নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে এক সংবাদ সম্মেলনে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে মুদ্রানীতি প্রণয়ন এবং প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে এর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে দুইবার (’জানুয়ারি-জুন’ ও ‘জুলাই-ডিসেম্বর’ সময়ের জন্য) মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। চলতি অর্থবছর শেষে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও এখন মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে।

গভর্নর বলেন, ‘দেশে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমছে। তবে এখনো আমাদের কাক্সিক্ষত মাত্রায় আসেনি। আমাদের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা। এটি কমে গত জুনে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে হয়েছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং উৎপাদন ভালো হওয়ায় তা কমছে। চাল ছাড়া সব পণ্যের দর স্থিতিশীল রয়েছে।’ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে আছে, আমরা চাচ্ছি এটা আরো কমাতে; ৭ শতাংশে নামলে নীতি সুদহার কমানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ গত বছরের ২২ অক্টোবর প্রধান নীতি সুদহার রেপো ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে। মূলত ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ধক রেখে রেপোর বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়। অন্য দিকে, নতুন মুদ্রানীতিতে আন্তঃব্যাংক ধার নেয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। অবশ্য গত ১৫ জুলাই স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশে নামানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এ সুদহার প্রযোজ্য হয়। নীতিগুলোর তথ্য তুলে ধরে গভর্নর জানিয়েছেন আপাতত এসব নীতি পরিবর্তন হবে না। তিনি জানান, এখন প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। বিশেষ সহায়তায় প্রবৃদ্ধি দেখাতে চাচ্ছি না। গত বছর ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগামীতে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, এটা অর্জনে চেষ্টা করব। বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আগের মুদ্রানীতিতে বেশি থাকলেও তা পূরণ হয়নি। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো হচ্ছে না। গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২০ শতাংশ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ লক্ষ্য ঠিক করেছে।

একইভাবে সরকারি খাতেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঋণ কিছুটা কম হয়েছে। নতুন মুদ্রানীতিতে এই খাতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ২০ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরে সরকারি ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ ধরা হলেও গত জুন পর্যন্ত অর্জিত হয় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করছে।

আহসান এইচ মনসুর তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাণিজ্যিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক শুল্ক বৃদ্ধি ও এর সাথে সম্পর্কিত অনিশ্চয়তা রফতানির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।’ তিনি বলেন, চাহিদা হ্রাস, মুদ্রার অস্থিরতা এবং হাইড্রোকার্বনের দাম হ্রাসের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সুদের হার কমাতে বা বর্তমান নিম্নস্তরে স্থির রাখতে আগ্রহী হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে বিশ্ব বাজারে পণ্যের দাম হ্রাস পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

ড. মনসুর বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল।’ তিনি বলেন, ‘প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে ছিল ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অবমূল্যায়িত বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, বৈদেশিক অর্থপ্রদানের বকেয়া বৃদ্ধি, কঠোর তারল্য অবস্থা, সুশাসনের অভাব এবং উচ্চ পরিমাণে নন-পারফরমিং লোন (এনপিএল)।’

তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুস্পষ্ট ও ভবিষ্যতমুখী কৌশল নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান বজায় রেখেছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতকে লক্ষ্য করে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেছে।’

Related Articles