আমিনুল ইসলাম কাসেমী : বর্তমান পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী তওবা-ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। একদিকে যেভাবে করোনা ভাইরাস বেড়ে চলেছে। আজ থেকে আবার শুরু হলো লকডাউন। অন্য দিকে আমরা মুরুব্বী হারা হয়ে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে আমাদের থেকে মুরুব্বী উলামায়ে কেরাম বিদায় নিচ্ছেন। মানে ‘মা’ ছাড়া মুরগীর বাচ্চাদের যেমন অবস্থা হয়, তেমন অবস্থা হয়ে যাচ্ছে আমাদের।
আল্লামা আহমাদ শফী ( রহ.) এর পরে মনে করেছিলাম, আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী সাহেব আমাদের মুরুব্বী। এবং সে হিসাবে সবাই বারিধারা মাদ্রাসার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল। পুরো বাংলাদেশের আলেম-উলামাদের নজর ছিল কাসেমী সাহেবের দিকে। আর কাসেমী সাহেব এমন গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি, যাকে বাংলাদেশের সকল উলামা-তলবা ভালোবাসত। তিনি যেন মানুষের হৃদয়ে ঢুকে গিয়েছিলেন খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু আল্লাহর কি মহিমা, তিনি ইন্তেকাল করলেন। বিগত ডিসেম্বর মাসেই চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে।
কাসেমী সাহেবের ইন্তেকালে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশাল ব্যাথা পেয়েছি। মনে হয়েছে কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কেননা,তিনি একজন বেমেছাল ব্যক্তি ছিলেন। অত্যন্ত শরীফ-ভদ্র ব্যক্তিত্ব। আমার দেখা আলেম সমাজের সেরা এক মানুষ।
কাসেমী সাহেবের ইন্তেকালের পরে মনে মনে ভাবতাম, যাক, আরেকজন মুরুব্বী আছে। তিনি মুফতী ওয়াক্কাস। যদিও তিনি ঢাকার বাইরে যশোরে থাকতেন, কিন্তু তাঁর এ্যাক্টিভিটি এত চমৎকার ছিল, মনে হত তিনি রাজধানীতে আছেন। পুরো বাংলাদেশের খোঁজ-খবর রাখতেন। কিন্তু সে মুরুব্বীও বিদায় নিলেন। বিগত ৩১ মার্চ যশোর-মনিরামপুরের নিভৃত পল্লীতে জানাযা শেষে দাফন করে আসলাম। আহ, বড় কষ্ট দায়ক।
বর্তমানে যাত্রাবাড়ীর মাওলানা মাহমুদ হাসান সাহেব দামাতবারাকাতুহুম আছেন। তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর অসুস্থতার খবর শুনে মনের ভিতর আবার ভয় ঢুকে গিয়েছিল। এখন কি অবস্থা আমি জানি না। আশাকরি তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া এবং আল হাইয়াতুল উলইয়া এর রাহনুমায়ী করার মত মুরুব্বীদের সংখ্যা কিন্তু কমে যাচ্ছে। কেননা আমাদের কওমী তথা দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলোর কাছে বেফাক এবং আল হাইয়াতুল উলইয়া অনেক সন্মানিত স্থান। গোটা বাংলাদেশের আলেম সমাজ সেটাকে মুল্যায়ন করে থাকে। আর ঐ পদে যিনি বসেন, তিনি সাধারণত সর্বস্তরের আলেমদের কাছে ইমেজওয়ালা হয়ে থাকেন।
এজন্য অনেকখানি সংকটে এখন কওমী অঙ্গন। বিশেষ করে মুরুব্বী না থাকলে কিন্তু আলেমগণ এলোমেলা হয়ে চলে। দেখুন! আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) এর জীবদ্দশায় তিনি কওমী অঙ্গনের উপর যেন কোন স্পট পড়তে দেন নাই। পুরো দেশের আলেমদেরকে এক জায়গায় রেখেছেন। আমরা যেন তাঁর ভালোবাসার পরশে, তাঁর স্নেহ -মমতায় তাঁকে মেনে চলতাম। কিন্তু মুরুব্বীর বিদায় থেকে যেন আস্তে আস্তে ঘুন লাগা শুরু হয়েছে।
পরপর কয়েকজন মুরুব্বী চলে গেলেন। এটাও একটা কেমন যেন অশনি সংকেত বলে মনে হয়। আল্লাহ তাঁর পেয়ারা বান্দাদের উঠিয়ে নিলেন। আমরা কিন্তু আরো দুর্বল হয়ে গেলাম। আমরা কেমন যেন দ্বিবিদিক হয়ে যাচ্ছি। এলোমেলো চলছি। যার কারণে মনে হয় আরো বিপর্যয় ধেয়ে আসছে। বিপদ যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না।
এত্ত কিছু হচ্ছে, এটা কিন্তু আমাদের সতর্ক হওয়ার জন্য মনেহয় আল্লাহ তায়ালা এসকল বালা-মুসিবত দিচ্ছেন। বান্দা যখন বেশী গোনাহ করে ফেলে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিপদ আসে বান্দাকে সতর্ক করার জন্য।
আরও পড়ুন: তাঁর বয়ানে প্রশমিত হয় হৃদয়ের যাতনা
মুরুব্বীদের বিদায়ের মিছিল। আর দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরাত। মুরুব্বী শুন্য হয়ে একাকী হওয়া। এগুলো কিন্তু আমাদের জন্য বড় সবক। এই সবক থেকে শেখার রয়েছে অনেক কিছু। তাই ভাই-বন্ধু, আমরা যে যেখানে থাকি। দেশে বা বিদেশে যেখানেই হোক, আল্লাহর কাছে নিজ গোনাহের কথা স্বীকার করে তওবা করি। তাঁর কাছে মাফ চাই। মানুষ মাত্র ভুলত্রুটি আমাদের রয়েছে, কেউ কিন্তু ভুলের উর্ধে নয়। গোপনে হোক আর প্রকাশ্যে হোক, সকল গোনাহ থেকে তওবা করা চাই। যাতে তিনি আমাদের সকল বিপদ-আপদ থেকে হেফাজতে রাখেন। আমাদের জন্য একজন মুরুব্বীর ব্যবস্থা করে দেন, যাকে আমরা ফলো করে চলতে পারি।
মনে রাখবেন, হাদীস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি গোনাহ থেকে তওবা করে, তার যেন আর গোনাহ নেই। অর্থাৎ সে নিস্পাপ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে গোনাহ থেকে তওবা করে দ্বীন ইসলামের উপর অটল-অবিচল থাকার তওফিক দিন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


