- সাদ আমির
ভুল বানানে ভরে গেছে ভুল গলির দেয়াল—তরজমায় পড়ি ভুল নাম। প্রখর ফ্যালাসির পাশে গোপন হাওয়া এলে সমস্ত শূন্যতাই যেন গোলাকার। আজকাল সবকিছুই কেমন যেন ভুল বলে মনে হয়। অস্থির সময় কাটে। মূলত স্থির হতে পারি না কোনো কিছুতেই। একদিন শুনলাম বনধুঙুরের ছায়াগান। সেই গানের সুরও আমি ভুল তরজমা করি। আর ছুড়ে দিই সমস্ত বিষাদ। বিষাদ নুয়ে পড়ে মাঠ থেকে মাঠে। পাহাড়ের পিঠ থেকে খসে পড়া পাথরের তলায় চটপটে লুকাতে চাইছে আবরণহীন স্পর্শ সকল। তবু তৃপ্তি নেই—আমার সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে উড়ে গেছে মাছরাঙার ঝিলমিল পাখনা। ঝোলা জানালায় গাঢ় অন্ধকার নেমে এলে লণ্ঠনে নেই আলো। নৈঃশব্দ্যর ভেতর নীরব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার আগে ছিঁড়ে যায় অপরূপ মাছের শরীর। আমি খুঁজে বেড়াই মাছের নীল চোখ। ফিনফিনে বাতাসে কাঁপছে আলোহীন শহর। ধীরে ধীরে ফুলে উঠছে আমার পাজামার অতল। ঘাস উড়ে—একটা নীল চোখ নেই এইখানে। আমার সন্ধানী মন, আশাহত হয়ে ফিরে যায় অন্য কোথাও।
পিসি সচল করে মানজুর ভাই সার্চ করেন ‘খোদা ওয়ান্দা।’ তারপর ফুল ভলিয়মে বাজিয়ে দেন। সংগীতটি বাজতে থাকে ‘খোদা ওয়ান্দা, তেরা ওয়ান্দা, ও দুনিয়া ছোড় আয়া হ্যায়’ সুরে। জোনায়েদ জামশেদ; এমন মার্জিত রুচিসম্পন্ন একজন মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, বিষয়টা মোটেও সুখকর নয়।
বহুদিন আগের কথা। কোনো এক চিন্তিত বিকেলে কথা। মানজুর ভাইকে দেখেছিলাম, তিনি কীভাবে তুমুল অস্থিরতার মুহূর্তগুলো পার করেন। কিছুক্ষণের জন্য কীভাবে ভুলে যান পার্থিব সকল কিছু। পিসি সচল করে মানজুর ভাই সার্চ করেন ‘খোদা ওয়ান্দা।’ তারপর ফুল ভলিয়মে বাজিয়ে দেন। সংগীতটি বাজতে থাকে ‘খোদা ওয়ান্দা, তেরা ওয়ান্দা, ও দুনিয়া ছোড় আয়া হ্যায়’ সুরে। জোনায়েদ জামশেদ; এমন মার্জিত রুচিসম্পন্ন একজন মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, বিষয়টা মোটেও সুখকর নয়। আমার বিষণ্ণ মন আরও বিষণ্ণতায় মুড়িয়ে গেল। কাতর হলাম। মানজুর ভাই এমন বিরহী সংগীতের সুর শুনে কীভাবে বিষণ্ণতার মুহূর্তগুলো পার করেন? কীভাবে হারিয়ে যান অন্য কোথাও? বিষয়টা আমার বুঝে আসে না। এইসব ভাবতে ভাবতে চিন্তান্বিত মানজুর ভাই সকল দুঃখকষ্ট গিলে খেয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন—জানা নেই।
সংগীতটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর যেই দৃশ্য আসে, সেটা আমি সেবারই প্রথম দেখেছিলাম। দৃশ্যে সর্বপ্রথম যে লোকটা বের হয়, সে খুবই তীক্ষ্ণ অথচ মনোহর বাজিয়ে তোলে হারমোনিয়াম। হারমোনিয়ামের উপর বড়ো বড়ো চোখ করে বসে আছে একটা সাদাকালো, চরকাচরকি বেড়াল—চোখ দুটো অদ্ভুত নীল। লোকটার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী বেড়ালটি।
’ হতাশ হইয়ো না। জীবনকে ভেবেছি ইরম্মদ-ঝলকানো এক মরুপথ। ভুল করেছি, ভুল।
ঘরের দরজা আটকিয়ে লোকটা হেঁটে আসে ধীরে ধীরে। হাতে একটা লাঠি। চোখে পরা কালো উপনেত্রটা কী সুন্দর খাপ খেয়ে বসে আছে নাকের উপর! লোকটাকে আবারও নতুন করে চিনালম। সুঠামদেহী হৃষ্টপুষ্ট সুশ্রী যুবক অথচ অন্ধ। দৃশ্য গড়াতে থাকে সময়ের স্রোতে। পরবর্তী দৃশ্যে অন্ধ লোকটার জটিল চরিত্র তরজমা করতে গিয়ে আমি ভুল করি। কঠিন ভুল। লোকটা কেন অন্ধের অভিনয় করছে মেয়েটার সঙ্গে? না, শুধু তো মেয়েটার সঙ্গে না—সবার সঙ্গেই সে অন্ধের অভিনয় করছে। আমি আবারও ভুল করি। যেন এঁটো পাতে ভাতের কণার মতন আমার সর্বস্বে লেগে আছে ভুলের ছাপ।
এই অস্থানিক শিকড়পুঞ্জের মতন জীবনে আর ভালো লাগে না কিছুই—নিজেকেও না। এই বাঁচা শুধুই যেন বেঁচে থাকার জন্য। দিন কেটে যায় নীলিম আকাশ থেকে ফিরে আসা হাওয়ায় দুল্যমান পাতার দৃশ্যসূত্র ধরে। ভুলে বসেছি প্রভুর আশার বাণী ‘লা তাহযান।’ হতাশ হইয়ো না। জীবনকে ভেবেছি ইরম্মদ-ঝলকানো এক মরুপথ। ভুল করেছি, ভুল।
লেখক, গল্পকার


