মূর্খ ওয়ায়েজ জাতির অভিষাপ

মূর্খ ওয়ায়েজ জাতির অভিষাপ

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

আলেম না হয়ে আলেমের চেয়ারে বসা বড্ড বেমানান। ইমাম না হয়ে মসজিদের মেম্বারে সওয়ার হওয়া বা ইমামতিতে দাঁড়ানো বড় অন্যায়। মুফতী না হয়ে ফতোয়ার কাজে হাত দেওয়া বড় জুলুম। মুহাদ্দিস না হয়ে, হাদীসের জ্ঞান লাভ না করে হাদীস পড়ানো, হাদীসের মসনদে বসা বড় বেহুরমতি কাজ। যেমনি ভাবে ডাক্তার না হয়ে রোগীর চিকিৎসা দেওয়া বা সার্জারিতে পারদর্শি না হয়ে কোন রোগীকে অপারেশন করতে যাওয়া অমার্জনীয় অপরাধ। কেউ তাকে ক্ষমা করবে না। কেননা ডাক্তারী না পড়ে বা সার্জারি বিষয়ে পারদর্শি না হয়ে কোন রোগী যদি সে অপারেশন করতে যায়, তাহলে রোগীর কিন্তু বারটা বেজে যাবে। ওই ডাক্তার দিয়ে গোরস্থান আবাদ করা ছাড়া অন্য কোন কাজে আসবে না।

তদ্রুপ মনে রাখতে হবে, দ্বীনি মাদ্রাসায় পড়া ব্যতিরিকে এবং কোন উস্তাদের সোহবতে না বসে, উস্তাদ থেকে ইলম-কালাম না শিখে কেউ আলেম হতে পারে না। অনেকে বলতে পারেন, সমস্যা কোথায়? বাজারে ভুরি ভুরি বাংলা কিতাব পাওয়া যায়, সে গুলো কিনে এনে পড়লে তো আলেম হওয়া যাচ্ছে। আমি তাদের বলব, বাজারে বহু ডাক্তারি বই পাওয়া যায়। সেগুলো কিনে এনে নিজে নিজে পড়াশুনা করে কেউ যদি ডাক্তারি শুরু করে দেয়, তাহলে সে কী ডাক্তার হতে পারবে? আপনারাই বলবেন, অসম্ভব! সে ডাক্তার হবে না, বরং ওই যে আগে বলেছি, তার দ্বারা শুধু গোরস্থানই আবাদ হবে।

ঠিক বর্তমানে কিছু লোক নিজেকে পন্ডিত মনে করছেন। মাদ্রাসায় না পড়ে, কোন উস্তাদের স্মরনাপন্ন না হয়ে শুধুমাত্র বাজার থেকে বই কিনে নিজে নিজে স্ট্যাডি করে এবার ফতোয়া দেওয়া শুরু করেছেন। নিজের ইচ্ছেমত দ্বীনি বিষয়ে ফায়সালা দিচ্ছেন, ওই সমস্ত লোকেরা ওই রকম, যারা নাকি মেডিকেলে না পড়ে নিজে নিজে ডাক্তার হয়েছে। ওরা মনগড়া ফতোয়া দিচ্ছে এখন। নিজের ইচ্ছেমত ইসলামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে কুন্ঠাবোধ করছে না। জেনে রাখতে হবে, ওদের হাতে ইসলাম নিরাপদ নয়।

বড় আফসোস লাগে, ওয়াজ মাহফিল থেকে নিয়ে শুরু করে মসজিদের মেম্বার পর্যন্ত আজ বেদখল বলা যায়। আলেমদের জায়গায় জাহেল গিয়ে বসছে। তারা মনগড়া কথা বলছে। ওয়াজ মাহফিলে যেমন মুর্খ ওয়ায়েজের ছড়াছড়ি, কোন ইলম কালাম নেই। এমনকি কোরআন পড়তে পারে না। তারা গিয়ে ওয়াজ করে। নানান ভেল্কি দেখিয়ে পাবলিকের পকেট ফাঁকা করে দিচ্ছে। অনুরুপ মসজিদের মেম্বারে গিয়ে বসছে জাহেল-গন্ডমুর্খ লোক। যাদের সুরা ফাতিহা সহী নেই। বিশুদ্ধ কোরআন জানে না। কোন মাসায়েলের জ্ঞান নেই। তারা গিয়ে বসে মসজিদের মেম্বারে। সেখানে গিয়ে ওয়াজ করে। নানান মনগড়া কথা বলে। যেটা চরম অন্যায়।

