ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন
ঈদ মানেই আনন্দ। প্রতিবারই দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানগণ রামাদানের তাৎপর্য বুকে ধারণের প্রয়াস পায়। সিয়াম, ইফতার ও সেহরি সবকিছুতেই পুণ্যস্নাত আবেগ আন্দোলিত করে যায় সব বয়স আর সকল শ্রেণির মানুষকে। এরপর শাওয়ালের একফালি রূপালী চাঁদ ঈদের সওগাত নিয়ে আসে।
‘আট-আশি’ সবাইকেই আনন্দের জোয়ারে উদ্বেলিত করে। সমগ্র মুসলিমজাতি ভাসে অদৃশ্য বর্ণাঢ্য এক আয়োজনে। ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে সম্প্রীতি ও মায়া বন্ধনে আলিঙ্গন করে সবাই। এই আবেগ-আনন্দ নিরুপম নিরাকার এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের। এই সমর্পণের যেমন রয়েছে আত্মিক সৌন্দর্য, তেমনই আছে তার জাগতিক রূপ।
প্রতিবছর দু’দুটি ঈদ উৎসব মুসলমানদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দের ফল্গুধারা। তবে এবারের ঈদ এসেছে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে। নতুন রূপ নিয়ে এসে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। হাতে কাজ নেই, মুখে খাবার নেই, শিশু—বৃদ্ধ সকলেই রোগে-শোকে কাতর। সেখানে সবার মুখ-বদনে ঈদের হাসি থাকা এক ধরনের বিলাসিতাই বটে। কিন্তু এরপরেও উৎফুল্লচিত্তে অনাড়ম্বরভাবে নীরবে-নিভৃত্যে মানুষ ঈদ আনন্দে শামিল হবে।
তবে আশঙ্কা; এবারের ঈদোৎসবকে হয়তো করোনার অভিঘাত ম্লান করে দিবে। হ্যাঁ, তবে আমরা যদি দীর্ঘ একমাস রামাদানের শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থেই বুকে ধারণ করে অসহায়-ছিন্নমূল মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলে খানিকটা হলেও এই উৎসবকে উপভোগ্য করে তোলতে প্রয়াস পাওয়া যাবে। কেননা রোজা আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছে, সংযমী, সহমর্মী ও মিতব্যয়ী হতে, যাতে অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্য করা সহজতর হয়- এবং কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধনকে সুদৃঢ় করতে পারি।
রমজানের শুরু থেকেই আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ রোধে চলছে কঠোর লকডাউন। করোনা পরিস্থিতি অনেক মানুষকে অসহায় করে দিয়েছে। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে করে সংকীর্ণ হয়েছে মানুষের কর্মক্ষেত্রে, থমকে গেছে জীবন-যাত্রা। এতে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে অসহায়-দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা। দেশের অচলাবস্থার ‘বলির পাঠা’ হয়েছেন তারা।
আমাদের দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী দিনমজুর, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, যাদের অবস্থা ‘দিনে আনি দিনে খাই’। লকডাউনের কারণে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ। তাই ক্ষুধার প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর পরিবারের অন্ন ব্যবস্থা করতে না পারার মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে দিনাতিপাত করছে তারা। তাদের অসহায় মুখ-বদন দেখলে যে কারোর হৃদয়ই হাহাকার করে ওঠবে। যদিও সরকার তাদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা করেছে, কিন্তু সমাজের বিত্তশালীরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে সরকারের প্রণোদনাও অপ্রতুল হিসাবেই গণ্য হবে। সরকারের এই প্রণোদনা ক’জন সঠিক প্রাপকের কাছে পৌঁছবে, তা আমাদের কাছে অনেকটাই ঘোলাটে। অকোষীয় মহামারী করোনাভাইরাসের এই দীর্ঘ সময়ে অনেকেই যেমন প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, আবার অনেকেই হারিয়েছেন জীবিকা-উপার্জনের সম্বলটুকু।
আয়-রোজগারের পথখানিও রুদ্ধ হয়েছে অনেকের। এতে করে আমাদের দেশে শুধু অসহায়দের সংখ্যাই বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ঈদের মৌলিক উদ্দেশ্যই হল, অসহায়-দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতা ও সাধ্যানুযায়ী তাদের সাহায্যের চেষ্টা করা। ঈদোৎসবে তারা যেন ঈদ-আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, এজন্য ইসলামের আদেশ হল, ঈদ-জামাতের পূর্বেই দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করণে ‘সদকাতুল ফিতর’ আদায় করা।
দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে, যারা আত্মমর্যাদাবোধের কারণে কারো কাছে যাচ্ঞা করতে পারেনা।তাদের ব্যপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “দান–সদকা এমন অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য,যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, জীবিকার সন্ধানে তারা ঘোরা-ফেরা করতে পারে না, তারা (মানুষের কাছে) কিছু চায় না বলে অবিবেচক ব্যক্তিরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। কিন্তু তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে ব্যাকুলভাবে কিছু চায় না। তোমরা যা কিছু দান কর,আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা বাক্বারা:২৭৩) ।
করোনা পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে। তাই আমাদের সামর্থ্যবানদের অবশ্যকর্তব্য, খুঁজে খুঁজে তাদেরকে সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ পাক তো বলেই দিয়েছেন, ‘তোমরা তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে পারবে’।
অসহায়দের ব্যাপারে নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টগুলো থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে, ভয়াবহ কেয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করে দিবেন’। তাছাড়া ঈদের প্রকৃত আনন্দ তো ‘ভোগে নয় ত্যাগে’।
ঈদুল ফিতর হচ্ছে দান খয়রাতের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করা। ইসলামের জাকাত ও ফিতরা ব্যবস্থা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করেছে। ঈদুল ফিতরের শিক্ষা হচ্ছে মানুষে মানুষে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি অর্জন করা। বিশ্বের সব মুসলমান যাতে সমভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে জন্য রমজান মাসে বেশি বেশি করে দান করাকে ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে।
আবালবৃদ্ধবনিতা, ধনী-দরিদ্র সবার জন্য ঈদুল ফিতর আনন্দময় দিন। পল্লী শহরাঞ্চল উভয়ই উদ্বেল হয়ে ওঠে এই দিনে। শিশু-কিশোর, নবীন-প্রবীন সকলেই মেতে এই আনন্দঘন মহাউৎসবে। ঈদুল ফিতরের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরস্পরের শুভেচ্ছা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর এটাই হলো ঈদুল ফিতরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য। তাছাড়া ঈদ হলো পাপমুক্তির আনন্দ। সফলতা ও বিজয়ের আনন্দ। এ বিজয় নাফসের ওপর আকলের, এ বিজয় শয়তানের ওপর ইনসানের।
আমাদের দেশে ঈদুল ফিতরের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় নব-নতুন পোশাক-আশাক। কিন্তু ইসলাম বলে, এই ঈদ শুধু একটি পোশাকের উৎসব নয়, বরং ঈদের মাহাত্ম্য রয়েছে দু’টি, একটি সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, অন্যটি হচ্ছে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণ।
নিষ্কলুষ নিভৃত দানে কী বিপুল অনুপম প্রশান্তি আর অনাবিল আনন্দ, যে এমন দান করে সে ব্যতীত উপলব্ধি করার সাধ্য কার! ঈদের দিন সকালে ধনী-গরিব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নির্বিশেষে সকল মুসলমান একই কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে অতীতের সব গ্লানি ভুলে একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে। এটাই ঈদের শিক্ষা। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে এবার ঈদগাহ বন্ধ থাকাবে। অনেক দেশেই এবার ঈদের নামাজ হচ্ছে না। স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধের কারণে আক্ষরিক অর্থে হয়তো আমরা কোলাকুলিও করতে পারবো না ঠিকই, কিন্তু ঈদের প্রকৃত অর্থ ধারণ করতে পারলে অবশ্যই আমরা পরষ্পরকে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে রাখতে পারব প্রীতি স্নেহে আর ভালোবাসায়।
ধর্মীয় উৎসবে এখানে বৈচিত্র্য রয়েছে এবং সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নিবিড় ঐকতান। বাঙালি ঐতিহ্যের রেণু মিশে এখানে সিয়াম সাধনা এবং ঈদের উৎসব হয়ে ওঠে স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল।
সব ভয়ভীতি ও আতঙ্ককে জয় করে আমরা যদি এবারের ঈদে ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারি, তাহলে ঈদের আনন্দ ও উদ্দেশ্য সার্থক হবে। মানুষ বাচাঁনোই হোক এই ঈদের প্রধান উৎসব।
লেখক: শিক্ষার্থী ও প্রাবন্ধিক


