রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীতে মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত হচ্ছেন নিরীহ মানুষজন। আর অবৈধ এই ব্যবসা থেকে অল্প সময়ে বিত্তবৈভব গড়ছেন কিছু অসাধু রাজনীতিক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন এ কথা বলছে। ওই প্রতিবেদনে ১৫ জন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে এই তালিকা রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আসে গত বছরের মাঝামাঝিতে। রাজশাহীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিক মাদক ব্যবসায় জড়িত। তাঁরা ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসা করেন। মাদক ব্যবসা বা চোরাচালান এলাকায় নতুন নতুন মাদকসেবী সৃষ্টি করেছে। এসব মাদকসেবী অর্থের জোগান পেতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
শীর্ষ মাদকব্যবসায়ীদের তালিকা : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় রাজশাহীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে প্রথম ১০ জনের বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলায়। তাঁরা হলেন রবিউল ইসলাম ওরফে রবি , নওশাদ আলী , মো. সেলিম , মো. হযরত আলী , নাজিবুর , তোফাজ্জল , হায়দার আলী , সোহেল , সেতাবুর রহমান ওরফে বাবু ও টিপু। বাকিরা হলেন চারঘাট উপজেলার মো. আশরাফ আলী , দুর্গাপুর উপজেলার মো. সেলিম, খুকু রানি ও মো. সিদ্দিক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোদালকাটি গ্রামের জব্বার আলী ।
এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তালিকায় থাকা এই ১৫ জনের মাদক বেচাকেনায় যুক্ত থাকার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মাদক ও চোরাচালানের মামলাও আছে।
২০১৩ সালের ২ নভেম্বর রাতে এই নিরাময়কেন্দ্রে জুয়া খেলার সময় পুলিশ ১৯ জনকে আটক করে। তাঁদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ৫ নম্বরে থাকা নাজিবুর রহমানও ছিলেন। তাঁদের ছাড়াতে পরদিন সকালে অর্ধশত মাদকব্যবসায়ী গোদাগাড়ী থানায় ভিড় করেন। বেলা তিনটার দিকে আটক ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানোর আগ পর্যন্ত তাঁরা থানায় ছিলেন। ৭ জানুয়ারি এই নিরাময়কেন্দ্রে গিয়ে ৭ জন রোগী পাওয়া যায়।
২০১৪ সালের ভোটের আগে তিনি দলবল নিয়ে গিয়েছিলেন। ভোটের জন্য তাঁরা যেভাবে যান, ঠিক সেভাবে। তালিকার ৯ নম্বরে নাম আছে সেতাবুর রহমান আগে বিএনপির সমর্থক ছিলেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কর্মী এবং মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। বাড়ি মাটিকাটা স্কুলের পাশে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সেতাবুর একজন বড় মাদকব্যবসায়ী।
একইভাবে গোদাগাড়ীর বড় মাদকব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত নাসির উদ্দিন ওরফে নয়ন। তাঁর নাম তালিকায় নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় মাদক মামলা রয়েছে। নাসিরের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, উড়োজাহাজ থেকে ওমর ফারুক চৌধুরী নামার পর তাঁর পাশে পাশে হেঁটে আসছেন নাসির।
সাংসদ ওমর ফারুক বলেন, তিনি বিমান থেকে নামলে অনেকেই গিয়ে পাশে দাঁড়ান। তখন তো কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে নাসির উদ্দিন দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে সাংসদের সুসম্পর্ক রয়েছে। মাদকব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক নেই দাবি করে তিনি বলেন, তালিকায় কীভাবে নাম এল, তিনি বুঝতে পারছেন না।
রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঞা বলেন, তাঁরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই তালিকা ধরে কাজ করছেন।
পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সাংসদের নাম এসেছে, সেটার কী হবে? এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরীর নামটা রাজনৈতিক কারণে তালিকায় আসতে পারে। কারণ, গোদাগাড়ীর তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত অনেকেই মাদকের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে অনেক কর্মীই তাঁর সংস্পর্শে যেতে পারেন। এটা দিয়েই তাঁর সংশ্লিষ্টতা বোঝা যায় না।
অবশ্য সাংসদ ওমর ফারুক বলেছেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক পাচারবিষয়ক একটি উপকমিটির আহ্বায়ক। সেখানে তাঁর করা সুপারিশের ভিত্তিতে এখন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হেরোইন ধরার পরে পরীক্ষাগারে গিয়ে তা পাউডার হয়ে যায়। এ জন্য তিনিই প্রথম সংসদে বলেছিলেন, একই সঙ্গে তিনটি সংস্থাকে দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। এখন তা-ই হচ্ছে। এটা অনেকের ভালো লাগার কথা নয়। এ কারণেও তাঁর নাম এভাবে জড়ানো হতে পারে।
গত মাসে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিপজুর আলম মুন্সীর সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ আছে। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধরে হয়রানি করেন। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরলেও অন্য ধারায় চালান দেন, যাতে আসামিরা দ্রুত জামিন পেয়ে যান।
সম্প্রতি ওসি হিপজুরের বদলির আদেশ হয়েছে। তবে তিনি এখনো দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। গোদাগাড়ীতেই থাকার জন্য তদবির করছেন বলে জানা গেছে।
রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক নিশারুল আরিফ বলেন, তদন্তে ওসি হিপজুর মুন্সীর বিরুদ্ধে মাদকপাচারের আসামির এজাহার পাল্টে অন্য ধারায় চালান দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন। এ জন্য সাধারণ বদলি নয়, তাঁর অন্য শাস্তি হতে পারে।