দেখুন! কেউ যদি অফিসার না হয়ে সে যদি অফিসারের চেয়্যারে গিয়ে বসে, কেউ চেয়্যারম্যান না হয়ে বা মন্ত্রী না হয়ে সে কোন মন্ত্রীর চেয়্যারে বসে, সেটা কী কেউ মেনে নিবে? কেউ কিন্তু মেনে নিবে না। তেমনি ইমামতির যোগ্যতা আপনার নেই, আপনি কেন ইমামের জায়গায় বসবেন? আপনি মু্ফতি হননি, ফতোয়ার কিতাব পড়েননি, কোন মাসায়েল সম্পর্কে আপনার সম্যক জ্ঞান নেই, তাহলে কীভাবে আপনি ফতোয়া দিবেন? আপনি কেন মুফতির আসনে বসবেন? আপনার জন্য ফতোয়া দেওয়া অন্যায়।

এরকম বহু অনিয়ম চলছে আমাদের দেশে। একজনের স্থান আরেকজন দখল করে আছেন। যিনি যে জায়গার যোগ্য, তাকে সেখানে না বসিয়ে অযোগ্য লোক গিয়ে বসছে সে জায়গায়। এর দ্বারা জাতির অসম্ভব ক্ষতি হচ্ছে। মুসলিম শরীফের মুকাদ্দামাতে আছে, সমাজে যখন আলেম-উলামা থাকবে না, মানুষ সমাজের জাহেল মুর্খদের আলেমের স্থানে বসাবে, তারা তাদের কাছে দ্বীনি বিষয়ে ফায়সালা চাবে। আর ওই জাহেল-মুর্খরা ইলম ছাড়াই ফতোয়া দিবে। এর দ্বারা সে নিজে গোমরাহ হবে এবং জাতিকে গোমরাহ বানাবে।

বর্তমান এমন অবস্থা হয়েছে। সমাজে জাহেল ওয়ায়েজ, জাহেল পীর, জাহেল মুফতিতে ভরে গেছে। সবাই ইলম-কালাম ছাড়া ওয়াজ করে এবং মনগড়া ফতোয়া দেয়। এতে জাতি বিভ্রান্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ গোমরাহীর দিকে ধাবিত হচ্ছে। পুরো জাতিকে গোমরাহ বানিয়ে দিচ্ছে। সমাজের মধ্যে ফেৎনা- ফাসাদে ভরে যাচ্ছে। এমন অবস্থা, এখন যে কেউ ফতোয়া দেয়, যে কেউ সিদ্ধান্ত দেয় দ্বীন ইসলামের। যেটা চরম অপরাধ। ফতোয়ার কাজ যেখানে একজন বিজ্ঞ মুফতীর সাহেবের হাতে থাকা দরকার। সেখানে অন্য মানুষ হাতে নিয়েছে। যাদের কোন ইলম নাই, দ্বীনি জ্ঞান নেই, তারাই এখন যেন মুফতির আসনে।

মনে রাখতে হবে, দ্বীন ইসলামের বিষয়ে ফায়সালা দিবেন বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম। তারা কোরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিবেন। অজানা লোকদের এই বিষয়ে হাত দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। তারা আলেমদের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানাবেন। এছাড়া আর কিছু নয়। তাই আসুন! জাহেল ওয়ায়েজ, জাহেল পীর, জাহেল মুফতি থেকে সাবধান থাকি। আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: ওয়াজ মাহফিল হোক রাজনীতি মুক্ত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *