শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী (রহ.)-এর চরিত্র মাধুর্য বর্ণনায় অধিকাংশ নিবন্ধকার ও জীবনী রচয়ীতাগণ তাঁর বিনয়গুণকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছেন। হাকীমুল উম্মাত হযরত থানবী (রহ.) হযরত মাদানী (রহ.)-এর এ গুণের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। (দ্র. আল-জমিয়ত ৮৯, ১৮১ পৃষ্ঠায়) কোনরূপ কৃত্রিমতা বা লৌকিকতা ছাড়াই হযরত মাদানী (রহ.) মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, ‘আমি অতিনিকৃষ্ট ব্যক্তি, বড় পাপী, তাঁর কথা ও কর্মে, আচার-আচরণে এভাবে স্বভাবিকভাবে ফুটে উঠত। ফলে ‘যে আল্লাহ্ তাআলার খাতিরে বিনয় প্রকাশ করে, আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন’ কথাটি- তাঁর জীবনে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছিল ।
মানুষের মনে জাগরিত প্রশ্ন (যা অনেকে তাঁকে করেছেনও) আপনি তো কুতবে যামান হযরত গাঙ্গুহী (রহ.)-এর খিলাফত লাভ করেছেন, আরিফ বিল্লাহ হযরত শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর সর্বাপেক্ষা বেশী খেদমতের ও স্নেহ-ধন্য সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি ফারসী ভাষার এ বিখ্যাত চরণ দুটি আবৃত্তি করতেন –
‘মিলে যদি মুরশিদে কামেল অভাগার তাতে কী লাভ? খিযরের আবে হায়াত পানেও মিটিল না সেকান্দরের তৃষ্ণাভাব।’
তিনি প্রায়শই বলতেন, নিজের অলসতা, অযোগ্যতার কারণে প্রদীপ্ত আলো পেয়েও যে তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই ডুবে আছি। “গাধা মক্কায় গেলেও গাধাই থেকে যায় ঘোড়ায় পরিণত হয় না।” কথাটি বড় খেদের সাথে তাঁর যবান মুবারক হতে প্রায় শোনা যেত। কেউ তাঁকে খানার দাওয়াত করলে স্বগোক্তির মত ‘গাধাকে খাওয়ালে পাপ-পূণ্য কিছুই হয় না, তাহলে কেন এ বেহুদা কাজ করতে যাবে? কেউ তাঁর দস্ত মুবারকে বাই’আতের অভিপ্রায় প্রকাশ করলে বলতেন, কে তোমাকে এ কুপরামর্শ দিয়েছে? বিভ্রান্ত করেছে? যুক্তি দিতেন, পিপাসা লাগলে লোকে পানির খোঁজ করে, আগুনের কাছে যায় না। ‘পীরের ভূমিকায় হযরত মাদানী (রহ.)’ শিরোনামে এ সম্পর্কে আমরা আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি, পুনরায় পাঠের অনুরোধ জানাচ্ছি।
৪খণ্ডে হাজারের উর্ধ্বে পৃষ্ঠায় মাকতুবাতে শাইখুল ইসলাম (শাইখুল ইসলামের পত্রাবলী) গ্রন্থে তাঁর লিখিত পত্রাবলী পাঠ করলে শিউরে উঠতে হয় যে, তিনি কেমনভাবে নিজেকে ক্ষুদ্র ও নিকৃষ্টমনে করতেন! এ মনে করাটা লৌকিকতা বা কৃত্রিমতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। কারণ, যে সময়ে তিনি পত্র লেখকের উত্তরে এসব পত্র লিখেছেন, সে সময় তাঁর এই পত্র ছাপা হবে, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে, এর কোন পরিকল্পনাও কারও মনে ছিল না। যখন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তখন তাঁর অধিকাংশ পত্র লেখা হয়ে গেছে। একজন নয়, শতজনে কত অনুরোধ-উপরোধ, অনুনয়-বিনয় করে তাঁর এসব পত্রাবলী সংগ্রহ করে প্রকাশের অনুমতি গ্রহণ করা হয়। কাজেই পত্র লেখাকালীন তাঁর মনের কোণে উঁকিও মারেনি যে, তাঁর পত্র অন্যে পড়বে। বরং তাঁর কোন ছাত্র/ মুরীদ/ ভক্ত/ গুণগ্রাহী তাঁর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা মিশ্রিত শব্দ/ বাক্যে পত্র লিখেছেন, তিনি তাঁর উত্তরে যুক্তির জাল বিছিয়ে, কোন পত্রে কসম খেয়ে নিজের অযোগ্যতা, অলসতা, কর্মবিমুখতার উল্লেখ করে লিখেছেন, আল্লাহ্ তাআলার এক গুণবাচক নাম ‘আস সাত্তার’ অর্থাৎ, বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপনকারী, যদি এ গুণ না থাকত তাহলে আমার কৃত অপরাধ প্রকাশ পেলে লোকে আমাকে (আগের শব্দটি লিখতে কলম কেঁপে উঠছে) শুকর-কুকুর অপেক্ষা বেশী ঘৃণা করত। এভাবে তিনি পত্র প্রেরকের মন-মস্তিষ্ক হতে যেন তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার ভাব কর্পূরের মত উবে যায়, সে চেষ্টা চালিয়েছেন।
অনেকে-যাঁরা হযরত মাদানী (রহ.) সম্পর্কে বা তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত নন, তাঁরা একে অতিরঞ্জিত বা অতিশয়োক্তি মনে করে ব্যঙ্গ করতে পারেন। তাঁরা হয়ত বলবেন, বিনয়েরও একটা সীমা আছে? তাঁদের সমীপে বিনীতভাবে আরজ: এ তো বিনয় বা সৌজন্য নয়। এ তো ‘আবদিয়্যাত’ দাসত্বের প্রকাশ। আল্লাহ্ তাআলার কিববিয়ায়ী জালাল-জাবারুত শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতাপ, ক্ষমতা ও মহিমার কোন সীমা পরিসীমা নেই। অনুরূপ ভাবে তিনি কুরআন মজীদে ঘোষণা করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর করুণা-বারি বান্দার উপর অজস্র ধারে বর্ষিত হচ্ছে, যার কোন সীমা পরিসীমা নেই। বান্দা যখন আল্লাহ্ তাআলার সীমাহীন ক্ষমতা ও প্রতাপ সম্পর্কে অবহিত হতে সক্ষম হয় এবং সীমাহীন অনুগ্রহ ও করুণার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে নিজেকে অক্ষম মনে করে, তখন তাঁর মাঝে নিজের হীনতা-দীনতা, অপারগতা-অক্ষমতা জেগে উঠে। সে তখন আল্লাহ্ তাআলার কাছে নিজের অক্ষমতা-অপারগতা, ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে, কাকুতি-মিনতি সহকারে কান্নাকাটি করতে থাকে। একেই বলে আবদিয়াত বা দাসত্ব। এর কোন সীমা-পরিসীমা নেই, যে যত বেশী আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে, সে তত বেশী নিজের সামান্য অন্যমনস্কতাকেও কবীরা গোনাহ বলে মনে করে।
