স্বদেশ ও স্বাধীনতা | মোস্তফা কামাল পাশা

স্বদেশ ও স্বাধীনতা | মোস্তফা কামাল পাশা

আমরা বাঙালি জাতি। আমাদের জাতিসত্ত্বার বিকাশ হয়েছে হাজার বছর ধরে। এই হাজার বছরের অনেকগুলো বছর ধরে আমরা ছিলাম পরাধীন। একটি জাতি যখন পরাধীন থাকে তখন তার নিজস্ব বলে কিছু থাকে না। আমরাও আমাদের স্বদেশের স্বাধীনতা হারিয়েছি একসময়। সেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে আমাদের প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বদেশকে মুক্ত করতে চলে গেছে দুই শতাব্দিরও বেশি সময়। স্বাধীনতা ছাড়া স্বদেশের মহিমা উপলব্ধি করা যায় না। মূলতঃ ‘স্বদেশ’ এবং ‘স্বাধীনতা’ শব্দ দুটি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সংশ্লিষ্ট। ব্যক্তি হিসেবে মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। কিন্তু এই ব্যক্তিস্বাধীনতা ততক্ষণ পর্যন্ত উপভোগ করা যায় না যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা না থাকে।
জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি জাতি দুইশত বছর বৃটিশ শাসন আর ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসনের কবলে থেকে এই উপলব্ধি করতে পেরেছি বলেই ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গর্জে উঠেছিল বাংলার মানুষ। একই ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে যে জাতির জন্ম হয়েছে আজ থেকে হাজার বছর আগে সেই বাঙালি জাতি সুদীর্ঘকাল ছিল পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ। ১৯৪৭ সালে তথাকথিত দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও প্রকারান্তরে আমরা বাঙালিরা হয়ে গেলাম পাকিস্তানের উপনিবেশ। তারা প্রথম আক্রমণ করলো আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল একটি ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিকে ধ্বংস করার জন্য তাদের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়া বাঞ্চনীয়। তারা তাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালি জাতি সেটি মেনে নেয়নি। আমরা দৃপ্ত কণ্ঠে তার প্রতিবাদ করলাম। আমাদের ভেতরের জাতিসত্ত্বা নড়েচড়ে উঠলো এই প্রথম। ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য দাবি উত্থাপন করলেন। পাকিস্তানিরা আমাদের দাবি প্রতিরোধে সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি কাজে লাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সভায় একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে সেখানে উপস্থিত শেখ মুজিবুর রহমান নামে এক তরুণ প্রথম তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। তাঁর সাথে কণ্ঠ মেলালেন হাজারো তরুণ। তীব্র প্রতিবাদে প্রতিরোধে ফেটে পড়ল পুরো বাঙালি জাতি। ’৪৮ থেকে ’৫২ পর্যন্ত চলতে থাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ’৫২ সালে এসে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি ছেলেদের বুকের রক্ত ঝড়ে পড়লো রাজপথে। ভাষার জন্য, সংস্কৃতির জন্য প্রাণ দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো এই বিশ্বের বুকে। শুরু হলো স্বদেশ ও স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ পরিক্রমা।
এই পথ পরিক্রমায় ধুমকেতুর মতো আবারও আবির্ভূত হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালে এই মহান নেতা পাকিস্তানি শাসকচক্রের কাছে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করে স্বাধীন স্বদেশের আন্দোলনে এক যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপন করেন। যে ফলক থেকে আমরা শুধু সামনে এগিয়ে গিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সেই ছয় দফার বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তানের কোনো অস্তিত্ব থাকে না, থাকতে পারে না, এটা পাকিস্তানিরা বুঝে যায়। কারণ দুই অঞ্চলের জন্য আলাদা মুদ্রা, আলাদা রিজার্ভ ব্যাংক, স্বতন্ত্র প্যারামিলিশিয়া বাহিনী স্থাপন, প্রাদেশিক সরকারের হাতে ট্যাক্স টোল আদায়ের ক্ষমতা প্রদানের দাবি অর্জনের মাধ্যমে বাঙালিরা কী করতে চায় এটা তারা বুঝতে পেরেছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে তাদের ভাষায় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে সাব্যস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে দেশদ্রোহীতার মামলা করে তাঁকে কারাগারে অন্তরিন করে। প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে জেল থেকে বের হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। তারপর ৭০ সালের নির্বাচন আর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র।
বিশ্বে বাঙালি জাতির উপলব্ধিতেই প্রথম এসেছে যে, স্বাধীনতাহীনতায় স্বদেশ নেই। পরাধীন দেশ কখনো স্বদেশ হতে পারে না। আমাদের স্বদেশ ছিল, কিন্তু স্বাধীনতা ছিল না। পৃথিবীর কোনো জাতি তার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ছাড়া স্বদেশের মহিমা উপলব্ধি করতে পারে না, করা সম্ভব নয়। স্বদেশের সাথে স্বাধীনতা প্রত্যয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসলে স্বাধীনতাহীন কোনো ভূখ-কে স্বদেশ বলাও যায় না। বাঙালি জাতি আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ বাঙালির স্বদেশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *