পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারতের হিজাব বিতর্ক এবার ছুঁয়েছে বাংলাদেশকেও। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার একটি স্কুলে হিজাব পরে আসার কারণে হেনস্তার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন ছাত্রী। গত বুধবার দুপুরে উপজেলার দাউল বারবাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে।
ছাত্রীরা জানায়, বুধবার দুপুরে পিটির সময় জাতীয় সংগীতের পর লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনি পাল তাদেরকে জেরা করে, কেন তারা হিজাব পড়ে স্কুলে এসেছে। এর পরপরই তিনি হিজাব পরে আসা ছাত্রীদের ইউক্যালিপ্টাস গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করেন।
পরে ছাত্রীরা বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি অভিভাবককে জানালে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ কয়েকশ অভিভাবক পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই স্কুলে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে না পেয়ে স্কুলের কিছু আসবাবপত্র ভাংচুর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মার খাওয়া ওই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া আফরিন বলেন, শিক্ষিকা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, স্কুলে কোনো পর্দা চলবে না। এ সময় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রীদের বলেন, ঢং করতে আসছো! বাসায় গিয়ে বোরখা পড়ে থাকো। মহাদেবপুর বাজারে গেলে পর্দা করবে। কিন্তু স্কুলে আসলে মাথার কাপড় ফেলে আসবে।
এরপর তিনি ছাত্রীদের হিজাব খুলে ফেলার জন্য টানাটানি শুরু করেন। শুধু তাই নয়, যারা হিজাব ছাড়া শুধু মাস্ক পড়ে এসেছিল তাদের মাস্কও খুলে দেন এবং মারতে থাকেন। লাইনে থাকা ছাত্রীদের মারতে মারতে এক পর্যায়ে তার হাতের বেতই ভেঙে যায়। দশম শ্রেণির ছাত্রী ঐশি, সুমাইয়া, তিথি, লাকি, নবম শ্রেণির মোনাসহ কমপক্ষে ২০ জন ছাত্রীকে পেটানো হয়।
এ সময় তিনি ছাত্রীদের হুমকি দিয়ে বলেন, আগামীকাল থেকে যদি হিজাব ও মাস্ক পরে আসো তাহলে পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া হবে।
সাদিয়ার মা সাবেরা বেগম বলেন, সাদিয়া স্কুল থেকে এসে কান্নাকাটি করতে থাকে। এক পর্যায়ে সে জানায় হিজাব পরার জন্য ম্যাডাম তাদের মেরেছে। তিনি বলেন, আমাদের মেয়েরা বড় হয়েছে। তারা তো পর্দা করবেই। স্কুলে গিয়েই ভদ্রতা শিখবে। সন্তানদের নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযুক্ত শিক্ষিকার অপসারণ দাবি করছি।
দশম শ্রেণির আরেক ছাত্রী উম্মে সুমাইয়া আকতারের মা মরিয়ম নেছা জানান, সুমাইয়া ও তার ক্লাসমেট তিথি কেন হিজাব পরে স্কুলে গেছে সেই অপরাধে শিক্ষিকা আমোদিনি পাল তাদেরকে পেটানোর জন্য শিক্ষক বদিউল আলমকে নির্দেশ দেন। এরপর বদিউল সুমাইয়া ও তিথিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এই ঘটনার পর তারা ক্লাস না করে বাড়ি ফিরে কাঁদতে থাকে।
অভিভাবকেরা জানান, বৃহস্পতিবার তারা বিষয়টি জানতে স্কুলে আসলেও অভিযুক্ত শিক্ষিকা এদিন স্কুলে আসেননি। একটি প্রভাবশালী মহল বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার তৎপরতা চালাচ্ছেন। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযুক্ত শিক্ষিকা আমোদিনি পাল মোবাইল ফোনে দাবি করেন, স্কুল ড্রেস পরে আসতে কিছুটা শাসন করেছিলেন তিনি। এটিকে এখন ধর্মীয় রঙ লাগানো হচ্ছে। অভিযুক্ত অপর শিক্ষক বদিউল আলম জানান, হিজাব না পরায় ছাত্রীদেরকে শিক্ষিকা আমোদিনি পাল মারধর করেছেন। তবে তিনি নিজে কাউকে মারেননি বলেও দাবি করেন।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধরণী কান্ত বর্ম্মণ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ওইদিন তিনি স্কুলের কাজে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলে এসে বিষয়টি জেনেছেন। তাকে শোকজ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তাকে শোকজ করার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মিলন এ প্রসঙ্গে বলেন, ওই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রীতি বিনষ্টের কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে মহাদেবপুর থানার ওসি আজম উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই অভিযোগ পাননি তারা। অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমান হিজাব না পরায় স্কুলছাত্রীদের পেটানোর কথা স্বীকার করে বলেন, আগে তাকে শোকজ করি। তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