কুল মাখলুকাতের সরদার, যিনি দুই ধনুকের জ্যা পরিমাণ অথবা তদপেক্ষা বেশী নৈকট্য লাভ করেছিলেন, যা জিবরীলে আমীন (আ.)-এর পক্ষেও সম্ভবপর ছিল না, সারা মুমিন-মুত্তাকী বান্দার ইবাদতকে এক পাল্লায় রাখুন, আর জনাবে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর দু’রাকআত নামাজকে আরেক পাল্লায় রেখে ওজন করুন, ঐ দুই রাকআতের পাল্লাই ভারী হবে, অবশ্যই ভারী হবে। তিনি খেদোক্তি করে বলেন, ‘প্রভু হে! তোমাকে যেভাবে চিনবার, জানবার, তাতো চিনতে জানতে পারলাম না, যেভাবে তোমার ইবাদত করার, সে ভাবে তো ইবাদত করতে পারলাম না। অথচ তাঁর নামাজ তো ‘মুনাজাত মা’আল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালার সাথে গোপন কানাকানি হত। হাকীকী মিরাজ করে তিনি তো এই ‘মিছালী’ বা রূপক মিরাজ উপঢৌকন হিসাবে নিয়ে আসছিলেন, তাই যখনই মনে কোন পেরেশানী দেখা দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মাশুক-মাবূদের সঙ্গে কানাকানি করতে দাঁড়িয়ে গেছেন। ‘মনে অনাবিল প্রশান্তি এসে গেছে’— ‘আমার শ্বেত শুভ্র মনের উপর কখনও কখনও অন্য মনষ্কতার ধুলি-ময়লা এসে পড়ে, আমি তাওবা-ইস্তেগফারের পানি দিয়ে শতবার সে ধুলি-ময়লা সাফ করে ফেলি।’ একি সেই সর্বাপেক্ষা বড় মাসূম-নিষ্পাপ সত্তার উক্তি নয়? আল্লাহ্ তায়ালার যে যত নৈকট্য লাভ করে, সে তত বেশী তাঁর মহিমা-প্রতাপের সামনে নিজেকে অপরাধী বলে মনে করে। আরিফ বিল্লাহ হযরত নানূতবী (রহ.) বলেন
নাসারার কুত্তা সে তো করে ঘৃণা মোরে,
নিষ্পাপ সে তো, আমি যে ন্যুব্জ পাপের ভারে ।
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী (রহ.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ফিরিঙ্গী কাফির হতে নিজেকে নিকৃষ্ট মনে না করে, আল্লাহ্ তায়ালার মারিফাত লাভ তার জন্য অসম্ভব। কুতবুল আলম হযরত মাদানী (রহ.) এই পুণ্যাত্মাদের সার্থক উত্তরসূরী। কাজেই তাঁর বিনয়-নম্রতা স্বস্থান হতে অগ্রসর হয়ে আবদিয়াত বা দাসত্বের মাকামে পৌঁছে গিয়েছিল। কারণ বলতে পারব না, কিন্তু সজ্ঞানে স্বচক্ষে যা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতো দৃষ্টি-ভ্রম বলেও স্বীকার করতে রাজী নই। বহু দিন বহুবার সাথী-সঙ্গীদের সাথে ঠেলাঠেলি বা কৌশল অবলম্বন করে হযরত (রহ.) -এর ডান বা বাম পার্শ্বে – দাঁড়িয়ে ফরজ নামাজ পড়ার সুযোগ ঘটেছে। সালাম ফিরানোর সময় চেহারা মুবারকের দিকে তাকিয়ে দেখেছি, তাঁর চক্ষুদয় হতে অবিরল ধারায় অশ্রুর স্রোত বের হয়ে শ্মশ্রু মুবারক বেয়ে শ্বেত-শুভ্র খদ্দরের জামা ভিজিয়ে দিয়েছে। মিছালী বা রূপক মিরাজের মাধ্যমে হাকীকী মিরাজ লাভের জন্য কাকুতি-মিনতির রোদন নয়?
কী আশ্চর্য! পাশাপাশি দু’জনে একই ইমামের পিছনে একই নামাজ আদায় করলাম, একজন অর্থাৎ হযরত মাদানী (রহ.) মুনাজাত মা’আল্লাহ্ করে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলেন। আর অপর জন অর্থাৎ আমি ইমাম সাহেবের কিরাআতের অবকাশে আমার পরিচিত জগৎ পরিভ্রমণ করে আসলাম। কাজেই আমার মত গাফেল অমনোযোগী নামাজীর পক্ষে তো এরূপ আবদিয়াত বা দাসত্বের প্রকাশ বাড়াবাড়ি বলেই প্রতিভাত হবে।
বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত
লেখক: মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ (রহ.)


