা নাচতেন। কিন্তু একজন মৃত সহকর্মীকে স্বপ্নযোগে দেখে তিনি ধর্মচর্চায় নিমগ্ন হোন। এবং আগের নৃত্যশিল্পের পেশা ত্যাগ করেন। নৃত্যশিল্পী সহকর্মী তাঁকে নিজ সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করার অনুরোধ জানান।

তখন থেকে রানি নিজ ঘরে পবিত্র কোরআন পাঠ শুরু করেন এবং মাদরাসায় যাতায়াত করে ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করেন। অতঃপর গত বছরের অক্টোবরে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের জন্য পাকিস্তানের প্রথম মাদরাসা গড়ে তুলেন।

নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ইবাদত ও ধর্মীয় পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। তাছাড়া নিজেদের অতীত জীবনের জন্য তাঁরা অনুশোচনার সুযোগ পাচ্ছে। রানি খান জানান, ‘মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আমি কোরআন শেখাই। পার্থিব ও পরকালে জীবনকে সুন্দর করতে আমার এ যাত্রা।’

রানি খানের প্রতিষ্ঠিত মাদারাসা সরকারি অনুদানে পরিচালিত নয়। তবে শিক্ষার্থীদের চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা করবেন বলে জানিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। মাদরাসার জন্য নিজে সামান্য অনুদান সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি তহবিল গঠনের আশায় শিক্ষার্থীদের কাপড় সেলাই ও এমব্রয়ডারি শেখাচ্ছেন যেন তা বিক্রি করে অর্থ তহবিল গঠন করা যায়।

২০১৮ সালে পাকিস্তানের সংসদ তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে তাঁরা ভোট প্রদানের মতো মৌলিক অধিকার লাভ করে এবং সরকারি নথিতে লিঙ্গ নির্বাচনের সুযোগ পায়।

এতদসত্তেও, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দেশের প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে জীবন যাপন করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাদেরকে অধিকাংশ সময়ই ভিক্ষাবৃত্তি, নাচ ও বেশ্যাবৃত্তির মতো পেশা অবলম্বন করতে হয়।

ইসলামাবাদের ডেপুটি কমিশনার হামজা শাফকাত রয়টার্সকে জানান, মাদরাসাটি তৃতীয় লিঙ্গের লোকদের সমাজের মূলধারায় অঙ্গীভূত করতে সহায়তা করতে পারে। আমি আশাবাদী যে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অন্যান্য শহরেও স্থাপন করা হলে অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটবে।’

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের নির্বাচন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের লড়াই

গত বছর বাংলাদেশের ঢাকায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানে প্রথম মাদরাসা চালু হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের বন্দরনগরী করাচিতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য দল একটি চার্চ চালু করেছে।

২০১৭ সালের আদমশুমারি পরিসংখ্যান মতে পাকিস্তানে ১০ হাজার তৃতীয় লিঙ্গের লোক আছে। তবে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারকর্মীরা জানান, বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যের সংখ্যা তিন লাখের বেশি।

সূত্র : রয়টার্স

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *