- নাইম ইসলাম
যুগে যুগে কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকেনি—সে দিনগুলো মানুষের ইতিহাসে ছুঁয়ে দিয়েছে হৃদয়ের গহীনতম অনুভব, কাঁপিয়ে দিয়েছে বিবেকের মর্মমূর্ছনা। তেমনই একটি দিন আজ, ১০ই মহররম—আশুরা। এ শুধু একটি দিন নয়, এটি এক মহাস্মৃতি, এক আত্মত্যাগের মিনার, এক ঐশ্বরিক মহাসড়ক—যা একদিকে নিয়ে যায় নবীদের গৌরবময় সন্ন্যাসের পথে, অন্যদিকে রক্তাক্ত কারবালার প্রতিরোধের বীরগাথায়।
🕊 শুরু সেই প্রাচীন আদি ইতিহাস থেকে
মহাকালের শুরু থেকেই আশুরা দিনটি রহস্যে মোড়ানো অলৌকিকতায় পূর্ণ। ইসলামি ইতিহাস ও হাদীসের বর্ণনায় জানা যায়, এই দিনে আল্লাহ সৃষ্টি করেন হজরত আদম (আ.)-কে, তার তওবা কবুল করেন, জান্নাতের দরজা খুলে দেন। সৃষ্টি থেকে ক্ষমা, করুণা থেকে আশ্রয়—এই দিনের বুকে লুকিয়ে আছে সমস্ত মানবজাতির পয়গাম।
এই দিনেই, মহান প্রভু তাঁর প্রেমিক নূহ (আ.)-এর কিশতিকে রক্ষা করেন তুফানের বিষণ্ণ জলরাশির মাঝে, এবং নৌকাটি থেমে যায় শান্তির প্রতীক জুদি পাহাড়ে। আদম থেকে নূহ, নূহ থেকে ইব্রাহিম—এই দিনে অগ্নিকুণ্ডও পরিণত হয় শীতলতায়। অসীম ধৈর্যের অন্য নাম হজরত আইয়ুব (আ.) এই দিনেই রোগমুক্ত হয়ে প্রমাণ করেন—ধৈর্যই আশীর্বাদ।
হজরত মুসা (আ.)-এর হাত ধরে বনি ইসরাইল যখন পার হয় নীল নদ, ফেরাউন যখন সলিল সমাধিতে লুটিয়ে পড়ে—তখনো দিন ছিল এই মহররমের দশ তারিখ। একি কাকতাল? নাকি নিয়তির ছক? আশুরা যেন হয়ে দাঁড়ায় মুক্তির প্রতীক।
🩸 কারবালার বেদনার রেখা
কিন্তু হায়, সময়ের পাতায় এই দিন আবার রক্তাক্ত হয় ৬১ হিজরির করুণ এক সকালে। বালুর বুক চিরে ঝরে পড়ে এক নিষ্পাপ শিশুর কান্না, কাঁপে বোনের বুক, মায়ের বুকফাটা আহাজারি—কারবালা। এ দিনই নবীর দৌহিত্র, হোসাইন (রা.) আত্মত্যাগ করেন এমন এক সত্যের জন্য, যে সত্য ছিল সাম্যের, ন্যায়ের, অধিকার ও স্বাধীনতার।
কারবালার প্রান্তরে জাহান্নামের স্রোত থামাতে পারেনি একবিন্দু পানির জন্য কাতর শিশু আলী আসগরের নিঃশব্দ কান্নাকে। থামাতে পারেনি জয়নবের অটল বিশ্বাস, কিংবা হোসাইনের সেই বজ্রসম কণ্ঠস্বর—“মৃত্যু হলো আমাদের জন্য সম্মান, এবং অত্যাচারীদের সঙ্গে জীবন লজ্জার।”
🌙 আশুরা রোজা: আত্মশুদ্ধির আরেক নাম
রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরা দিবসকে শুধুই কারবালার স্মরণ হিসেবে নয়, বরং এটি এক আত্মশুদ্ধির অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই দিনে তিনি রোজা পালন করতেন, সাহাবিদেরও উৎসাহ দিতেন। তিনি বলেন—
“আশা করি আল্লাহ এই দিনের রোজার মাধ্যমে আগের বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম)
এই রোজা রমজানের পূর্বে ফরজ ছিল, পরে তা হয়ে দাঁড়ায় মোস্তাহাব। যারা আত্মার পবিত্রতা চায়, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তাদের জন্য আশুরা রোজা যেন এক উপহার।
📜 ইতিহাসের শিক্ষা: গর্ব ও কর্তব্য
আশুরা আমাদের শেখায়—
🔹 ক্ষমা ও করুণার অর্থ কী
🔹 অধিকার আদায়ে রক্তপাতও যদি লাগে, তবুও অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো নয়
🔹 আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না
🔹 আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা নেন, তবে পরিত্যাগ করেন না
আজ, যখন মুসলিম সমাজ বিভ্রান্তির কুহেলিকায়, হোসাইন (রা.)-এর জীবন, তার সংগ্রাম, তার ত্যাগ—আমাদের দীপ্তি জোগাতে পারে। আশুরা একটি প্রশ্ন রেখে যায়: “তুমি কোন দিকে? সত্যের পাশে, নাকি সুবিধাবাদীদের সঙ্গে?”
একটি অনন্ত আহ্বান
১০ই মহররম শুধুমাত্র একটি দিন নয়। এটি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগের দিন, এটি আসমানি রহমতের দিন, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার দিন, এবং আত্মার শুদ্ধতার আহ্বান। আমাদের হৃদয় যেন জেগে ওঠে হোসাইনের মতো দৃঢ়তায়, চোখ ভরে আসে আদমের তওবার মতো অনুতাপে, এবং অন্তর নিঃসীম ভালোবাসায় ডুবে থাকে মুসা (আ.)-এর মুক্তির কৃতজ্ঞতায়।
আসুন, আমরা আশুরাকে শুধুমাত্র অতীতের একটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং চেতন, বিশ্বাস ও আদর্শের শিখা হিসেবে গ্রহণ করি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম


